শিক্ষা সংস্কার: শৃঙ্খলা থেকে অগ্রগতির সম্ভাবনা- অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

শিক্ষাকে একটি জাতির মেরুদণ্ড বলা হলেও, আশির দশকের শেষভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো গণ-নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চরম প্রশাসনিক ব্যাধিতে জর্জরিত ছিল। এ প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা ব্যবস্থার সততা ও মান ফিরিয়ে আনতে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন তাদের মধ্যে অন্যতম। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর গৃহীত কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা নীতিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুই দেশের শিক্ষা প্রশাসনে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকীএকবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যখন অভূতপূর্ব নৈতিক সংকটে ভুগছিল, তখন কেবল সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকেই ধূলিসাৎ করে দেয়। তৎকালীন সময়ের এই অচলাবস্থা কেবল দেশীয় মানদণ্ডকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের অর্জিত ডিগ্রিগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল।

এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো শিক্ষাঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে (“Grades and jobs for sale: The neverending saga of question paper leaks”) উল্লেখ করা হয়, ২০০২ সালের দিকে হঠাৎ করে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে আকস্মিক ভিজিট, কেন্দ্র বাতিল এবং অসদুপায়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার ফলে দেশজুড়ে শিকড় গেড়ে বসা অনিয়মের চর্চা স্তব্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সালের প্রতিবেদনেও উঠে আসে যে, মাঠপর্যায়ের এই প্রশাসনিক দৃঢ়তার কারণেই পাবলিক পরীক্ষাগুলোর হারানো শৃঙ্খলা অনেকাংশে ফিরে এসেছিল।

পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে শ্রেণিকক্ষ: কৌশলগত রূপান্তর:

পরীক্ষায় অনিয়ম থামানো নিঃসন্দেহে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছিল, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে তা যথেষ্ট ছিল না। ২০২৬ সালে পুনরায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ঘোষিত পথনকশাটি নির্দেশ করে যে, ব্যবস্থাটিকে কেবল ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার মানসিকতা থেকে বের করে ‘প্রকৃত উন্নয়ন’-এর দিকে নিয়ে যাওয়াই এখন মূল লক্ষ্য।

প্রথম আলো-র ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন (“শিক্ষায় তিন অগ্রাধিকারের কথা জানালেন শিক্ষামন্ত্রী”) থেকে জানা যায়, দায়িত্ব নিয়েই তিনি তিনটি নির্দিষ্ট কৌশলগত ক্ষেত্রে আলোকপাত করেছেন:

শ্রেণিকক্ষে প্রত্যাবর্তন: শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি কমিয়ে নিয়মিত শ্রেণিমুখী করা।

কারিকুলাম পুনর্মূল্যায়ন:বিদ্যমান জাতীয় শিক্ষাক্রমকে বাস্তবতার নিরিখে পরিমার্জন করা।

কারিগরি আধুনিকায়ন:প্রথাগত মুখস্থবিদ্যার বদলে হাতেনাতে শেখার সুযোগ বাড়ানো।

একই দিনে দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে (“Milon vows ‘big leaps’ to overhaul education sector”*) ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাথে তাল মেলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে কারিকুলামে একীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য একটাই—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণানির্ভর ‘Center of Excellence’-এ রূপান্তর করে দেশেই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই গতিপথ পরিবর্তনকে কেবল একটি প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে না দেখে এর দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:

মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: পরীক্ষার হলে অসদুপায় বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় সুফল ছিল শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন। “কঠোর পরিশ্রম ও পড়াশোনা ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়”—এই ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ায় প্রকৃত মেধা সঠিক মূল্যায়নের সুযোগ পায়।

সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা:পরীক্ষার স্বচ্ছতা ফিরলে ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। বিশেষ করে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য গমনকারী শিক্ষার্থীদের সনদ মূল্যায়নে এটি প্রত্যক্ষ সহায়তা করে।

শ্রেণিকক্ষের গুণগত মান ও শিক্ষক দক্ষতা: পরীক্ষা কেন্দ্র সামলানো আর শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। কেবল প্রযুক্তি বা নতুন কারিকুলাম যুক্ত করলেই শিক্ষা উন্নত হয় না, যদি না শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা ও ক্লাসরুমের অবকাঠামো সংস্কার করা যায়। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বড় ধরণের বিনিয়োগ না এলে সংস্কারগুলো কাগজে-কলমেই আটকে থাকার ঝুঁকি থেকে যায়।

অতীতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য এসেছিল, তাকে ভিত্তি ধরে এখন সময়ের প্রয়োজনে আরও গভীরে যেতে হবে। বিশ শতকের প্রশাসনিক কঠোরতা আর একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার সঠিক মেলবন্ধন ঘটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করতে হলে শুধু অবকাঠামো তৈরি বা পরীক্ষা তদারকিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক প্রয়োগ। তবেই শিক্ষা কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যম না হয়ে জাতির প্রকৃত অগ্রগতির হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

Share: