সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এবং তার সূত্র ধরে উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের সাবেক এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার ঘটনাটি দেশের সচেতন মহলকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কিংবা রাজপথে তাদের অধিকারের দাবি নতুন কিছু নয়। তবে আন্দোলনের উত্তেজনায় ভেসে যাওয়া একটি কিশোরী মেয়ের ভাষা, শারীরিক ভঙ্গি কিংবা আচরণ হয়তো প্রচলিত সমাজকাঠামোর পরিশীলিত রূপকে ছাপিয়ে গেছে। তার সেই অমার্জিত ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দেখে অভিভাবক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার মনে গভীর কিছু প্রশ্ন জেগেছে—এই আচরণের জন্য কি কেবল ওই কিশোরী একাই দায়ী? নাকি এই রুক্ষতা আসলে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়, নীতি-নৈতিকতার ধস এবং শিক্ষাব্যবস্থার দেউলিয়াত্বের এক জীবন্ত ইশতেহার?
আমরা যদি ঘটনাটিকে একটি একক বা বিচ্ছিন্ন চপলতা হিসেবে দেখে ফাইল বন্ধ করে দিই, তবে তা হবে চরম আত্মঘাতী। এই শিক্ষার্থীর আচরণ মূলত বর্তমান প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের একটি ক্ষুদ্র জলছাপ মাত্র। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ঐতিহ্যগত শ্রদ্ধাবোধের জায়গায় ফাটল, পারিবারিক অনুশাসনের শৈথিল্য এবং সামাজিক রীতিনীতির যে ব্যাপক ধস আমরা দীর্ঘদিন ধরে অবলোকন করছি, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত ছিল এই ব্যাধির মূলে হাত দেওয়া, কিশোর মনস্তত্ত্বের ক্ষতগুলো নিরাময় করা। তা না করে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন তার নিজেরই সাবেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে জিডি করে, তাকে আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে দাগী আসামি বানানোর আয়োজন করে, তখন তা মূল অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ বলে প্রতীয়মান হয়। একে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা কিশোর অপরাধ ও তার প্রতিকারের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানবিক চিত্র দেখতে পাই। ইউরোপ কিংবা আমেরিকার আধুনিক শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থায় এই বয়সটিকে বলা হয় ‘রূপান্তরকালীন মনস্তাত্ত্বিক দোলাচল’ (Psychological Transition)। এই বয়সে হরমোনের পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক চাপ ও আবেগের আতিশয্যে একজন কিশোর বা কিশোরী ভুল করতেই পারে। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নিয়মের বাইরে গেলে কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তাকে সঙ্গে সঙ্গে আইনি বেড়াজালে আটকে দেওয়া হয় না। তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করার জন্য কোনো মামলা বা জিডির পথে হাঁটে না রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠান। বরং তাকে মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা (Counseling), সমাজসেবামূলক কাজ (Community Service) এবং সংশোধনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়। উন্নত বিশ্ব বোঝে, একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যদি কোনো কিশোরের গায়ে আইনি লেবেল এঁটে দেওয়া হয়, তবে সে চিরতরে সমাজের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়ে অপরাধী হয়ে উঠবে। অথচ আমাদের দেশে আমরা অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে একটি মেয়ের কচি বয়সেই তার কপালে ‘দাগী আসামি’র সিল মেরে দিতে দ্বিধা করলাম না।
এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। জানা গেছে, শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতিক্রমে ওই ছাত্রীকে আগেই প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠান দাবি করতেই পারে, সে বর্তমানে তাদের শিক্ষার্থী নয় এবং তাদের পরিচয়পত্র ব্যবহার করার অধিকার তার নেই। কিন্তু আইনি যৌক্তিকতা আর নৈতিক অভিভাবকত্ব কি এক জিনিস? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি কেবল জিপিএ-৫ উৎপাদনের কারখানা, নাকি মানুষ গড়ার পবিত্র আঙিনা? কোনো শিক্ষার্থী যদি বিপথগামী হয়, তবে তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার দায় কি প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না? টিসি দেওয়ার পূর্বে কিংবা এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে সংশোধনের কতটুকু সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা আজ গভীর অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। সরকারকে খুশি করতে গিয়ে কিংবা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে একদল অতি-উৎসাহী কর্মকর্তা যেভাবে একটি কিশোরীকে চরম সামাজিক ও আইনি অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিলেন, তা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকসুলভ চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করেছে।
এই সংকটের শেকড় আরও গভীরে—আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। পরিবার হলো একটি শিশুর নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। কিন্তু বর্তমানের পুঁজিবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় অভিভাবকেরা সন্তানদের পেছনে কতটুকু গুণগত সময় দিচ্ছেন? নৈতিক মূল্যবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা আর মার্জিত আচরণের শিক্ষা কি আমরা পরিবার থেকে দিতে পারছি? যখন পরিবার ব্যর্থ হয়, তখন দায় পড়ে সমাজের ওপর। অথচ আমাদের সমাজ আজ এক গভীর নৈতিক দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে সমাজে প্রতিনিয়ত তরুণদের সামনে কোনো ইতিবাচক আদর্শ, সৎ মেন্টর কিংবা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব উপস্থাপন করা যাচ্ছে না, সেই সমাজ কোন নৈতিক অধিকারে একজন কিশোরীর কাছ থেকে মার্জিত ও পরিশীলিত আচরণ প্রত্যাশা করে? আমরা সমাজকে একটি রুক্ষ পাথুরে প্রান্তরে পরিণত করেছি, আর আশা করছি সেখান থেকে সুগন্ধি ফুল ফুটবে—এ তো চরম দ্বিচারিতা।
একটি কিশোরী মেয়ে যখন তার কৈশোরের আবেগ আর রাজনৈতিক উত্তেজনার সমীকরণে ভুল করে বসে, তখন তাকে সাইবার বুলিং বা ট্রলের শিকার বানিয়ে সমাজ আনন্দ পায়। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো আজ এক ধরনের হিংস্র থিয়েটারে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাউকে ভুল করতে দেখলেই সবাই মিলে তাকে ছিঁড়ে খেতে উদ্যত হয়। এই সম্মিলিত নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করে, আমরা ভেতর থেকে কতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। এই মেয়েটি যে আচরণ করেছে, তা যদি অন্যায়ও হয়ে থাকে, তবে তাকে শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল বড়দের। কিন্তু আমরা তাকে শোধরানোর সুযোগ না দিয়ে, তার বয়স ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এমন এক অন্যায্য ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিলাম, যা চরম অদূরদর্শিতারই নামান্তর।
কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র এত বড় বৈষম্য ও অন্যায় তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে করতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে, ভয় দেখিয়ে বা আইনের ভয়াল থাবায় পিষে ফেলে কখনো কিশোর মনকে জয় করা যায় না, বরং তাতে ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়। আজ যদি আমরা এই মেয়েটির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিই, তবে তা দেখে আরও হাজারো কিশোর-কিশোরী রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে।
তাই এখনই সময় রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিনির্ধারকদের চোখ খোলার। অতি-উৎসাহী হয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার বা সরকারকে তোষামোদ করার এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শাস্তিমূলক আইনকানুন পুনর্বিবেচনা করতে হবে। থানাপুলিশ কিংবা জিডির মতো কঠোর পথ পরিহার করে স্কুল-কলেজগুলোতে স্থায়ী কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ভেতরের ক্ষোভ ও আবেগকে ইতিবাচক পথে প্রবাহিত করতে পারে। একই সাথে পরিবার ও সমাজকে তাদের হারানো নৈতিক দায়িত্ব পুনরুদ্ধার করতে হবে।
একটি কিশোরীর ভুলকে অপরাধের দাঁড়িপাল্লায় না মেপে, তার বয়স ও মানসিক অবস্থাকে বিবেচনা করে অবিলম্বে এই জিডি প্রত্যাহার করা উচিত। আসুন, ক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ সমাজ না হয়ে আমরা এক সহনশীল ও সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তুলি। কারণ, কিশোরদের শাস্তি দিয়ে নয়, তাদের ভালোবেসে ও আগলে রেখেই কেবল একটি সুস্থ ও সুন্দর রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব।
লেখক: শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর দিপু, সিদ্দিকী ডিন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা।