একটি শিশু, একটি বাড়ি, একটি নদ: ফাইয়ান ম্যানশনের জন্মকথা

একটি শিশু, একটি বাড়ি, একটি নদ: ফাইয়ান ম্যানশনের জন্মকথা

জন্মদিনের আনন্দের আড়ালে শেকড়, শিক্ষা, মানবিকতা ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান

 প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকী

কিছু কিছু জন্মদিন কেবল কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালানো কিংবা উপহার বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো কোনো জন্মদিন হয়ে ওঠে একটি পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর উপলক্ষ। কখনো তা আত্মীয়তার বন্ধনকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ করে দেয়, কখনোবা একটি বাড়ি, একটি নদী এবং একটি জনপদের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করে। গত ৭ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে এমনই একটি ব্যতিক্রমী জন্মোৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। আট বছর বয়সী এক বিস্ময়কর বালক ফা ইয়ানের জন্মদিনকে ঘিরে সেদিন কুলিয়ারচরের পৈতৃক ভিটায় যে আনন্দমুখর পারিবারিক মিলনমেলা তৈরি হয়েছিল, তা আমার কাছে নিছক একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল না; বরং ছিল একটি পরিবারের জীবনদর্শন, মানবিকতা এবং শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার জীবন্ত পাঠ।

ফাইয়ানের জন্মদিন ৫ নভেম্বর। জাপানে বেড়ে ওঠা এই বাংলাদেশি শিশুটি তার জন্মদিনের আনন্দটুকু কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়নি। জাপান থেকে বাংলাদেশে এসে কাজিন, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে দাদাবাড়িতে জন্মোৎসব পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। আট বছরের একটি শিশুর কাছে জন্মদিন মানে সাধারণত নিজের জন্য আনন্দ, উপহার আর উৎসব। কিন্তু ফা ইয়ানের কাছে জন্মদিন যেন হয়ে উঠেছে সবাইকে একত্র করার উপলক্ষ। তার এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই আমি একটি বিশেষ মানবিক বোধের পরিচয় পেয়েছি।

৭ নভেম্বর আমরা সবাই হাজির হয়েছিলাম ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখানদের উত্তর পাড়ে গড়ে ওঠা পারিবারিক আবাসস্থল ফাইয়ান ম্যানশনে। নদটি যেন তার আপন গতিতে বয়ে চলেছে, আর তার তীরে দাঁড়িয়ে আছে সাদা ধবধবে এক রাজকীয় স্থাপনা। বিশাল আয়তাকার ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অসাধারণ নির্মাণশৈলীর একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। স্থাপত্যের সৌন্দর্য আছে, আভিজাত্য আছে, আধুনিকতার ছোঁয়া আছে; কিন্তু আমার কাছে বাড়িটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এর নির্মাণসামগ্রী কিংবা বাহ্যিক অবয়বে নয়। এর প্রকৃত সৌন্দর্য এর পেছনের দর্শনে।

Screenshot

একটি বাড়ি ইট, বালু, সিমেন্ট আর রড দিয়ে নির্মিত হয়। কিন্তু একটি পরিবার নির্মিত হয় ভালোবাসা, শিক্ষা, মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার ভিত্তিতে। ফাইয়ান ম্যানশনকে আমার কাছে সেই দ্বিতীয় নির্মাণেরই একটি প্রতীক বলে মনে হয়েছে।

নদীর পাশে একটি বাড়ি, বাড়ির ভেতরে একটি দর্শন

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী আমাদের ভূগোলের পরিচয়, অর্থনীতির শক্তি, সভ্যতার ধারক এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রহ্মপুত্র সেই নদীগুলোর অন্যতম। হাজার বছরের জনপদ, মানুষের জীবন-জীবিকা, স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে এই নদীর সম্পর্ক গভীর।

নদীর পাশে বাড়ি নির্মাণ করলেই অবশ্য সেই বাড়ি বিশেষ হয়ে ওঠে না। বাড়ি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার জানালা দিয়ে শুধু নদীর সৌন্দর্য দেখা যায় না, বরং মানুষের জীবন ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার দৃষ্টিও তৈরি হয়।

ফাইয়ান ম্যানশনকে আমি সেই অর্থেই একটি প্রতীকী স্থাপনা হিসেবে দেখতে চাই। এটি কোনো নিছক বিলাসবহুল আবাসন নয়। বরং দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েও যারা নিজেদের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে চান, তাদের মানসিকতার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।

Screenshot

আজ আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা খুব স্পষ্ট। গ্রামের মানুষ শহরে আসতে চায়, শহরের মানুষ বিদেশে যেতে চায়। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা, উন্নত জীবনযাপন ও নিরাপত্তার সন্ধানে মানুষ ক্রমেই নিজের জন্মভূমি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিদেশে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলাকে অনেকেই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য মনে করেন।

কিন্তু এই পরিবারের গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং পেশাগত সাফল্য অর্জনের পরও তারা নিজেদের পৈতৃক ভিটাকে বিস্মৃত হয়নি। বরং নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থে সেই গ্রামেই একটি স্থায়ী পারিবারিক আবাস গড়ে তুলেছে। এটি কেবল বাড়ি নির্মাণ নয়; এটি শেকড়ের কাছে ফিরে আসার একটি সচেতন প্রচেষ্টা।

একজন গবেষকের আন্তর্জাতিক পরিচয়, অথচ হৃদয়ে বাংলাদেশ

এই পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ড. ইমাদুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা, সমাজবিজ্ঞান, সমুদ্রবিষয়ক অধ্যয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গেছে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন।

তাঁর কাজের পরিধি শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা, নীতিনির্ধারণী চিন্তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বিপুল অর্থায়ন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজেও তিনি অবদান রাখছেন।

তবে আমার কাছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি অন্য জায়গায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও দেশের ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা উপযুক্ত পেশাগত সুযোগের সন্ধানে তিনি প্রত্যাশিত স্বীকৃতি পাননি। একজন মেধাবী তরুণের প্রতিভা ও যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে না পারা আমাদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থার জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়।

যে মেধাকে দেশ যথাসময়ে চিনতে পারেনি, সেই মেধার মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক পরিসর। আমেরিকা, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে।

এখানে একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে—আমরা কি আমাদের মেধাবী সন্তানদের যথাসময়ে চিনতে পারি? নাকি তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতি পেতে হলে বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির অপেক্ষা করতে হয়?

একজন মেধাবী মানুষ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেই তিনি দেশকে ভুলে যান না। বরং অনেকেই নিজের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতাকে দেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান। ড. ইমাদুল ইসলামের জীবন থেকে এই শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

একজন শিশুর হাসিতে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

তবে সেদিনের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র ছিলেন আট বছরের ফা ইয়ান।

শিশুটিকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেই আমার মনে হয়েছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য খুব ছোটবেলাতেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। ফা ইয়ান অত্যন্ত স্বল্পভাষী। কিন্তু তার মুখে সারাক্ষণ একটি মিষ্টি হাসি লেগে থাকে। সে সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে, অতিথিদের আপন করে নেয়, মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যায়।

আমি লক্ষ করেছি, অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ এসেছেন, যাদের সঙ্গে তার আগে কখনো পরিচয় ছিল না। অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তাদের সঙ্গে এমন একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করেছে, যেন বহুদিনের চেনাজানা। আট বছরের একটি শিশুর মধ্যে এই সহজাত আন্তরিকতা সত্যিই বিস্ময়কর।

আমরা অনেকেই বড় হয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শিখি, সামাজিকতা শিখি, অতিথি আপ্যায়নের নিয়ম শিখি। কিন্তু সবসময় মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে মিশতে পারি না। অনেক সময় আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়ে, সামাজিক অবস্থান বাড়ে, অথচ হৃদয়ের সরলতা কমে যায়।

ফা ইয়ানের মধ্যে আমি তার উল্টো একটি বৈশিষ্ট্য দেখেছি। সে কম কথা বলে, কিন্তু তার হাসি অনেক কথা বলে। সে বড়দের মতো দীর্ঘ বক্তৃতা দেয় না, কিন্তু তার আচরণে আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটে।

আমার কাছে তার এই গুণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতা কোনো সনদ দিয়ে অর্জন করা যায় না। এটি পারিবারিক শিক্ষা, পরিবেশ, অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সম্মিলিত ফসল।

একটি শিশুকে আমরা কী শেখাচ্ছি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—শিশুটি আমাদের দেখে কী শিখছে।

মা-বাবার আচরণই সন্তানের প্রথম পাঠশালা

ফা ইয়ানের মা টুকটুকি এবং বাবা ড. ইমাদুল ইসলামের প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

একটি শিশুর জীবনে মা-বাবাই প্রথম শিক্ষক। বিদ্যালয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই সে মা-বাবার কথা বলা, মানুষের সঙ্গে আচরণ করা, অতিথিকে সম্মান করা, অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করা এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শেখে।

শিশুর সামনে মা-বাবা যদি মানুষকে সম্মান করেন, শিশু সম্মান করতে শেখে। তাঁরা যদি অতিথিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন, শিশু অতিথিপরায়ণতা শেখে। তাঁরা যদি নিজেদের শেকড়কে ভালোবাসেন, শিশুর মধ্যেও জন্মভূমির প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হয়।

টুকটুকি ও ড. ইমাদুল ইসলামের পারিবারিক পরিবেশে ফা ইয়ানের মধ্যে সেই ইতিবাচক প্রভাবের প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি। বিশেষ করে জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে বাংলাদেশে, নিজের দাদাবাড়িতে এবং কাজিনদের সঙ্গে উদ্‌যাপনের আগ্রহ তার মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত টান প্রকাশ করে।

এখানে আমি একটি বিষয় বিশ্বাস করি—সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ সবসময় অর্থ কিংবা স্থাবর সম্পত্তি নয়। তার চেয়েও বড় সম্পদ হলো মা-বাবার শিক্ষা, সততা, মানবিকতা ও জীবনদর্শন।

মা-বাবা সন্তানকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বটি কোনো প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি পালন করতে পারে না। সেই শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে।

একটি বাড়ি, মেধা বিকাশের একটি পারিবারিক কেন্দ্র

ফাইয়ান ম্যানশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এই পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিক্ষাগত সাফল্য।

বাড়িটির কাজিনসহ পরিবারের অনেক শিশু-কিশোর ও তরুণ দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। কেউ স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করছে, কেউ দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষা, অধ্যবসায় ও পেশাগত উৎকর্ষের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে।

একটি পরিবারের মধ্যে যখন একাধিক প্রজন্মের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, তখন সেটি আর কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় থাকে না। তা ধীরে ধীরে একটি পারিবারিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

ফাইয়ান ম্যানশনকে আমি সেই অর্থে একটি সম্ভাবনাময় মেধা বিকাশকেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। এখানে শিশুরা বড়দের দেখে শিখবে, ছোটরা বড়দের অনুসরণ করবে, একজনের সাফল্য অন্যজনকে অনুপ্রাণিত করবে।

একজন বিদেশে স্কলারশিপ পেলে অন্যজনের মধ্যেও স্বপ্ন তৈরি হবে। একজন গবেষণায় সাফল্য অর্জন করলে আরেকজন গবেষণার প্রতি আগ্রহী হবে। একজন দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যজনও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সাহস পাবে।

তবে শুধু উচ্চশিক্ষা কিংবা ভালো ফলাফল দিয়ে একটি পরিবারের প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা যায় না। শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ কতটা মানবিক, কতটা সহানুভূতিশীল, কতটা পরোপকারী—সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড।

এই পরিবারের মধ্যে শিক্ষার পাশাপাশি আত্মীয়তার বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা, আন্তরিকতা এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধের যে চর্চা দেখতে পেয়েছি, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জন্মদিনের আনন্দে আত্মীয়তার পুনর্জন্ম

৭ নভেম্বরের অনুষ্ঠানটি ছিল এক অর্থে বহুদিন পর আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলা। কেউ এসেছেন দূর থেকে, কেউ কাছের জনপদ থেকে। কেউ রাতেও থেকেছেন। কাজিনদের হাসি, শিশুদের ছোটাছুটি, বড়দের গল্প, স্মৃতিচারণ এবং পারস্পরিক কুশল বিনিময়ে পুরো বাড়িটি হয়ে উঠেছিল আনন্দের এক সম্মিলিত ঠিকানা।

Screenshot

আধুনিক জীবনে আমরা অনেকেই আত্মীয়তার বন্ধন হারিয়ে ফেলছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও অনেক সময় পাশের বাড়ির আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়ার সময় হয় না।

অথচ মানুষের জীবনে শেকড়ের সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-মামা, ফুফু-খালা, কাজিন—এই সম্পর্কগুলো শুধু আত্মীয়তার পরিচয় নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের ভিত্তি।

ফা ইয়ানের জন্মদিন সেই সম্পর্কগুলোকে আবার একত্র করেছে। আট বছরের একটি শিশুর জন্মদিন যেন বহু মানুষের মধ্যে নতুন করে আত্মীয়তার আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে।

এটি আমার কাছে কম বড় ঘটনা নয়।

শত বছর পরেও যে বাড়ির গল্প বলা হবে

আমি জানি না, একশ বছর পর ফাইয়ান ম্যানশন ঠিক কেমন থাকবে। সময়ের সঙ্গে স্থাপত্যের রং বদলাবে, মানুষ বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে। হয়তো আজকের শিশুরা একদিন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে এই বাড়িতে ফিরে আসবে। হয়তো ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাঁড়িয়ে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের গল্প করবে।

Fayan with his father Dr Emadul Islam
Screenshot

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, কোনো বাড়ির স্থায়িত্ব শুধু তার নির্মাণকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। বাড়ির প্রকৃত স্থায়িত্ব নির্ভর করে সেখানে গড়ে ওঠা মূল্যবোধের ওপর।

যে বাড়িতে শিক্ষা আছে, মানবিকতা আছে, ভালোবাসা আছে, শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে, সেই বাড়ি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।

ফাইয়ান ম্যানশন একদিন হয়তো কুলিয়ারচরের বাইরেও পরিচিত হবে। শুধু একটি সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি হিসেবে নয়, বরং এমন একটি পরিবারের প্রতীক হিসেবে, যারা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেও জন্মভূমিকে ভুলে যায়নি।

আমি চাই, এই বাড়ির শিশুরা শুধু ভালো ফলাফল করুক, তা নয়; তারা ভালো মানুষ হোক। তারা শুধু বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক, তা নয়; নিজেদের দেশের মানুষের জন্যও কাজ করুক। তারা শুধু নিজেদের পরিবারকে সমৃদ্ধ করুক, তা নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নেও অবদান রাখুক।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পরিবারের প্রকৃত গৌরব তার সম্পদের পরিমাণে নয়, তার উত্তরসূরিদের চরিত্রে।

শেষ কথা: জন্মদিনের উপহার আসলে একটি দর্শন

ফা ইয়ান, তোমার বয়স মাত্র আট বছর। হয়তো আজকের এই আয়োজনের সব তাৎপর্য তুমি পুরোপুরি বুঝতে পারবে না। হয়তো তুমি মনে রাখবে জন্মদিনের আনন্দ, কাজিনদের সঙ্গে কাটানো সময়, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা আর ফাইয়ান ম্যানশনের অসংখ্য মানুষের হাসিমুখ।

কিন্তু তোমার এই ছোট্ট উদ্যোগের মধ্যে যে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে, সেটি একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে।

তুমি জাপানে বড় হচ্ছ, পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবে, হয়তো একদিন আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের পরিচয় তৈরি করবে। কিন্তু মনে রেখো, পৃথিবীর যত বড় জায়গাতেই তোমার অবস্থান হোক, তোমার একটি জন্মভূমি আছে, একটি পৈতৃক ভিটা আছে, একটি নদী আছে, একটি বাড়ি আছে, আর আছে তোমাকে ভালোবাসার অসংখ্য মানুষ।

এই সম্পর্কগুলোই তোমার পরিচয়ের গভীরতম অংশ।

আমি যদি বেঁচে থাকি, হয়তো একদিন এই বাড়ির শতবর্ষী কোনো আয়োজনেও অংশ নিতে পারব। আর যদি না-ও পারি, আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কেউ না কেউ এই লেখাটি পড়বে। তারা হয়তো তখন বুঝবে, ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর একটি আট বছরের শিশুর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে একটি বাড়িতে কত মানুষ একত্র হয়েছিল। বুঝবে, একটি পরিবার কীভাবে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েও নিজের গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে পারে।

তখন হয়তো তারা ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাঁড়িয়ে ফাইয়ান ম্যানশনের দিকে তাকিয়ে বলবে—এই বাড়িটি শুধু একজন শিশুর নামে নির্মিত হয়নি; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, শিক্ষা, মানবিকতা ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা।

আমার কাছে ফাইয়ান ম্যানশনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সেটিই।

একটি শিশু তার জন্মদিনে আমাদের যে উপহার দিয়েছে, তা কোনো বস্তুগত উপহার নয়। সে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষ যত দূরেই যাক, তার শেকড়ের কাছে ফিরে আসার একটি আনন্দ আছে। সেই আনন্দের কোনো বিকল্প নেই।

একটি শিশু, একটি বাড়ি, একটি নদ—আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিবারের স্বপ্ন।

হয়তো এভাবেই কোনো একদিন একটি বাড়ি একটি জনপদের পরিচয় হয়ে ওঠে। আর একটি শিশুর ছোট্ট হাসি হয়ে থাকে বহু প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।

Share: