রক্তের সীমানা পেরিয়ে: ভালোবাসার অমলিন স্মৃতির শ্রদ্ধার্ঘ্য
২৫ সেপ্টেম্বরের এক নিস্তব্ধ ভোরে চলে গেলেন নানু। ঠিক যেভাবে সারাজীবন নিঃশব্দে ভালোবাসার ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছিলেন, সেভাবেই অলক্ষে পাড়ি দিলেন অনন্তের ঠিকানায়।
তিনি আমাদের মোমেন মামার মমতাময়ী মা হলেও পরিবারের সবার কাছে শুধুই ‘মামার মা’ ছিলেন না—ছিলেন আত্মিক বন্ধনে বাঁধা এক পরম স্নেহের আশ্রয়। রক্তের ব্যাকরণ পেরিয়ে তাঁর মমতাসিক্ত হৃদয় সবার জন্য গড়ে তুলেছিল এক নিজস্ব নীড়। পাবনার সমতল থেকে বিক্রমপুরের ইছাপুরা—শ্বশুরবাড়ির শিকড় যেখানেই থাক, প্রকৌশলী নানাভাইয়ের যাযাবর জীবনের বদলি সূত্রে তাঁর জীবন কেটেছে এক ভিটে থেকে অন্য ভিটেয়। কোথাও হয়তো স্থায়ী গৃহকোণ মেলেনি, কিন্তু মানুষকে আপন করে নেওয়ার অকৃত্রিম ভালোবাসাই হয়ে উঠেছিল তাঁর আসল ঠিকানা। তাঁর কথা, প্রীতিময় আতিথেয়তা আর সূক্ষ্ম রসবোধের অন্তরালে স্ফুরিত হতো এক সহজিয়া আভিজাত্য।
২০০৭ সালের শেষের দিকে ধানমন্ডির এক নিভৃত ফ্ল্যাটে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। শৈশবে নিজের নানুকে হারানোর যে সুগভীর শূন্যতা বুকের ভেতর জমাট বেঁধেছিল, তাঁর প্রথম স্পর্শেই তা যেন এক নিমেষে বাষ্প হয়ে গেল। সেই মায়াময় স্মৃতি আজও হৃদয়ে অমলিন—বিশেষ করে ইছাপুরার সেই প্রাচীন ভিটেয় কাটানো শান্ত দিনটি। মেঠোপথ ধরে হেঁটে চলার স্মৃতি, গাঁয়ের মানুষের শ্রদ্ধাবনত চোখ, আর ফেরার বেলায় তাঁর স্বহস্তে তুলে দেওয়া সামান্য কিছু উপহার ও ক্ষেতের শাকসবজি। পার্থিব কোনো মুদ্রায় তার মূল্য নির্ধারণ হয় না; ওগুলো ছিল মাতৃত্বের এক অনন্য, অনর্ঘ উপহার।
তারপর জীবনের স্বাভাবিক স্রোতে আমরা বিচ্ছিন্ন হলাম। দু’টি দশক কেটে গেল সময়ের ঘূর্ণাবর্তে; জীবনসংগ্রামের নানা আয়োজনে খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। ২৫ সেপ্টেম্বর বনানীর সামরিক কবরস্থানের শীতল মাটিতে যখন তাঁকে সমাহিত করা হলো, বুকের গহীনে এক তীব্র অপরাধবোধ কাঁটার মতো বিঁধল—যে মানুষটি অকৃপণভাবে মায়া বিলিয়ে গেলেন, আমি তাঁর কতটুকুই বা ফিরিয়ে দিতে পেরেছি? কিন্তু নানু তো কখনো কোনো প্রতিদানের সমীকরণ মেলাননি; তিনি কেবল নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ভালোবাসতেই জেনেছিলেন।
নানু কেবল এক বাৎসল্যময়ী মা ছিলেন না, ছিলেন এক নীরব কান্ডারী। দেশপ্রেমিক ও প্রথাবিরোধী নীতিবান নানাভাই, প্রকৌশলী মানিক মিয়া যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর আপন আদর্শ আঁকড়ে ধরে দুর্গম পথ হেঁটেছেন, নানু তখন সমান্তরালে আগলে রেখেছেন সংসারের প্রদীপ, ধীর স্থির হাতে মেটায়েছেন প্রতিটি ঝড়ের ঝাপটা। ইতিহাসের কোনো প্রথাগত পাতায় এই নীরব ত্যাগের মহিমা লিখিত থাকে না, অথচ একটি পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীপ্তময় অধ্যায়।
মানুষ তো নশ্বর, একদিন তাকে বিদায় নিতেই হয়। কিন্তু কিছু বিরল মানুষ রয়ে যান পার্থিব সীমানা ছাড়িয়ে—স্মৃতির চিরন্তন রেখায়, এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসিতে, কিংবা অনুভূতির নিভৃত মমতায়। নানু আমাদের শিখিয়ে গেলেন, সম্পর্কের ভিত্তি কেবল রক্তে রচিত হয় না; সম্পর্কের সার্থকতা মমতায়, তার অমরত্ব ভালোবাসায়।
নানু, আপনার কাছে আমার এক জনমের অমোচনীয় ভালোবাসার ঋণ থেকে গেল। জীবনের ক্ষণিক ব্যস্ততার অজুহাতে খোঁজ না নেওয়ার ব্যাকুল অপরাধবোধ নিয়ে আজ শুধু বিনম্র ক্ষমা চাই। করুণাময় আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের শ্রেষ্ঠ স্থানে আসীন করুন। আপনি হারিয়ে যাননি; আপনি রয়ে গেছেন আমাদের স্মৃতির গহীনে, যেখানে পার্থিব কোনো মৃত্যুর ছায়া পড়ে না।
— ড. দিপু সিদ্দিকী