পিবজা প্রসঙ্গ : সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে সৌহার্দ্য আদর্শ ও বন্ধুত্বের দর্শন — প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী 

প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকীপ্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠন শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল আবেগ, স্মৃতি এবং যৌথ পথচলার ইতিহাস। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড কিংবা আমাদের উপমহাদেশের প্রাচীনতম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই সংগঠনগুলোর মূল ভিত্তি ছিল একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক স্তরে এগিয়ে নেওয়া। এটি কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, কিংবা ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের আখড়াও নয়। অথচ সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠনের দিকে তাকালে একটি চিরন্তন প্রশ্ন সামনে চলে আসে—নেতৃত্বের মোহ কি তবে আদি ও অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে গ্রাস করে নিচ্ছে?

সংগঠনটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং গভীর অনুধাবন থেকে আমার যে আক্ষেপ, তা মূলত আমাদের সমাজের এক ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতাকে উন্মোচন করে। যেখানে নেতৃত্ব হওয়া উচিত ছিল এক কঠিন দায়িত্ব, এক মহৎ ত্যাগ—সেখানে আজ স্থান করে নিয়েছে আড়ালে-আবডালে প্রোপাগান্ডা, আঞ্চলিকতা, ধর্ম কিংবা রাজনীতির দোহাই দিয়ে সস্তা দলবাজি। বন্ধুর চরিত্র হনন করে, তার দুর্বল জায়গায় আঘাত করে পদ পাওয়ার এই নোংরা প্রতিযোগিতা কোনোভাবেই একটি আদর্শ সংগঠনের রূপরেখা হতে পারে না। যদিও দুই একজন নেতৃত্বের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল সংগঠনকে দাঁড় করানোর।

নেতৃত্ব বনাম ত্যাগ: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ:

পৃথিবীর সফল ও বড় বড় সংগঠনগুলোর শত বছর ধরে টিকে থাকার একমাত্র রহস্য হলো ‘নেতৃত্বের লোভ’ নয়, বরং ‘ত্যাগের মানসিকতা’।

হার্ভার্ড অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন : বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৩ লাখেরও বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীর এই বিশাল সংগঠনটি চলে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে। সেখানে নেতৃত্বের জন্য কোনো কাদা ছোড়াছুড়ি হয় না। একজন যোগ্য বন্ধু বা সহপাঠীকে অনায়াসে পথ ছেড়ে দেওয়া হয়, কারণ তারা জানেন—কমিটির পদে না থেকেও সংগঠনের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করা যায়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন:

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য রক্ষা এবং প্রাক্তনদের পারস্পরিক মেলবন্ধন। সেখানে নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক পরিচয়কে প্রাধান্য না দিয়ে, কে প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি অবদান রাখতে পারছেন তাকেই সর্বসম্মতিক্রমে এগিয়ে দেওয়া হয়।

রোটানি ইন্টারন্যাশনাল বা লায়ন্স ক্লাব: এই বৈশ্বিক সেবাধর্মী সংগঠনগুলোর মূল মন্ত্রই হলো ‘Service Above Self’ (নিজের চেয়ে সেবাকে ওপরে স্থান দেওয়া)। এখানে পদের লড়াইয়ের চেয়ে কে কতটা মানবিক অবদান রাখতে পারল, সেটাই বিবেচ্য।

আমাদের মনে রাখা দরকার, একই পদে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো একাধিক যোগ্য মানুষ থাকতেই পারে। সেখানে ত্যাগ স্বীকার করে বন্ধুকে সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত মহানুভবতা লুকিয়ে থাকে। বন্ধুর সাথে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া কিংবা ছলে-বলে-কৌশলে পদ দখল করা আর যাই হোক, অন্তত শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না।

জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা: জয়ের ভুল মাপকাঠি:

মানুষের ব্যক্তিত্ব একরকম হয় না। কার্ল ইয়ুং-এর মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজে কেউ ‘ইন্ট্রোভার্ট’ (অন্তর্মুখী), কেউ ‘এক্সট্রোভার্ট’ (বহির্মুখী), আবার কেউ ‘অ্যাম্বিভার্ট’ (উভয়মুখী) হতে পারেন। যিনি বহির্মুখী, তিনি স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত মানুষের সাথে মিশে যান এবং জনপ্রিয় হন। কিন্তু যিনি অন্তর্মুখী, তার ভেতরের মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা কিংবা সততা কোনো অংশে কম নয়।

জনপ্রিয়তা কখনো যোগ্যতার একমাত্র প্যারামিটার হতে পারে না। নির্বাচনের জয়-পরাজয় দিয়ে কোনো বন্ধুর সামগ্রিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি যেদিন আমরা অনুধাবন করতে পারব, সেদিনই কেবল সংগঠনের ভেতরের নোংরা দলাদলি বন্ধ হবে।

একটি আদর্শ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্দেশ্য ও রূপরেখা:

একটি আদর্শ প্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠনের মূল ভিত্তিগুলো এমন হওয়া উচিত:

| আদর্শ ও উদ্দেশ্য | বাস্তবায়ন কৌশল |

|—|—|

| কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতি | ভালো কাজের প্রশংসা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো কাজে উৎসাহিত হয়। |

| বিপদে পাশে দাঁড়ানো | ব্যক্তিগত সংকট, সামাজিক বিপর্যয় বা জাতীয় দুর্যোগে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা। |

| মুক্ত আলোচনা | আড়ালে সমালোচনা না করে, সব মতভেদ সামনাসামনি সুস্থ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। |

| ভুল শুধরে দেওয়া | বন্ধুকে আঘাত করা নয়, বরং পরম মমতায় তার ভুলগুলো শুধরে নিয়ে একসাথে চলা। |

 

পিআইবি জার্নালিজম অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন: প্রত্যাশা ও করণীয়

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটরা সমাজের দর্পণ—সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত। তাদের চিন্তাভাবনা হবে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব এবং সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। এই বহুমুখী পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠনটি সারা দেশের জন্য একটি ‘রোল মডেল’ বা দৃষ্টান্তমূলক প্রতিষ্ঠান হতে পারে।

সেজন্য প্রথম শর্ত হলো—একতা।

 রাজনীতির রঙ, ধর্মের বিভেদ কিংবা আঞ্চলিকতার দেয়াল ভেঙে বন্ধুদের কাঁধে হাত রাখতে হবে। সংগঠনের নেতৃত্ব দেবেন এমন একজন, যার মধ্যে থাকবে:

ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা।

পরমতসহিষ্ণুতা (অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা)।

মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়ে তৈরি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যা পুরো সংগঠনের ‘আয়না’ বা প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করবে।

সারকথা: নিজেকে প্রশ্ন করার সময়

জন এফ কেনেডির সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—”Do not ask what your country can do for you, ask what you can do for your country.”

অ্যালামনাই সংগঠনের ক্ষেত্রেও কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। কমিটিতে কে আসলো আর কে গেল, সেটা বড় কথা নয়। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—“সংগঠন আমাকে কি দিল, তার চেয়ে বড় কথা আমি সংগঠনকে এবং আমার বন্ধুদের কী দিতে পারলাম?”

ভুল বোঝাবুঝি হবে, কিন্তু দিনশেষে একে অপরকে ক্ষমা করে দিয়ে আবার একসাথে হাসিমুখে দাঁড়ানোর নামই বন্ধুত্ব। সব ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে, তীব্র ও নোংরা প্রতিযোগিতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে যেদিন আমরা ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসব, সেদিনই পিআইবি জার্নালিজম অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (পিবজা) মতো সংগঠনগুলো প্রাণ পাবে। একটি সুন্দর মন ও মানসিকতার সমাজ বিনির্মাণে এই বন্ধুত্বের বন্ধনই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Share: