একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ ও দূরদর্শী সমাজ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রথাগত ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়, বরং তা মুক্তচিন্তা, মৌলিক গবেষণা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির আধার। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সুস্থ ও ভিশনারি সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না। জনগণের কস্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ দলীয় লেজুরভিত্তিক রাজনীতি, হল দখল, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য এবং সামগ্রিক নৈরাজ্যের কবলে পড়ে তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। যেখানে ক্যাম্পাসগুলো হওয়ার কথা ছিল পরিশীলিত আচরণ, জ্ঞানচর্চা ও শৈল্পিক ভাবনার প্রতীক, সেখানে আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে জ্ঞান ও গুণের চরম নিম্নগামিতা।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ সাইন্টিস্ট ডক্টর রাউফুল আলমের সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তাটি আমাদের এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তরুণদের মগজ তৈরি করছে, আমরা তখন আমাদের তরুণদের দলীয় দাসে পরিণত করছি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের গভীর আত্মোপলব্ধি এবং আমূল সংস্কারের প্রয়োজন।
উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার তুলনামূলক চিত্র
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ ও লক্ষ্য তুলনা করলে একটি বিশাল কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধান চোখে পড়ে।
| সূচক | উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় (জাপান, চীন, ইউরোপ, আমেরিকা) | বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় |
|—|—|—|
| মূল ফোকাস | গবেষণা, মৌলিক আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব। | প্রথাগত পরীক্ষা পাস ও বিসিএস/চাকরির পড়াশোনা। |
| ক্যাম্পাস পরিবেশ | পোস্টার-ব্যানারহীন মুক্ত ও শান্ত পরিবেশ, যা যেন এক অভয়ারণ্য। | দলীয় পোস্টার, বিলবোর্ড এবং স্লোগান-মিছিলে মুখরিত থমথমে পরিবেশ। |
| শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা | দিনরাত ল্যাব ও লাইব্রেরিতে যৌথ গবেষণা, গভীর একাডেমিক সংলাপ। | দলীয় দলাদলি, উপাচার্য বা শিক্ষক নিয়োগে লবিং এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। |
| ছাত্রদের ভূমিকা | তরুণ বয়সেই (২২-২৩ বছর) পিএইচডি বা নিজস্ব স্টার্টআপ গঠন। | লেজুরভিত্তিক রাজনীতি, হল দখল ও প্রতিপক্ষকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন। |
| আচরণ ও সংস্কৃতি | পরিমিতিবোধ, নিয়মানুবর্তিতা এবং পরিশীলিত আচরণ। | ঠুনকো ইস্যুতে নৈরাজ্য, উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও ও প্রশাসনিক স্থবিরতা। |
উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় মেরিটোক্রেসি বা মেধার ভিত্তিতে। সেখানে মেধার বিকাশ ও নতুন আইডিয়ার স্বাধীন আদান-প্রদানই শেষ কথা। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা উচ্চশিক্ষার মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিচ্ছে।
লেজুরভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও কল্যাণকর দিক
বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সমকালীন প্রেক্ষাপটে সেই আদর্শিক রাজনীতির রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানের ছাত্র রাজনীতি মূলত ক্ষমতা-কেন্দ্রিক, লেজুরভিত্তিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী একটি বলয়ে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও এর ক্ষতিকর প্রভাব:
১. মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করা:দলীয় লেজুরবৃত্তি ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা দূর করেছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
২. হলের সিট ও টেন্ডার বাণিজ্য: সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলের বৈধ সিট পাওয়ার বিষয়টি মেধার বদলে রাজনৈতিক বড় ভাইদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। এছাড়া ক্যাম্পাসগুলোতে নির্মাণ বা কেনাকাটার টেন্ডারে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সশস্ত্র সংঘাত ঘটে।
৩. বেকারত্বের কারখানা তৈরি: জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার অভাব এবং লাইব্রেরিগুলোতে কেবল বিসিএস বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কসরত শিক্ষার্থীদের শুধু একটি সনধারী বেকারে পরিণত করছে, যারা বাস্তবমুখী বা বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী নয়।
ছাত্র রাজনীতির রূপান্তর ও কল্যাণকর দিক :
ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে, তবে এর আমূল সংস্কার অপরিহার্য। লেজুরবৃত্তি বাদ দিয়ে যদি “কল্যাণমুখী ও প্রতিনিধিত্বমূলক ছাত্র সংসদ” (যেমন- ডাকসু, জাকসু ইত্যাদি) ব্যবস্থা নিয়মিত সচল করা যায়, তবে তার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে:
নেতৃত্বের বিকাশ: জাতীয় রাজনীতিতে সৎ, শিক্ষিত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব তৈরির জন্য ক্যাম্পাসগুলোতে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি: রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ না করে ছাত্র সংসদগুলো যদি শিক্ষার্থীদের আবাসন, ডাইনিংয়ের খাবারের মান, লাইব্রেরি সুবিধা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিয়ে কাজ করে, তবে তা ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নতি ঘটাবে।
অধিকার সচেতনতা: তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক অবিচার, জাতীয় নীতি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় বড় ইস্যুতে সচেতন ও সোচ্চার করতে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহায্য করে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান চর্চার আধার বানাতে সরকারের করণীয় ও পদক্ষেপ
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেকার তৈরির কারখানা থেকে রূপান্তর করে বিশ্বমানের জ্ঞানের আধার হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে অতি দ্রুত এবং কঠোর কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১. উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মেধাভিত্তিক নীতিমালা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক হলেন উপাচার্য (ভিসি)। সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্য নিয়োগের পর নানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা আমরা দেখেছি।
উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে কঠোর একাডেমিক ট্র্যাক রেকর্ড, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে একমাত্র মাপকাঠি করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
২. গবেষণা ও উদ্ভাবনে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি
উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল শক্তি হলো তাদের বিশাল গবেষণা ফান্ড। বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় শিক্ষা এবং বিশেষ করে গবেষণায় বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য।
প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতি এবং ইনসেনটিভ সরাসরি তাদের গবেষণার মান ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সাথে যুক্ত করতে হবে। শিল্প খাতের (Industry-Academia Collaboration) সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ ঘটাতে হবে, যাতে কর্পোরেট ফান্ড গবেষণায় যুক্ত হতে পারে।
৩. লেজুরভিত্তিক দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ ও ছাত্র সংসদ চালুকরণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সরাসরি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করা আইনিভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন।
আইন করে ক্যাম্পাসগুলোতে লেজুরভিত্তিক ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। এর বিপরীতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে প্রার্থীরা কোনো জাতীয় দলের ব্যানার ব্যবহার করতে পারবে না। শিক্ষকরাও দলীয় প্যানেলের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে একাডেমিক কাউন্সিলে অংশ নেবেন।
৪. আবাসন ও হল ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
হলের সিট বণ্টন এবং ডাইনিং পরিচালনার দায়িত্ব রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে।
প্রথম বর্ষ থেকেই মেধা ও দূরত্বের ভিত্তিতে হলের সিট বরাদ্দ শতভাগ ডিজিটাল ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। প্রতিটি হলে সার্বক্ষণিক হলের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. প্রথাগত কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও আউটকাম-বেসড এডুকেশন (OBE)
বর্তমান যুগে কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দিয়ে তরুণদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। লাইব্রেরিতে বসে শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার যে প্রবণতা, তা কারিকুলামের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে কারিকুলামে রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, এআই, মেশিন লার্নিং এবং বায়োটেকনোলজির মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষাকে বাস্তবমুখী ও সমস্যা সমাধানমূলক (Problem-Solving) করে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করেই উদ্যোক্তা হতে পারে বা বৈশ্বিক বাজারে অবদান রাখতে পারে।
৬. ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা ও পরিশীলিত পরিবেশ পুনরুদ্ধার
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে একটি আদর্শ প্রতীক, যেখানে রাস্তাঘাট, দেয়াল এবং পরিবেশ থেকে মানুষ শিক্ষা নেবে।
ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনৈতিক পোস্টার, বিলবোর্ড ও দেয়াল লিখন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। এর পরিবর্তে দেয়ালগুলোতে শিল্পকলা, বিজ্ঞানমনস্ক চিত্রকর্ম এবং ক্যালিগ্রাফির মতো শৈল্পিক প্রকাশকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ক্যাম্পাসের শান্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে বহিরাগতদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতে হবে।
আজকের এই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে মগজের সাথে যুদ্ধ করতে হলে মগজই লাগবে। আমরা যদি আমাদের তরুণদের মেধা ও মননকে দলীয় দাসে পরিণত করে নষ্ট করে ফেলি, তবে জাতি হিসেবে আমরা চিরতরে পিছিয়ে পড়ব। মেধা পাচার (Brain Drain) রোধ করে দেশের কৃতি গবেষকদের দেশেই ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক আখড়া থেকে মুক্ত করে পুনরায় জ্ঞান, বিজ্ঞান ও গবেষণার পবিত্র আধার হিসেবে গড়ে তোলার এখনই সময়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষক সমাজের নৈতিক পুনরুত্থান এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতনতা। তবেই আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত ল্যাব-লাইব্রেরির আলো জ্বলবে, তৈরি হবে বিশ্বমানের তারুণ্য, এবং সার্থক হবে জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সা।
লেখক : অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক একজন কবি এবং প্রাবন্ধিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ডক্টর দিপু সিদ্দিকী তিনি নামে কলম লেখক হিসেবে সুপরিচিত।