অহমিকা বনাম যৌথতার শক্তি -দিপু সিদ্দিকী

অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকীমহীরুহ হয়ে ওঠার জন্য শিকড়কে যেমন মাটির গভীরে প্রবেশ করাতে হয়, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনেও সার্থকতা পেতে হলে সমাজ, বন্ধুত্ব ও যৌথ প্রয়াসের আঙিনায় নিজেকে সমর্পণ করতে হয়।

প্রকৃত মনুষ্যত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য কোনো স্কোরলাইন বা ফিফা স্ট্যাটসের অ্যালগরিদমে পরিমাপ করা অসম্ভব। মহত্ত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব কেবল রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর আসল স্থায়িত্ব লুকিয়ে থাকে মানবিক সম্পর্কের বুননে ও বিনয়ে।

আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বে নিখুঁত শারীরিক সামর্থ্য আর যান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের এক চূড়ান্ত প্রতীক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাঁর চেয়ে শক্তিশালী কিংবা পুঙ্খানুপুঙ্খ অ্যাথলেট সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। তবে এই অতি-মানবীয় কাঠামোর গভীরেই নিহিত রয়েছে জীবনের এক গভীরতম মনস্তাত্ত্বিক সংকট। খেলা কিংবা যাপিত জীবনের আদিম সহজাত আবেগ ও মানবিক সংযোগকে তিনি একপ্রকার যান্ত্রিক পেশাদারিত্বের নিগড়ে বন্দী করেছেন।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ড্রেসিংরুম কখনো যৌথতার স্পন্দন হতে পারেনি; তা থেকে গেছে কেবলই একটি ফর্মাল কর্মক্ষেত্র। সতীর্থরা সেখানে প্রীতি বা আত্মিক মেলবন্ধনের অংশীদার নন, বরং লক্ষ্য অর্জনের সমান্তরাল কিছু বস্তুনিষ্ঠ সহকর্মী মাত্র। রোনালদোর অন্তর্জগতের দিকে তাকালে এক অপার্থিব সামাজিক শূন্যতা চোখে পড়ে। তাঁর নিভৃত অবকাশে, বিলাসবহুল ইয়টে যখন উৎসবের আলো জ্বলে, সেখানে কোনো ফুটবলীয় সতীর্থের ছায়া মেলে না। নিজেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে তিনি যেন মানুষের গভীরতম সামাজিক প্রবৃত্তি—বন্ধুত্ব আর সৌহার্দ্য থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছেন।

ব্যক্তিগত অহমিকা যখন সমষ্টির শক্তিকে অস্বীকার করে, তখন চূড়ান্ত অর্জনের মুহূর্তও এক করুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়। মানুষের মনুষ্যত্ব পূর্ণতা পায় কেবল তখনই, যখন সে অন্যকে বুকে টেনে নিয়ে যৌথ উদ্যোগে কোনো সৃষ্টিকে সার্থক করে তোলে।

যৌথ মানসিকতার এই অভাব কিন্তু মাঠের ভেতরেও এক অলিখিত ফাটল ধরায়। পর্তুগাল দলের খেলায় প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, ক্রান্তিলগ্নে রোনালদোর দিকে বল বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতীর্থদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক কুণ্ঠা কাজ করে। এটি কেবল কোনো ট্যাকটিক্যাল ছক নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে লালিত সামাজিক দূরত্বের এক অবচেতন বহিঃপ্রকাশ। সংবাদ সম্মেলনগুলোতেও দলের তরুণেরা যখন তাঁর বিষয়ে কথা বলেন, সেখানে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রীতি বা আত্মিক টান খুঁজে পাওয়া ভার। তাঁদের পরিমিত, মেপে মেপে বলা শব্দগুলোর আড়ালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক কঠোর ও আধিপত্যকামী সিইও-এর প্রতি সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্কুচিত দায়বদ্ধতা।

এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। এই মানুষটি জীবনের এক শ্বাশত সত্যকে শৈশবেই বুকে ধারণ করেছিলেন—যৌথ প্রচেষ্টা ছাড়া মানুষের একক মহত্ত্ব মূল্যহীন। তাঁর পায়ে বিধাতা জাদুর স্পর্শ দিয়েছেন সত্যি, কিন্তু মেসি জানেন যে, সহযোদ্ধারা যদি তাঁর জন্য নিজেদের বিলিয়ে না দেয়, তবে সেই জাদুর কোনো কার্যকারিতা থাকে না। তিনি মাঠ কিংবা ড্রেসিংরুমকে কোনো যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভাবেননি, একে রূপ দিয়েছেন একান্নবর্তী সামাজিক পরিবারে। সুয়ারেজ, আগুয়েরো, ডি পল কিংবা নেইমারদের সাথে তাঁর বন্ধন কেবল মাঠের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি; তা সামাজিক জীবনের নিবিড় বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। অবসরে তাঁরা একসাথে হাসেন, কাঁদেন ও আনন্দ ভাগ করেন। সতীর্থদের তিনি সহকর্মী হিসেবে নয়, সহোদর মনুষ্যত্বের আবহে দেখেছেন।

যৌথ উদ্যোগে কাজ করার এই প্রবৃত্তি আর্জেন্টিনার ফুটবলকে এক অভূতপূর্ব শক্তিতে রূপান্তর করেছে। ড্রেসিংরুমে মেসি কেবল একজন দলনেতা নন, তিনি যৌথ চেতনার মূল চালিকাশক্তি। সতীর্থরা কেবল নিজের ক্যারিয়ারের জন্য খেলেন না, তাঁরা যেন মেসির সম্মানরক্ষার জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকেন। মাঠে যখনই মেসির ওপর কোনো আঘাত আসে, ডি পল বা ওটামেন্ডিদের ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে আসা কেবল কোনো দায়বদ্ধতা নয়, তা এক পরম বন্ধুর প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও সুরক্ষার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।

এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত দর্শনের চূড়ান্ত ও নির্মম দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের অন্তিম মুহূর্তগুলোতে। পরাজয়ের পর যখন রোনালদো মেক্সিকো বা কাতারের ঘাসে একা কাঁদছিলেন, তখন গোটা পর্তুগাল দল ছিল বিচ্ছিন্ন, ছন্নছাড়া। একটি হাতও এগিয়ে আসেনি তাঁর কাঁধে ভরসা দিতে। নিঃসঙ্গ এক মহানায়ক একা কাঁদতে কাঁদতে টানেলের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন। অথচ অন্যদিকে, মেসি যখন হাসেন বা কাঁদেন, তখন এগারো জন গ্ল্যাডিয়েটর এসে তাঁকে ভালোবাসার মানবপ্রাচীর দিয়ে আগলে রাখে।

প্রকৃত মনুষ্যত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য কোনো স্কোরলাইন বা ফিফা স্ট্যাটসের অ্যালগরিদমে পরিমাপ করা অসম্ভব। মহত্ত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব কেবল রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর আসল স্থায়িত্ব লুকিয়ে থাকে মানবিক সম্পর্কের বুননে ও বিনয়ে। মেসি আমাদের শেখান, সাফল্যের চূড়ায় উঠলেও মাটির টান এবং সমষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা কতটা জরুরি। মহীরুহ হয়ে ওঠার জন্য শিকড়কে যেমন মাটির গভীরে প্রবেশ করাতে হয়, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনেও সার্থকতা পেতে হলে সমাজ, বন্ধুত্ব ও যৌথ প্রয়াসের আঙিনায় নিজেকে সমর্পণ করতে হয়।

Share: