বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টিতে ড. এহসানুল হক মিলনের ভূমিকা: একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা – অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নাম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে পরীক্ষায় গণ-নকল রোধ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে তিনি যে সাহসী পদক্ষেপ নেন, তা তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে পুনরায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বায়ন, কারিকুলাম পরিমার্জন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী শিক্ষার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বহুল আলোচিত বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এর গৃহীত পদক্ষেপ গুলো নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী। পাঠকদের সামনে তা তুলে ধরা হলো:

অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকীভূমিকা: শিক্ষাকে একটি জাতির মেরুদণ্ড বলা হলেও, বিশ শতকের শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে ‘নকল’ ও ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ এক মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পরীক্ষার সততা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারে যে কয়েকজন প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ আলোচিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে এহসানুল হক মিলন অন্যতম। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড পর্যন্ত শিক্ষা প্রশাসনে তাঁর গৃহীত কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও সংস্কারমূলক চিন্তা বাংলাদেশের শিক্ষা ধারায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করে।

সংবাদপত্রের তথ্যানুসারে প্রধান পদক্ষেপ ও ইতিবাচক দিকসমূহ:

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে তাঁর নেওয়া উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:

১. পাবলিক পরীক্ষায় গণ-নকল ও অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থান:

দুই হাজার দশকের শুরুতে মাধ্যমিক (SSC) ও উচ্চ মাধ্যমিক (HSC) পরীক্ষায় নকল বন্ধে তিনি অভূতপূর্ব কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

কঠোর তদারকি: তৎকালীন প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে আকস্মিক হেলিকপ্টার অভিযান ও সারপ্রাইজ ভিজিটের মাধ্যমে তিনি কেন্দ্র পরিদর্শকদের দায়িত্বশীল করেন এবং অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে ঘটনাস্থলেই কঠোর ব্যবস্থা নেন।

প্রশাসনিক শৃঙ্খলা: শিক্ষক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ জাবাবদিহিতা নিশ্চিত করে পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের চর্চাকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (প্রতিবেদন: Grades and jobs for sale: The neverending saga of question paper leaks): ২০০২ সালে এহসানুল হক মিলনের আকস্মিক পরিদর্শন ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরীক্ষায় নকলের সংস্কৃতি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।

দ্য ডেইলি স্টার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬): প্রথম মেয়াদে অনিয়ম রোধের কথা স্মরণ করে উল্লেখ করা হয়, “পরীক্ষায় নকল বন্ধ ও প্রশ্ন ফাঁস রোধের সাফল্য অর্জিত হয়েছিল”।

২. আধুনিকায়ন, কারিকুলাম সংস্কার ও বৈশ্বিক মানদণ্ড

শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি পুনর্গঠনে শুধুমাত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন:

 তিনটি প্রাথমিক অগ্রাধিকার: ২০২৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি তিনটি মূল বিষয়ে জোর দেন—শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা, জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা/পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন।

 প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাথে সংগতি রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স ও ন্যানোটেকনোলজি শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

গ্লোবাল এডুকেশন হাব: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘Center of Excellence’ হিসেবে গড়ে তুলে বৈদেশিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ভিশন নির্ধারণ করেন।

সংবাদপত্রের সূত্র:

প্রথম আলো (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শিক্ষায় তিন অগ্রাধিকারের কথা জানালেন শিক্ষামন্ত্রী): জাতীয় শিক্ষাক্রম পুনর্মূল্যায়ন ও কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নের প্রশাসনিক রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়।

দ্য ডেইলি স্টার* (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, Milon vows ‘big leaps’ to overhaul education sector): শিক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়।

প্রথম আলো (২৫ জুন ২০২৬, নকলমুক্ত শিক্ষার পর এবার মানোন্নয়নে জোর দেবে সরকার): পরীক্ষায় অনিয়ম দূর করার পর এবার শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেন।

ইতিবাচক দিকসমূহের সার্বিক মূল্যায়ন:

ইতিবাচক প্রভাব ও অর্জন

| নৈতিকতা পুনরুদ্ধার | শিক্ষার্থীদের মাঝে “পড়াশোনা না করে পাস করা যায় না”—এই মৌলিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। |

| প্রশংসনীয় মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন | পরীক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা মূল্যায়নে যথাযথ স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। |

| প্রশাসনিক স্বচ্ছতা | পরীক্ষা কেন্দ্র ও প্রশাসনিক স্তরে জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে কেন্দ্র বাতিল ও অনিয়মে যুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। |

| ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি | প্রথাগত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক শিক্ষাধারার দিকে জোর দেওয়া হয়। |

বাংলাদেশের মত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশে শিক্ষা সংস্কার সহজ কাজ নয়। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের গৃহতি পদক্ষেপগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১. মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন (Psychological Shift):

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী চক্র ও দুর্বল তদারকির কারণে অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। তাঁর গৃহিত দৃশ্যমান ও সরাসরি প্রশাসনিক অভিযান মূলত শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় ইতিবাচক আঘাত হানে। “পড়াশোনা করেই পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করতে হবে”—এই বার্তাটি পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

২. পরীক্ষার মান ও ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা:

পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে গেলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জিত ডিগ্রির মূল্যায়ন কমে যায়। পরীক্ষায় অনিয়ম রোধ করে সনদের সার্বিক নির্ভরযোগ্যতা ও সম্মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল, যা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গমনকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সহায়তা তৈরি করে।

৩. চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক চাহিদার আলোকেই ভবিষ্যৎ পথচলা:

একমাত্র পরীক্ষার কঠোরতাই একটি দেশের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। পরীক্ষা কেন্দ্র শৃঙ্খল করার পর ক্লাসরুমের শিক্ষার মান বৃদ্ধি, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং কারিকুলামকে বাজারমুখী করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মন্ত্রী হিসেবে তাঁর পরবর্তী মেয়াদে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি সক্ষমতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার লক্ষ্যগুলো এই শূন্যস্থান পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সততা ও দৃঢ় মানসিকতার প্রয়োগ কিভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এহসানুল হক মিলনের শিক্ষা প্রশাসনিক কার্যক্রম। পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় বন্ধের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বর্তমানে সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি সংস্কার, প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা ও বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জনে তাঁর এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

লেখক: প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক। তিনি ডক্টর দিপু সিদ্দিকী নামে অধিক পরিচিত। বর্তমানে তিনি রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা’য় ডিন এবং আইকিউএসসি’র পরিচালক হিসেবে কর্মরত।

 

Share: