বিজ্ঞাপনে নিখুঁত জীবনের গল্প: তুহিনের অভিনয় ও কিছু চেনা আবেগের কোলাজ – অধ্যাপক ড. দিপু সিদ্দিকী

কবি দিপু সিদ্দিকীসম্পর্ক ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো কখনো কখনো কেবল পণ্যের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে আমাদের চারপাশের চেনা জীবনের একেকটি টুকরো দলিল। আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধনের আবহে নির্মিত গ্রামীণফোনের নতুন বিজ্ঞাপনটি ঠিক তেমনই এক পরম মমতার গল্পকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে। আর এই গল্পকে আরও বেশি প্রাণবন্ত, জীবন্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয়জন, প্রিয় সহপাঠী এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জনপ্রিয় অভিনেতা ডিজেডএম মিজানুর রহমান তুহিন।

যারা তুহিনকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তারা জানেন পড়াশোনা কিংবা সাংগঠনিক দক্ষতা—সবখানেই তিনি বরাবরই দারুণ পটু। নিজ মেধা ও স্বকীয়তায় তিনি এরই মধ্যে অনন্য এক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তবে এবার পর্দার অভিনয়ে তিনি যেভাবে মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের এক চিরন্তন ও চিরপরিচিত বাবার চরিত্রকে মূর্ত করে তুলেছেন, তা এক কথায় অসাধারণ।

বিজ্ঞাপনচিত্রটির মূল ভাবনা আবর্তিত হয়েছে আনিকা ফারজানার চমৎকার একটি পারিবারিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে। গল্পটা ভীষণ চেনা:

“একবার নিজের পছন্দে একটা শার্ট কিনে আনলো বাবা। মায়ের পছন্দ হলো না। এমন রাগ করলো মা, এরপর থেকে বাবা কিছু কিনতে গেলেই আগে মায়ের গ্রিন সিগন্যাল নিয়ে নেয়! সেদিন নিজের জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনতে গিয়েও এমন একটা ঝামেলায় পড়লো বেচারা। কল দিয়ে মাকে পাঞ্জাবির কালারটা বোঝাতে পারছে না কিছুতেই। তখন বাবার ফোনে ইন্টারনেট প্যাক পাঠিয়ে দিলাম, বাবা একটু পরই ভিডিও কল দিয়ে পাঞ্জাবিটা আমাদের দেখালো। মাকে দেখে মনে হচ্ছে পাঞ্জাবিটা তার পছন্দ হয়েছে। আমিও দেখলাম, মানিয়েছে বাবাকে খুব!”

এই সরল কিন্তু গভীর পারিবারিক রসায়নকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার গুরুদায়িত্ব ছিল ডিজেডএম মিজানুর রহমান তুহিনের কাঁধে। বাজারে গিয়ে পাঞ্জাবির সঠিক রঙটি স্ত্রীকে বোঝাতে না পেরে সেই যে এক দোলাচল, ব্যাকুলতা এবং সন্তানের পাঠানো ইন্টারনেটের কল্যাণে ভিডিও কলে স্ত্রীর ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার পর মুখে ফুটে ওঠা স্বস্তির হাসি—এই পুরো রূপান্তরটি তুহিন তার অভিনয়ে প্রকাশ করেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক দক্ষতায়। তার চোখের চাহনি, শারীরিক ভাষা এবং অভিব্যক্তির সাবলীলতা দর্শককে মুহূর্তেই একাত্ম করে নেয়। মনে হয়, এ তো আমাদেরই ঘরের বাবা, যিনি সারাজীবন পরিবারের সবার পছন্দকে নিজের পছন্দের চেয়ে এগিয়ে রেখেছেন।

উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে এই বিজ্ঞাপনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি আসলে দূরত্ব ঘোচানোর চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে সম্পর্কের মধ্যকার ছোট ছোট আনন্দগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে। মাইজিপি (MyGP) অ্যাপের মাধ্যমে বাবার ফোনে ইন্টারনেট প্যাক উপহার দেওয়ার এই আধুনিক অনুষঙ্গটি কীভাবে একটি পরিবারের ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেয়, তা-ই এখানে নান্দনিকভাবে চিত্রিত হয়েছে।

আমাদের প্রিয় তুহিনের এই শৈল্পিক ও হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপন শুধু বিজ্ঞাপনটিকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, বরং অভিনেতা হিসেবে তার ভেতরের গভীর মননশীলতাকেও নতুন করে চিনিয়েছে। তুহিনের এই সাফল্য আমাদের গর্বিত করে। যান্ত্রিক এই সময়ে এমন এক টুকরো শুদ্ধ পারিবারিক আবেগ উপহার দেওয়ার জন্য তুহিনসহ পুরো নির্মাণ সংশ্লিষ্ট দলকে অভিনন্দন। এই ঈদ হোক প্রযুক্তির আলোয় প্রিয়জনদের আরও কাছাকাছি থাকার, ভালোবাসার গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার।

লেখক : ডক্টর দিপু সিদ্দিকী।কবি , বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শিল্পসমালোচক।

Share: