শতবর্ষের গৌরব থেকে ‘ওয়ান জেনারেশন ইউনিভার্সিটি’: ঢাবির ভবিষ্যৎ কোন পথে? – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

কবি দিপু সিদ্দিকী১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনার সবুজ চত্বরে যে শিক্ষায়তনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশ, স্বাধিকার আন্দোলন এবং সবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ল্যাবরেটরি ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বাঁকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি নেতৃত্ব দিয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। কিন্তু শতবর্ষ পার করে আজ যখন আমরা এই বিদ্যাপীঠের দিকে তাকাই, তখন গৌরবের চেয়ে গ্লানি আর অর্জনের চেয়ে অবক্ষয়ের চিত্রই বেশি দৃশ্যমান হয়। সম্প্রতি বরেণ্য সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী জাহিদ নামাজের একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বক্তব্য দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের ক্ষতটিকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করেছে। তার সেই গভীর পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতির মনন গঠনে অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস। বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে ব্রিটিশ সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। লর্ড কার্জনের নামাঙ্কিত কার্জন হল কিংবা ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) লাল ইটের দালানগুলো শুধু স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ছিল না, তা ছিল জ্ঞানচর্চার নতুন এক দিগন্তের সূচনা। শুরুর দিকে স্যার পি সি রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো বিশ্বমানের পণ্ডিতদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই ক্যাম্পাস। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিকস এখানেই আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেয়।

কেবল বিজ্ঞান বা কলাবিদ্যার চর্চায় নয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ করেছে মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেনদের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ এই চত্বর থেকেই সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করার ডাক দিয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে যখনই বাঙালির সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাত্তরের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রথম আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর প্রথিতযশা শিক্ষকেরা। জেনোসাইডের শিকার হয়েও এই বিশ্ববিদ্যালয় দমে যায়নি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকাই উত্তোলিত হয়েছিল এর কলা ভবন চত্বরে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশেও দেশের শীর্ষস্থানীয় আমলা, রাজনীতিবিদ, গবেষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সিংহভাগেরই জন্মদাত্রী এই প্রতিষ্ঠান।

রাজনীতি চর্চার অপব্যবহার ও মুক্তবুদ্ধির পথ রুদ্ধ হওয়া

যে রাজনীতি একসময় দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, কালক্রমে সেই রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপই বিশ্ববিদ্যালয়টির টুঁটি চেপে ধরেছে। ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন বা বলা ভালো, চরম অবক্ষয় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি জ্ঞান উৎপাদন কেন্দ্র থেকে দলীয় ক্যাডার তৈরির কারখানায় পরিণত করেছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্য এখন প্রধান শর্ত। ‘নীল’ আর ‘সাদা’ দলের মেরুকরণে যোগ্য শিক্ষকেরা এক কোণায় ছিটকে পড়ছেন, আর চাটুকারিতায় পারদর্শীরা দখল করছেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে ডিন, হলের প্রাধ্যক্ষ পদগুলো এখন দলীয় পুরস্কারের মতো বণ্টন করা হয়। ফলে শিক্ষকেরা আর শ্রেণিকক্ষে বা গবেষণাগারে আলো ছড়ানোর অনুপ্রেরণা পান না; তাদের মনোযোগ থাকে ক্ষমতার অলিন্দে।

এই দলকানা সংস্কৃতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চরিত্রই হওয়ার কথা ছিল প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুক্ত বিতর্ক। কিন্তু বর্তমানের দলদাস মানসিকতা ভিন্নমতের যেকোনো কণ্ঠস্বরকে নির্মমভাবে দমন করে। হলের গণরুম কালচার, গেস্টরুম নির্যাতন এবং সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখা হয়। মুক্ত চিন্তা বা মৌলিক গবেষণা নিয়ে কথা বলার চেয়ে শিক্ষকেরা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে। দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে শিক্ষকেরা আজ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের নৈতিক অভিভাবকত্ব হারিয়েছেন।

ওয়ান জেনারেশন ইউনিভার্সিটি’ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া

বিশিষ্ট লেখক এবং সিনিয়র সাংবাদিক জাহিদ নওয়াজ তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে একটি অত্যন্ত রূঢ় সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন:”অনেক এক্স ডিইউয়ান কেন তাদের সন্তানদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না বা সেজন্য তৈরি করছেন না, তার তত্ত্ব-তালাশ করুন। গত ৩০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন তার বেশিরভাগ সাবেকের জন্য ‘ওয়ান জেনারেশন ইউনিভার্সিটি’তে পরিণত হলো তার বোঝাপড়া জরুরি।”

এই বক্তব্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চালচিত্রের ওপর সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা, যারা নিজেরা এই ক্যাম্পাসে পড়ে আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত, তারা কেন তাদের সন্তানদের এখানে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ক্যাম্পাসের অনিরাপদ পরিবেশ, সেশনজট, আবাসন সংকট এবং সর্বোপরি শিক্ষার নিম্নমানের মধ্যে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সাংবাদিক জাহিদ নওয়াজের ভাষায়, বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে বিশ্বমঞ্চে লড়াই করার মতো ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর সক্ষমতা থাকে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই প্রতিযোগিতামূলক যোগ্যতা ২ শতাংশের বেশি নেই। আর এই ২ শতাংশের বড় অংশের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসিএস ক্যাডার হওয়া।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে আজ গবেষণার বইয়ের চেয়ে বিসিএস গাইড বইয়ের স্তূপ বেশি দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষ থেকেই অ্যাকাডেমিক জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কারণ তারা জানে, শুধু নিজ বিষয়ের মেধা দিয়ে বা গবেষণা করে দেশে উপযুক্ত মূল্যায়ন পাওয়া অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন জ্ঞানচর্চার চত্বর থেকে রূপান্তরিত হয়েছে ‘চাকরি খোঁজার কোচিং সেন্টারে’। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না এবং এটি কেবলই এক প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হচ্ছে।

ঐতিহ্য হারানোর কারণ ও গবেষণার দৈন্যদশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহ্য হারানোর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়:

অবক্ষয়ের ক্ষেত্র মূল কারণসমূহ এবং এর প্রভাব

শিক্ষক নিয়োগে মেধার অবমূল্যায়ন, রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া,মানহীন শিক্ষাদান, গবেষণায় অনীহা এবং চাটুকারিতা বৃদ্ধি।

বাজেটে গবেষণায় নামমাত্র বরাদ্দ, অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয়।আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কারের অনুপস্থিতি।

আবাসন ও রাজনীতি

হলগুলোতে ছাত্রসংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য, সিট বাণিজ্য ও টর্চার সেল।সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ রুদ্ধ হওয়া, ভয়ের সংস্কৃতি।

কারিকুলাম যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক সিলেবাস তৈরি না করা।  বৈশ্বিক চাকরির বাজারে শিক্ষার্থীদের অযোগ্যতা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার কবরের পাশে কার কবর হবে, কার নামে কোন ভবনের নামকরণ হবে—এই জাতীয় অনুত্পাদক ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতি নিয়ে যতটা মিছিল-মিটিং হয়, গবেষণাগারের আধুনিকায়ন বা লাইব্রেরির সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নিয়ে তার সিকিভাগও হয় না। এই ‘আজাইরা’ সংস্কৃতি প্রকৃত জ্ঞানীদের ক্যাম্পাস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এখনো যে দু-চারজন শিক্ষক নীরবে-নিভৃতে আলো ছড়াচ্ছেন, তারা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নিজ তাগিদে কাজ করছেন। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার পচনের সামনে তাদের এই একক প্রচেষ্টা সমুদ্রে বিন্দুবতের মতো।

ঐতিহ্য ফেরানোর উপায় ও মুক্তবুদ্ধির পথ উন্মুক্ত করা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি আবার তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে কাঠামোগত এবং মানসিক—উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। দলকানা দলদাসদের হাত থেকে শিক্ষক সমাজকে রেহাই দিতে হবে। এর জন্য নিম্পনোক্ত দক্ষেপগুলো জরুরি ভিত্তিতে নজর দেয়া যেতে পারে:

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ:

শিক্ষক নিয়োগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ, পিএইচডি এবং শিক্ষাদানের দক্ষতাকে একমাত্র মাপকাঠি করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষক নিয়োগের কোটা বা সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির অবসান:

ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। এর বদলে নিয়মিত ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও অধিকারভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব গুণাবলী ও মেধার বিকাশ ঘটাবে।

গবেষণায় জাতীয় বাজেট বৃদ্ধি:

প্রতি বছর বাজেটের একটি সিংহভাগ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতির শর্ত কেবল চাকরির মেয়াদ নয়, বরং তাদের মৌলিক গবেষণার মানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করতে হবে।

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও আবাসন স্বৈরাচার বন্ধ:

হলের সিট বণ্টনের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে নিতে হবে। কোনো ছাত্রসংগঠন যেন হলের সিট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। গণরুম এবং গেস্টরুম সংস্কৃতির মতো অমানবিক প্রথা উচ্ছেদ করে শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ার সুপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

মানবতার ফেরিওয়ালা ও প্রকৃত জ্ঞানচর্চার সমাজ বিনির্মাণ

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদ বিতরণের কারখানা নয়। এখান থেকে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ-৫ বা প্রথম শ্রেণী নিয়ে বের হবে না। প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় মানুষকে সংবেদনশীল, যুক্তিমনস্ক এবং সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা দরকার যেখানে শিক্ষার্থীরা হবে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’। তারা জ্ঞান আহরণ করবে বিশ্বকে জানার জন্য এবং সেই জ্ঞানকে বিলিয়ে দেবে সমাজের অবহেলিত মানুষের কল্যাণে। জ্ঞানচর্চা যখন কেবলই একটি বহুজাতিক কোম্পানির কর্পোরেট চাকরি বা বিসিএস-এর লালবাতির গাড়ির মোহে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন সমাজ তার মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার সেই মানবতাবাদী সমাজ গঠনের কারিগর হতে হবে, যা একসময় মুনীর চৌধুরী, মোতাহের হোসেন চৌধুরী কিংবা ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো অগণিত মুক্তমনা মানুষদের ধারণ করেছিল।

উপসংহার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়ে গেলে বাংলাদেশের মেধা ও মননের ভবিষ্যৎও অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করি, শত সংকটের মধ্যেও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এটি আবার নিজেকে গবেষণা, বিজ্ঞান এবং মানবতার আঁতুড়ঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

সনদধারী বেকারের ভিড় তৈরি না করে, এই বিদ্যাপীঠ থেকে বের হবে এমন একদল শিক্ষার্থী যারা বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে নিজেদের মেধার প্রমাণ দেবে, আবার একই সাথে দেশের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার সেবা করবে। জাহিদ নামাজের মতো সাবেক শিক্ষার্থীদের এই আত্মোপলব্ধি এবং বেদনা যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘুম ভাঙায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার পুরনো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরে পাক, মুক্তবুদ্ধির আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। daily.presswatch@gmail.com

Share: