Main Menu

জাপায় বিভক্তি তিন ধারায় উন্নীত,পার্টির নেতৃত্বে রওশন এরশাদ?

একবছর আগে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রয়াণের পর দলের অনেকেই বলছিলেন, ‘অভিভাবকহীন’ হয়ে পড়লো জাতীয় পার্টি। এ পরিস্থিতিতে সুযোগ এসেছিল দলের নেতাকর্মীদের সব বিভক্তি দূর করে একতাবদ্ধ হওয়ার। কিন্তু কিসের কী, এরশাদের প্রয়াণের দুই মাসের মধ্যেই দলের বিভক্তি চরমে ওঠে। কে হবেন দলের চেয়ারম্যান— পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনে তা নিয়ে চলে লড়াই। শেষ পর্যন্ত রওশন এরশাদকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আর জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান এবং সংসদে রওশনকে বিরোধী দলীয় নেতা ও কাদেরকে উপনেতা ঘোষণা করে দুই কূল রক্ষা করা হয়।

তবে সেই ‘দুই কূল রক্ষা’র সমাধান বেশিদিন টেকেনি। দলের নেতাকর্মীরা যে বরাবরই দুই ‘কূলে’ বিভক্ত— তার খবর পাওয়া যায় প্রায় প্রায়ই। শেষ খবর বলছে, সেই বিভক্তি এখন তিন ধারায় ‘উন্নীত’ হয়েছে। রওশন এরশাদ আর জি এম কাদেরের পাশাপাশি এখন দলে বিদিশা সিদ্দিকীকে ঘিরে আলাদা বলয় তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা এই বলয়ে বেশ সক্রিয়, তাদের সঙ্গে রংপুরকেন্দ্রিক কিছু নেতাকর্মীও রয়েছেন। দলের অভ্যন্তরে এই তিনটি ধারাই এখন বেশ প্রবল।

দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পার্টির কাউন্সিল ঘিরে এখন থেকেই চলছে উত্তেজনা। কাউন্সিলের সব হিসাব-নিকাশ নতুন করে হচ্ছে। ডিসেম্বরে গিয়ে তাই পার্টির চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আসবে— এমন ধারণা দলের অনেকেরই। সে সিদ্ধান্ত আপসে না হলে দলের ভাঙন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে পার্টির নেতৃত্ব নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন রওশন এরশাদ। তবে এতটা দেরি করতেও রাজি নন তিনি। পার্টির একাধিক সূত্র বলছে, ঈদুল আজহার পর আগস্টের মাঝামাঝি গিয়েই গত বছরের মতো ফের নিজেকে দলের প্রধান রেখে নতুন কমিটি ঘোষণা করতে পারেন তিনি!

এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে রওশন এরশাদের মোবাইলে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অবশ্য রওশন এরশাদ বরাবরই সংবাদকর্মীদের এড়িয়ে চলেন। তবে দলের ‘রওশনপন্থি’ একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, তথা করোনাভাইরাসের প্রভাব কিছুটা কমলে জাতীয় পার্টিতে নতুন মেরুকরণ দেখা দেবে।

জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের। কাজী ফিরোজ রশিদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ ঢাকা মহানগর নেতারা তার সঙ্গে আছেন। তবে তারাও বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছে দলের একাধিক সূত্র।

অন্যদিকে, জি এম কাদেরের সঙ্গে রওশন এরশাদের বিরোধ অনেকটা প্রকাশ্য। রওশনের সঙ্গে আছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়া উদ্দিন বাবলু, মুজিবুল হক চুন্নুসহ পার্টির সিনিয়র ও শীর্ষ পর্যায়ের সিংহভাগ নেতা ও দলীয় সংসদ সদস্য।

দলের এই দুই ভাগের বিভক্তি এরশাদ জীবিত অবস্থাতেও সক্রিয় ছিল। তার অবর্তমানে তা প্রকট হয়েছে। গত বছরের পাল্টাপাল্টি নেতৃত্ব বিরোধ প্রকাশ্য হওয়ার পর দৃশ্যমান পর্যায়ে স্তিমিত হয়ে এসেছিল। তবে নেতাকর্মীরা বলছেন, এই বিরোধ কখনোই দূর হয়নি।

এর মধ্যেই দলের তৃতীয় একটি বলয় গড়ে উঠেছে। আর দৃশ্যপটে না থেকেও এই বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদিশা সিদ্দিকী। তবে ধারার দিক থেকে পৃথক হলেও বলয়টি ঝুঁকে আছে কিছুটা রওশনের দিকেই। বিদিশার মতে, জাতীয় পার্টির অবস্থা সঙ্গীন। পার্টিতে চলছে জি এম কাদেরের একনায়কতন্ত্র। তিনি ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চলছেন। ফলে দলে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। এভাবে একটি পার্টি চলতে পারে না।

এমন পরিস্থিতিতে গত ১৪ জুলাই ছিল এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। দলের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুবাষির্কী পালন করা হয়েছে তিন স্থানে। রংপুরে জিএম কাদের এরশাদের সমাধিতে ফুল দিতে গেছেন, সঙ্গে নেননি রওশনপন্থি কাউকে। মৃত্যুবার্ষিকীতে রওশন এরশাদ ও বিদিশার ‘কব্জায়’ থাকা এরশাদের ট্রাস্ট বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে আয়োজন করেছিল মিলাদ মাহফিল। বিভক্তি মেটাতে রওশনের বাসায় দোয়া মাহফিলে গিয়েছিলেন জি এম কাদের। তবে প্রেসিডেন্ট পার্কে যাননি তিনি।

দলীয় সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে বছরজুড়ে টানাটানি হলেও আগামী কাউন্সিলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। রওশনপন্থিরা চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক এই ফার্স্ট লেডিকেই দেখতে চান। সে উদ্দেশ্যে এখন থেকেই তারা ‘পকেট মিটিং’ করছেন। সরাসরি বৈঠক না হলেও রওশনপুত্র সাদ এরশাদের উপস্থিতিইে বিদিশা ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের পাশে থাকবেন তিনি। এছাড়াও রওশন এরশাদের মাথার ওপর ‘অদৃশ্য শক্তি’র ছায়া আছে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে সময়ের অপেক্ষায় রওশন।

এদিকে নিজ এলাকা রংপুরকে হাতে রাখার চেষ্টা করছেন জি এম কাদের। তবে রংপুরে বিদিশার প্রভাবও কম নয়। সরাসরি রাজনীতির মাঠে নামার ঘোষণা না দিলেও তিনিও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। আর তার পেছনে উদ্দেশ্য— জি এম কাদেরের বলয় ভেঙে দেওয়া!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা সারাবাংলাকে বলেন, রওশন-বিদিশা মিলে গেলে জাতীয় পার্টির রাজনীতির মাঠে অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়বেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। আর রওশন ও বিদিশা আলাদা আলাদা বলয় নিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে তিন ধারায় বিভক্ত জাতীয় পার্টিতে রওশনপন্থিরাই এগিয়ে থাকতে পারেন।

দলের একাধিক সূত্র বলছে, ‘এগিয়ে থাকা’র এই হিসাবেই সুযোগ খুঁজছেন রওশন এরশাদ। এর জন্য ডিসেম্বরের কাউন্সিল পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তবে সেটি না পারলে ডিসেম্বরের কাউন্সিলেই তিনি ‘ঘুরে দাঁড়াবেন’— এমন আশাই করছেন।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে নিজের নেতৃত্ব নিয়ে দৃঢ় অবস্থানে থাকার প্রত্যয় জানালেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, এসব বিষয় নিয়ে কিছু বলার নেই। জাতীয় পার্টির একটি গঠনতন্ত্র আছে। সেই অনুযায়ী দলের নেতাকর্মীরা তাদের নেতা নির্বাচিত করেছেন। এটাকে কেউ মানবেন আর কেউ মানবেন না— সেটা হয় না। দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই চলবে। এটা নিয়ে কিছু বলার নেই।জি এম কাদের আরও বলেন, কেউ যদি আলাদা কিছু করতে চায়, সেটা করতে পারে। কিন্তু সেটার কোনো বৈধতা থাকবে না।সুত্র-সারাবাংলা।






Related News