উৎসব মানেই আনন্দ, আর বাঙালির কাছে ঈদ মানে নাড়ির টানে ঘরে ফেরা। কিন্তু এই ফেরার আকুতি যখন জীবনের ঝুঁকিকে তুচ্ছ করে এক চরম অরাজকতায় রূপ নেয়, তখন প্রশ্ন জাগে আমাদের শিক্ষা ও রুচিবোধ নিয়ে। ট্রেনের জানালা দিয়ে মানুষকে ভেতরে ঠেলে দেওয়া কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ছাদে চড়া—এই দৃশ্যগুলো কেবল একটি যাতায়াত সমস্যার চিত্র নয়, বরং এটি একটি জাতির সামগ্রিক নৈতিক ও আচরণগত সংকটের প্রতিফলন। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসেও যখন আমাদের বর্বরোচিত উপায়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়, তখন উন্নয়নের চাকচিক্য ম্লান হয়ে যায়। একটি আদর্শ ও মানবিক জাতি গঠনে সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবারের যে সম্মিলিত দায়বদ্ধতা রয়েছে, ঈদযাত্রার এই ‘বিড়ম্বনা’ যেন আমাদের সেই ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ঈদযাত্রার বিড়ম্বনা: অমানবিকতার এক চরম চিত্র:
প্রতিবছর ঈদের আগে আমরা দেখি এক বীভৎস দৃশ্য। মানুষ উন্মাদ হয়ে পড়ে ঘরে ফেরার নেশায়। ট্রেনের কামরায় জায়গা না পেয়ে জানালার গ্রিল গলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা, ট্রেনের ছাদে উপচে পড়া ভিড় কিংবা ইঞ্জিনের তপ্ত লোহা ধরে ঝুলে থাকা—এই দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয় না যে আমরা একবিংশ শতাব্দীর কোনো সুসভ্য দেশের নাগরিক। সীমান্তে যেভাবে গরু পাচার হয়, ঠিক একইভাবে যেন মানুষগুলো নিজেদের পণ্য হিসেবে গণ্য করছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় সামিল হওয়া কেবল দুঃখজনক নয়, এটি চরম অমানবিকও বটে। সারা বিশ্বের কাছে যখন এই দৃশ্যগুলো প্রচারিত হয়, তখন বাংলাদেশের শিক্ষা, রুচি এবং সামাজিক মর্যাদার চিত্রটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে ধরা দেয়।
সরকারের দায়বদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট:
একটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যদি মানুষের আচরণের পরিবর্তন ঘটাতে না পারে, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের দায়িত্ব কেবল সেতু বা রাস্তা তৈরি করা নয়, বরং নাগরিকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ঈদযাত্রার এই চরম বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় সুশাসনের অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর এই সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন সমাধান হচ্ছে না? রেলওয়ে এবং সড়ক পরিবহন বিভাগ কেন বিকল্প উন্নত ব্যবস্থা বা কঠোর শৃঙ্খলার প্রবর্তন করতে পারছে না? একটি দেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই দেশের রেলস্টেশনে মানুষের এমন পশুর মতো আচরণ সেই স্বপ্নকে উপহাস করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবই নাগরিকদের এই হঠকারী আচরণের পথে ঠেলে দেয়।
নাগরিকের দায়িত্ব ও রুচিবোধের প্রশ্ন:
অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আমরা যতটা সোচ্চার, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন। একজন সুনাগরিক হিসেবে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং জনশৃঙ্খলা নষ্ট করা কখনোই কাম্য নয়। ট্রেনের ছাদে ওঠা বা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা কেবল আইন অমান্য করা নয়, এটি নিজের প্রতি এবং সমাজের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের রুচি এবং আচরণের যে অধঃপতন ঘটেছে, তা ঈদযাত্রার এই ভিড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা না করে যেকোনোভাবে নিজের লক্ষ্য অর্জন করার এই যে মানসিকতা, তা আসলে একটি স্বার্থপর প্রজন্মের ইঙ্গিত দেয়। নাগরিক হিসেবে নিজেদের সম্মান রক্ষা করা এবং সামাজিক সৌজন্য বজায় রাখা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।
শিক্ষার প্রভাব ও শিক্ষাব্যবস্থার গলদ:
আমাদের পাঠ্যবইয়ে অনেক বড় বড় নীতিবাক্য আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ কোথায়? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কিন্তু প্রকৃত ‘মানুষ’ গড়ার কারিগর হিসেবে তা ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল আচরণগত পরিবর্তন। আমরা তথাকথিত শিক্ষিত হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের মধ্যে নাগরিক বোধ, নীতি-নৈতিকতা এবং শিষ্টাচার গড়ে উঠছে না। কোন শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হলাম?’ যেখানে জীবনের মায়া নেই, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, সেখানে পুথিগত বিদ্যা কেবল কিছু সনদপত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। শিক্ষামন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে যে, শিক্ষার মান কেবল অবকাঠামো বা পাসের হারে নয়, বরং মানুষের আচরণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের তুলনা: শিক্ষা ও সমাজ কাঠামো:
জাপান বা ইউরোপের দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে শৈশব থেকে পাওয়া নৈতিক শিক্ষা। জাপানে শিশুদের পাঠ্যক্রমের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে শিষ্টাচার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেখানে শেখানো হয় কীভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয়, কীভাবে বৃদ্ধ ও শিশুদের সম্মান করতে হয় এবং রাষ্ট্রের সম্পদের যত্ন নিতে হয়। তাদের রেল ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। কারণ, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল প্রযুক্তিবিদ তৈরি করে না, বরং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। অন্যদিকে, আমরা প্রযুক্তি এবং উন্নয়নকে গ্রহণ করছি ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়নের ধারক হওয়ার মতো উন্নত আচরণ শিখছি না।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা:
একটি শিশু প্রথম শিক্ষা পায় তার পরিবার থেকে। বাবা-মা যদি আইন অমান্য করেন বা বিশৃঙ্খল আচরণ করেন, তবে সেই শিশুটিও বড় হয়ে তাই শেখে। বর্তমানে আমাদের পরিবারগুলোতেও সৌজন্যবোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা কমে গেছে। প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহ—এই আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি আজ চরমভাবে উপেক্ষিত। সমাজ আজ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। সম্মিলিত উৎসব পালনের যে আনন্দ, তা আজ অন্যের অধিকার হরণ করে নিজের স্বার্থ হাসিলের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। আদর্শ জাতি গঠনে পরিবারকে হতে হবে শিষ্টাচার শিক্ষার প্রথম কেন্দ্র এবং সমাজকে হতে হবে তার রক্ষাকবচ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বর্তমান বৈপরীত্য:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সুসভ্য সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। আমাদের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এই অসভ্য আচরণ এবং বর্বরোচিত শৃঙ্খলাহীনতা সেই বীর শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা। আমরা কি এমন একটি দেশ চেয়েছিলাম যেখানে মানুষ পশুর মতো ট্রেনের ছাদে ঝুলে বাড়ি ফিরবে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, এর মূল সুর ছিল একটি উন্নত রুচি ও আদর্শের জাতি গঠন। আজকের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা সেই চেতনার পরিপন্থী।
সমাধানের পথ: জাতি গঠনে নতুন রূপরেখা:
জাতিকে এই চরম সংকট থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে:
ক. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে আচরণগত ও নৈতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নাগরিক দায়িত্ব ও শিষ্টাচারকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
খ. আইনের কঠোর প্রয়োগ: উৎসবের সময় পরিবহন ব্যবস্থায় কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া চলবে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করলে কঠোর দণ্ড এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
গ. সামাজিক সচেতনতা: গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। রুচিবোধ এবং সৌজন্যবোধ যে একটি উন্নত জাতির পরিচয়, তা প্রচার করতে হবে।
ঘ. পরিকাঠামো উন্নয়ন: ঈদযাত্রার চাহিদা মাথায় রেখে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে তার মানুষের চরিত্রে। দালানকোঠা আর প্রশস্ত রাস্তা উন্নয়নের বাহ্যিক রূপ হতে পারে, কিন্তু সেই রাস্তার ওপর চলাচলকারী মানুষের আচরণই বলে দেয় দেশটি কতটা সভ্য। ঈদযাত্রার এই ‘ভয়ঙ্কর’ দৃশ্য আমাদের লজ্জিত করে। এটি কেবল সরকারের ব্যর্থতা নয়, আমাদের সমাজ ও শিক্ষার ব্যর্থতা। তবে আশার কথা হলো, সমস্যাগুলো আজ চিহ্নিত। এই জাতিকে সঠিক পথে ফেরাতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা আর এমন বর্বরোচিত দৃশ্য দেখতে চাই না। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—আমরা কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং শিক্ষা, রুচি এবং মানবিকতায় একটি আদর্শ জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। তবেই সার্থক হবে আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা।
লেখক: ডক্টর দিপু সিদ্দিকী, কবি এবং প্রাবন্ধিক। ডিন – কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা।