খণ্ডিত তথ্য, বয়ান-রাজনীতি ও সামাজিক বিভ্রান্তি – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

 

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমাজে একটি ঘটনা আর কেবল একটি ঘটনা হিসেবে থাকে না। একটি ভিডিওর কয়েক সেকেন্ড, কোনো ঘটনার আংশিক বিবরণ, একটি অসম্পূর্ণ বক্তব্য কিংবা চলমান কোনো ঘটনার নির্বাচিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর একটি বয়ানের অংশ হয়ে যেতে পারে। তখন মূল ঘটনা, তার প্রেক্ষাপট এবং তার ব্যাখ্যা—তিনটি বিষয় একাকার হয়ে যায়।

এখানেই আমাদের সময়ের একটি বড় সামাজিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

একটি খণ্ডিত ভিডিও সত্য হতে পারে, একটি ছবিও সত্য হতে পারে, একটি বক্তব্যও সত্য হতে পারে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ওই খণ্ডিত উপাদানটি পুরো ঘটনার সত্যকে ধারণ করছে। বরং প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন সত্য অনেক সময় এমন একটি ধারণা তৈরি করতে পারে, যা সামগ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন সেই খণ্ডিত তথ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক আবেগ, পূর্বধারণা, জনপ্রিয় ব্যক্তির বক্তব্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা যুক্ত হয়। তখন তথ্য আর শুধু তথ্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক বয়ান।

ঘটনা থেকে বয়ান: বিভ্রান্তির শুরু যেখানে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার একটি সাধারণ ধারা লক্ষ করা যায়—

ঘটনা → খণ্ডিত দৃশ্য → আবেগ → তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা → রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ → ব্যাপক প্রচার → প্রতিষ্ঠিত বয়ান।

ধরা যাক, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর হয়েছে। ভাঙচুরের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হলো। ভিডিওটি সত্য। কিন্তু ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছে, তার আগে কী ঘটেছিল, কারা ভাঙচুর করেছে, কেন করেছে, পরে কী ঘটেছে—এসব তথ্য অনুপস্থিত।

তারপর সেই ভিডিওর সঙ্গে একটি বক্তব্য যুক্ত হলো—‘দেশে আর থাকা যাবে না’, ‘সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে’, ‘অমুক দলই এর জন্য দায়ী’।

এখন ভিডিওটি আর কেবল একটি ঘটনার দৃশ্য নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাহক হয়ে গেল।

এখানে মূল বিপদটি হলো—দর্শক অনেক সময় ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে ব্যাখ্যাটিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

অর্থাৎ একটি খণ্ডিত সত্য থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ অথচ ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

‘কে করেছে’—এর পাশাপাশি ‘কার লাভ’ প্রশ্ন

রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাত বিশ্লেষণে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন হলো—কোনো ঘটনার ফলে কারা লাভবান হচ্ছে।

কোনো সহিংসতার ঘটনায় শুধু অপরাধী ও ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করলেই সবসময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝা যায় না। ঘটনার ফলে কোন পক্ষ সুবিধা পাচ্ছে, কোন রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আসছে এবং ঘটনাটিকে ঘিরে কী ধরনের বয়ান তৈরি হচ্ছে—এসবও বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে।

তবে এই ধারণাকে সরল সূত্রে পরিণত করা যাবে না।

কোনো ঘটনায় যে পক্ষ লাভবান হয়েছে, সেই পক্ষই ঘটনাটি ঘটিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

আবার কোনো পক্ষ ঘটনাটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেই যে তার সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই, সেটিও বলা যায় না।

তাই ‘কার লাভ?’ প্রশ্নটি তদন্তের একটি দিক; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি নয়।

একটি ঘটনার ক্ষেত্রে বরং কয়েকটি প্রশ্ন একসঙ্গে করা প্রয়োজন—

কে ঘটিয়েছে?
প্রমাণ কী?
উদ্দেশ্য কী?
ঘটনার আগে কী ঘটেছিল?
ঘটনার পরে কী ঘটেছে?
কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
এবং ঘটনাটিকে ঘিরে কোন বয়ান তৈরি হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলো না করে কেবল একটি পক্ষকে দায়ী করা হলে তদন্তের জায়গা দখল করে নেয় রাজনৈতিক অনুমান।

খণ্ডিত তথ্য কীভাবে আবেগের ঢেউ তৈরি করে

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভয়, ক্রোধ, অপমান, বিস্ময় ও অনিশ্চয়তার মতো তীব্র আবেগ সৃষ্টিকারী তথ্যের প্রতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবেশ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে।

‘সব শেষ’, ‘দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে’, ‘এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে’, ‘ওরা দেশটাকে শেষ করে দিচ্ছে’—এ ধরনের বাক্য কোনো ঘটনার জটিল বাস্তবতাকে কয়েকটি আবেগপ্রবণ শব্দে নামিয়ে আনে।

ফলে মানুষ অনেক সময় প্রথমে আবেগে প্রতিক্রিয়া জানায়, পরে তথ্য যাচাই করে। অথচ তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত তার উল্টোটি।

প্রথমে যাচাই, তারপর মতামত।
প্রথমে প্রেক্ষাপট, তারপর সিদ্ধান্ত।

একটি খণ্ডিত ভিডিও যখন এমন আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার বিস্তার বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। আর সেই ভিডিও যত বেশি ছড়ায়, মানুষ তত বেশি মনে করতে পারে যে ভিডিওতে প্রদর্শিত ব্যাখ্যাটিই বুঝি জনমতের প্রধান সত্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার—

জনপ্রিয়তা সত্যতার প্রমাণ নয়।
বহুল প্রচারিত হওয়া কোনো বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ নয়।

জনপ্রিয়তা যখন জ্ঞানের বিকল্প হয়ে যায়

ভুল তথ্য শুধু অপরিচিত মানুষের কাছ থেকেই আসে না। বরং পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তির কাছ থেকে এলে তা অনেক সময় আরও দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পায়।

একজন কনটেন্ট নির্মাতা জনপ্রিয় হতে পারেন, তাঁর বক্তব্য আকর্ষণীয় হতে পারে, তাঁর বিপুল অনুসারী থাকতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি সামরিক বিষয়, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।

একজন ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর জ্ঞান—দুটি পৃথক বিষয়।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পার্থক্যটি প্রায়ই হারিয়ে যায়। ফলে জনপ্রিয় ব্যক্তির বক্তব্যকে মানুষ অনেক সময় যাচাই ছাড়াই সত্য বলে গ্রহণ করে।

এখানেই তৈরি হয় কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস।

একজন জনপ্রিয় কণ্ঠ যখন একটি খণ্ডিত ঘটনা নিয়ে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেন, তখন তাঁর অনুসারীদের একটি অংশ সেই সিদ্ধান্তকে আর মতামত হিসেবে দেখে না; সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং প্রেক্ষাপটহীন সত্য

তথ্য বিকৃতির সব ধরন এক নয়।

কেউ ভুল তথ্য জানেন না বলে ভুলভাবে প্রচার করতে পারেন। এটি ভুল তথ্য।

কেউ জেনেশুনে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে পারেন। এটি অপতথ্য।

আবার কোনো সত্য তথ্যকে এমনভাবে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে, যাতে সেটি ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর অর্থ তৈরি করে।

বাস্তবে এই তিনটি প্রবণতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

একজন মিথ্যা দাবি করলেন। অন্য একজন তা যাচাই না করে প্রচার করলেন। তৃতীয় একজন সত্য একটি ঘটনা এনে সেই দাবির সঙ্গে যুক্ত করলেন। এরপর একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা সবকিছুকে একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে নিয়ে এলেন।

ফলে শেষ পর্যন্ত এমন একটি গল্প দাঁড়াল, যার প্রতিটি খণ্ডকে আলাদাভাবে সত্য বা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে, কিন্তু পুরো গল্পটি বাস্তবতার সঠিক প্রতিচ্ছবি নয়।

এই কারণেই শুধু তথ্য সত্য কি না, সেটি যথেষ্ট নয়; তথ্যটি কীভাবে, কোন প্রেক্ষাপটে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বয়ান তৈরির ঝুঁকি

এই সমস্যা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যখন আলোচনার বিষয় হয় সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা রাষ্ট্রের অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং জবাবদিহি দাবি করা নাগরিকের অধিকার।

কিন্তু সমালোচনা এবং অপ্রমাণিত অভিযোগ এক বিষয় নয়।

একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো গুরুতর অভিযোগ বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রচারের আগে অন্তত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—

  • তথ্যের উৎস কী?
  • উৎসটি কতটা নির্ভরযোগ্য?
  • তথ্যটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি?
  • ভিডিও বা বক্তব্যটি সম্পূর্ণ কি না?
  • ঘটনাটির সময় ও স্থান নিশ্চিত কি না?
  • সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি?
  • ঘটনাটির আগে ও পরে কী ঘটেছে?
  • প্রচারিত তথ্যটি অন্য কোনো পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করতে পারে কি না?

বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্ব আরও বেশি।

এর অর্থ কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নাতীত করে দেওয়া নয়। বরং অর্থ হলো—

প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, গুজবের ভিত্তিতে নয়; অনুসন্ধান হবে তথ্যের ভিত্তিতে, অনুমানের ভিত্তিতে নয়।

তাহলে করণীয় কী?

এই সমস্যার সমাধান শুধু আইন দিয়ে করা যাবে না। আবার সবকিছুর সমাধান হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ভুল তথ্য প্রতিরোধের নামে যদি বৈধ মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা কিংবা সরকারের সমালোচনার পথ সংকুচিত করা হয়, তাহলে সমস্যার পরিবর্তে নতুন সমস্যা তৈরি হবে।

প্রয়োজন হলো সমাজের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

একজন নাগরিককে জানতে হবে—

কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয়;

কীভাবে পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কি না বোঝা যায়;

কীভাবে বক্তব্যের আগের ও পরের অংশ খুঁজে বের করতে হয়;

কীভাবে সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য বুঝতে হয়;

কীভাবে একটি ছবির বা ভিডিওর সময় ও স্থান যাচাই করতে হয়;

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আবেগপ্রবণ কোনো তথ্য সামনে এলে কীভাবে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রচার না করে কিছুটা সময় নিয়ে যাচাই করতে হয়।

সরকারের দায়িত্ব: নিয়ন্ত্রণ নয়, তথ্যের স্বচ্ছতা

সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া।

কোনো ঘটনা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা অনেক সময় গুজবের জন্য জায়গা তৈরি করে। তাই দ্রুত তথ্য প্রকাশ, ভুল তথ্যের সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ জনগণের সামনে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এর অর্থ জনগণের মতামত নিয়ন্ত্রণ করা নয়।

ভুল বয়ানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত—

আরও ভালো তথ্য, আরও শক্তিশালী প্রমাণ এবং আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা।

কেবল কোনো বক্তব্য নিষিদ্ধ করা বা কোনো কনটেন্ট নির্মাতাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না। বরং মানুষের কাছে কেন ওই বক্তব্যটি ভুল, সেটি যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে বোঝানো প্রয়োজন।

প্রয়োজন সমন্বিত জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ

এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন মতের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি স্বাধীন ও জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে।

এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারণা চালানো নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাকে—

তথ্য, প্রমাণ, সময়কাল, প্রেক্ষাপট এবং যুক্তির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা।

একটি মিথ্যা বয়ানকে শুধু নিষেধ করে থামানো যায় না। তার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা না থাকলে সেই শূন্যস্থান আবার গুজব, ভয় ও রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে পূর্ণ হবে।

তাই প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু করতে হবে

এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করানো যথেষ্ট নয়। তাদের শেখাতে হবে তথ্য যাচাই, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং প্রেক্ষাপট বোঝার দক্ষতা।

একজন শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবে—

দেখলেই বিশ্বাস করা যাবে না।
শুনলেই প্রচার করা যাবে না।
জনপ্রিয় হলেই সত্য হবে না।
আর আবেগ সৃষ্টি করলেই কোনো বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় না।

এই শিক্ষা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠন—সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে।

 

আমাদের সময়ের বড় সংকট শুধু মিথ্যা তথ্য নয়; বরং খণ্ডিত সত্যকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে তা একটি সম্পূর্ণ অথচ বিভ্রান্তিকর বাস্তবতা তৈরি করে।

একটি ভিডিও সত্য হতে পারে, কিন্তু পুরো ঘটনা নাও হতে পারে।

একটি বক্তব্য সত্য হতে পারে, কিন্তু তার প্রেক্ষাপট বাদ পড়তে পারে।

একজন বক্তা জনপ্রিয় হতে পারেন, কিন্তু তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নাও হতে পারেন।

একটি ঘটনা সত্য হতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সত্য নাও হতে পারে।

তাই কোনো সংবেদনশীল ঘটনা সামনে এলে আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নয়—‘কার বিরুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হবে?’ বরং প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আসলে কী ঘটেছে?’

তারপর জানতে হবে—

প্রমাণ কোথায়?
প্রেক্ষাপট কী?
কোন তথ্য বাদ পড়েছে?
অন্য পক্ষ কী বলছে?
কারা কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে?
এবং এই ব্যাখ্যার পেছনে কী স্বার্থ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীল তথ্যপ্রচার। সমালোচনার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি অপ্রমাণিত অভিযোগের বিরুদ্ধে নাগরিকদেরও সতর্ক হতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে বিভ্রান্ত করার জন্য সবসময় সম্পূর্ণ মিথ্যার প্রয়োজন হয় না।

সত্যের একটি অংশ, আবেগের একটি ঢেউ এবং প্রেক্ষাপটহীন একটি ভিডিও—এই তিনটিই কখনো কখনো যথেষ্ট।

তাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এমন নাগরিক সমাজ, যে সমাজ তথ্যকে যাচাই করে, আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রশ্ন করতে জানে এবং কোনো বয়ানকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে তার প্রমাণ খুঁজে দেখে।

তথ্যের স্বাধীনতা থাকবে, সমালোচনার অধিকার থাকবে, জবাবদিহি থাকবে—কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে দায়িত্বশীলতা, প্রমাণ এবং বিচারবুদ্ধি।

Share: