জেন জি শিক্ষক ও জেন আলফা শিক্ষার্থী: ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ – প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী 

কবি দিপু সিদ্দিকীমানব সভ্যতার বিকাশে শিক্ষা একটি অবিরত প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ছাত্র ও শিক্ষকের মিথস্ক্রিয়া। বাংলাদেশসহ এই ভারতীয় উপমহাদেশে এই সম্পর্কের ঐতিহ্য হাজার বছরের। এক সময় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটি কেবল পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল এক পবিত্র আত্মিক বন্ধন। কিন্তু কালের বিবর্তনে, বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে, সেই সম্পর্কের সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সময়ে জেন জি (Gen Z) যখন শিক্ষকের আসনে বসছে এবং জেন আলফা (Gen Alpha) হচ্ছে শিক্ষার্থী, তখন প্রথাগত সেই সম্পর্কের সমীকরণ এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। এই বিবর্তন কি কেবলই প্রগতি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর অবক্ষয়—তা আজ বিশদ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

 

ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট: শ্রদ্ধা ও ভীতির সংমিশ্রণ

অতীতের বাংলাদেশ বা ভারত উপমহাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ছিল অবিচল। তখন সমাজ ছিল অত্যন্ত সংহত। পরিবার ও সমাজের মধ্যকার বন্ধন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, রক্ত সম্পর্কহীন প্রতিবেশীকেও নিজের আপনজনের মতো শ্রদ্ধা করা হতো। একজন যুবক তার নিজের চাচাকে যেভাবে সম্মান করত, প্রতিবেশী অপরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠকেও ঠিক একই সমীহ করত। এই মূল্যবোধের চর্চা কেবল পরিবারে নয়, বরং বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হাটে-মাঠে-ঘাটেও দৃশ্যমান ছিল।

প্রাচীন ভারতের নালন্দা বা তক্ষশীলা থেকে শুরু করে গ্রামীণ পাঠশালা পর্যন্ত সর্বত্রই শিক্ষক ছিলেন ‘গুরু’ বা পথপ্রদর্শক। শিক্ষকরা ছিলেন সেই সমাজের নৈতিক অভিভাবক। তাঁদের আদেশ-উপদেশ ছিল শিরোধার্য। যদিও সেই সম্পর্কে কিছুটা ‘ভীতি’ কাজ করত, কিন্তু সেই ভীতির মূলে ছিল এক ধরনের গভীর সম্ভ্রম। বড়রা যেমন ছোটদের প্রতি অকৃত্রিম দায়িত্বশীল ছিলেন, ছোটরাও বড়দের প্রতি ছিলেন সহনশীল। এই পারস্পরিক সৌহার্দ্যই সমাজকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তখন গুরুগৃহ বা বিদ্যালয়ে যাওয়া মানে ছিল কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নয়, বরং জীবন দর্শনের পাঠ নেওয়া।

 

বর্তমান সংকটের নেপথ্যে: সমাজ ও সংস্কৃতির রূপান্তর

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এই সরল সমীকরণ আজ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়, বরং একাধিক নেতিবাচক প্রভাব এখানে ক্রিয়াশীল। প্রথমত, আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রভাব আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মূলে আঘাত হেনেছে। ভিন্ন সংস্কৃতির চাকচিক্য ও নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি তরুণ প্রজন্মের দুর্নিবার আকর্ষণ তাদের নিজস্ব শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বুনিয়াদি শিক্ষার অভাব এক বড় সংকট তৈরি করেছে। নীতি-নৈতিকতার চেয়ে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে কেবল ফলাফল এবং তথাকথিত ‘সাফল্য’। সমাজ আজ এক অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, যেখানে যেকোনো উপায়ে ভোগের বিস্তার ঘটানোই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়, তখন সামাজিক রীতিনীতি বা ‘সোশ্যাল ননস’ উপেক্ষিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই অনৈতিক ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও দৃশ্যমান। যেখানে আগে শিক্ষককে দেখা হতো মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই একে অপরকে কেবল একটি ‘সার্ভিস’ বা ‘প্রোডাক্ট’ এর মোড়কে মূল্যায়ন করছে।

 

প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েনের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। জেন আলফা প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বিচরণ করছে। তাদের তথ্যের উৎস এখন আর কেবল শিক্ষক নন, বরং গুগল বা ইউটিউব। এর ফলে শিক্ষকের যে চিরাচরিত ‘জ্ঞানের আধার’ হিসেবে মর্যাদা ছিল, তাতে এক ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি, সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ এবং ভার্চুয়াল জগতে বড়দের সাথে অসম্মানজনক আচরণের প্রবণতা বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

আগে বড়দের শাসনকে আশীর্বাদ মনে করা হতো, কিন্তু এখন তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। এই ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা মানুষের মধ্যকার প্রত্যক্ষ যোগাযোগকে কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে শ্রদ্ধাবোধের সেই চিরচেনা উষ্ণতা আজ অনেকটাই যান্ত্রিক।

 

জেন জি শিক্ষক ও জেন আলফা শিক্ষার্থী: ব্যবধান ঘুচছে কি?

আজকের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন জেন জি বা ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ২০১০-এর শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া একদল তরুণ। অন্যদিকে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী হিসেবে বসে আছে জেন আলফা, যারা জন্ম থেকেই প্রযুক্তি-নির্ভর। এই প্রথম শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার মানসিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবধান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

আগের শিক্ষকরা ছিলেন প্রথাগত কর্তৃত্বের প্রতীক, যা এখন ‘সহজপ্রাপ্যতা’ বা ‘বন্ধুত্বে’ রূপ নিয়েছে। শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের কাছে অনেক বেশি সাবলীল এবং শিক্ষার্থীও অনেক বেশি আত্মপ্রকাশকামী। আপাতদৃষ্টিতে একে প্রগতিশীল মনে হতে পারে—শিক্ষক যদি বন্ধু হন তবে শিক্ষার্থী মন খুলে শিখতে পারে। কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। যখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সেই অদৃশ্য সীমারেখা বা ‘অথরিটি’ হারিয়ে যায়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলার ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে। শিক্ষককে যখন কেবল একজন সমবয়সী বন্ধুর মতো দেখা হয়, তখন তাঁর দিকনির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে এক ধরণের শৈথিল্য দেখা দেয়।

 

 

আধুনিকতার ভুল ব্যাখ্যা: কাঠামোহীন স্বাধীনতা

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আধুনিক হওয়ার সংজ্ঞাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। তারা মনে করছে, প্রথাগত কাঠামো বা কড়াকড়ি সরিয়ে দিলেই বোধহয় শিক্ষা আধুনিক হবে। পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতার অভাবকে স্বাধীনতার নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাঠামোহীন স্বাধীনতা শিক্ষার উন্নয়ন ঘটায় না, বরং তাকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

প্রজন্ম বদলালেও শিক্ষার কিছু চিরন্তন মূলনীতি কখনো বদলায় না। শৃঙ্খলা (Discipline), স্বচ্ছতা (Clarity) এবং ধারাবাহিকতা (Consistency)—এগুলো কোনো সেকেলে ধারণা নয়, বরং এগুলোই হলো যেকোনো শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এই ভিত্তিগুলো দুর্বল করে কোনো আধুনিক শিক্ষা কাঠামো টিকে থাকতে পারে না। একটি ভবন যেমন তার কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল। শৃঙ্খলাহীন শিক্ষা কেবল তথ্য প্রদান করতে পারে, কিন্তু চরিত্র গঠন করতে পারে না।

 

জেনারেশন গ্যাপ: কারণ নাকি অজুহাত?

বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থাকে অনেকেই কেবল ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বা প্রজন্মের ব্যবধান হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায় এড়াতে চান। কিন্তু এই যুক্তিটি মূলত অসার। জেনারেশন গ্যাপ সব যুগেই ছিল এবং থাকবে। সমস্যাটি প্রজন্মের ব্যবধানে নয়, সমস্যাটি হলো নৈতিকতার অবক্ষয় এবং শৃঙ্খলার অভাব। যদি সঠিক আদর্শ ও কাঠামোর চর্চা থাকে, তবে প্রজন্মের ব্যবধান কখনোই শিক্ষার পথে অন্তরায় হতে পারে না। আসল সংকট হলো আমাদের মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাব। জেনারেশন গ্যাপের দোহাই দিয়ে আমরা আসলে আমাদের নৈতিক দায়িত্বহীনতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করি।

 

ভবিষ্যৎ পথরেখা: নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার ভারসাম্য

তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? সমাধান নিশ্চয়ই মধ্যযুগীয় কঠোরতায় ফিরে যাওয়া নয়, আবার সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়াও নয়। শিক্ষার ভবিষ্যৎ ‘পুরানো ধাঁচ’ (Old School) বনাম ‘নতুন ধাঁচ’ (New School)—এই দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ভারসাম্য।

এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে পদ্ধতি হবে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সুশৃঙ্খল, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ হবে প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক। শিক্ষক হবেন বন্ধুর মতো আপন, কিন্তু তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটি থাকবে অটুট। শিক্ষার্থীরা হবে স্পষ্টবাদী এবং সৃজনশীল, কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজেদের আচরণের জন্য দায়বদ্ধ (Accountable) থাকবে। এই ভারসাম্য অর্জন করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রায়োগিক চর্চাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

 

 

জেন জি শিক্ষক কিংবা জেন আলফা শিক্ষার্থী—কেউই সমস্যার মূল কারণ নয়। আসল চ্যালেঞ্জটি হলো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের। আমরা কি আমাদের মূল আদর্শ ও নৈতিকতা বজায় রেখে আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করতে পারছি? যে রাষ্ট্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই কঠিন ভারসাম্যটি রক্ষা করতে পারবে, তারাই আগামীর পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেবে। আর যারা আধুনিকতার মোহে পড়ে শৃঙ্খলার ভিত্তি হারিয়ে ফেলবে, তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বে।

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের আবারও সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক সংহতির চর্চায় ফিরতে হবে। যেখানে শিক্ষা হবে কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষ হওয়ার প্রধান পাঠশালা। শিক্ষক থাকবেন উচ্চাসনে, কিন্তু তাঁর হাত প্রসারিত থাকবে শিক্ষার্থীর দিকে—এই আদর্শিক সেতুবন্ধনই পারে একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে। নতুবা আধুনিকতার এই প্লাবনে আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে, যা কোনো প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মেরামত করা সম্ভব হবে না।

 

লেখক: প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী,ডিন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা ।

Share: