শুধু দৃষ্টিনন্দন শিক্ষায়তন নয়: ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে চাই পুষ্টি ও ভেজালমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা- প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’—প্রবাদের এই চিরন্তন সত্যটি কেবল ব্যক্তিক জীবনের জন্য নয়, একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বুনিয়াদ গড়ে ওঠে তার সুশিক্ষিত ও সুস্থ প্রজন্মের হাত ধরে। আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার এই মৌলিক সত্যটি অনুধাবন করে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। মুখস্থবিদ্যার সনাতন বৃত্ত থেকে বেরিয়ে শিক্ষাকে আনন্দময়, জীবনমুখী ও যুগোপযোগী করার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রমে শিল্পকলা এবং কারুকলার মতো সৃজনশীল বিষয়গুলোকে যেভাবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামোতে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে সন্দেহ নেই। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে শিক্ষার্থীরা যখন আনন্দঘন পরিবেশে শিখবে, তখন তাদের সুপ্ত মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটবে। তবে এই মহৎ ও যুগান্তকারী শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস তথা মস্তিষ্কের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা যাবে। অর্থাৎ, আনন্দময় শিক্ষার এই মহৎ উদ্দেশ্য আলোর মুখ দেখবে তখনই, যখন দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিমিত পুষ্টি গ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর এর প্রধান পূর্বশর্ত হলো বাজার ও সমাজ থেকে ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।

আমাদের দেশের সমকালীন শিক্ষা ভাবনায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দৃশ্যমান। আমরা অভিভাবকরা সন্তানের শ্রেণির রোল নম্বর, জিপিএ-৫ কিংবা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যেভাবে ব্যতিব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন থাকি, তার এক শতাংশও সচেতন থাকি না তাদের দৈনন্দিন পুষ্টির মান নিয়ে। দেশের সিংহভাগ অভিভাবক শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণকে একরকম অবজ্ঞাই করছেন। পুষ্টিগুণের চেয়ে শিশুর সাময়িক মুখরোচক খাবার দেওয়ার প্রবণতাই বেশি। এর নির্মম পরিণতি হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা এক নীরব পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে। সুষম খাদ্যের অভাবে দেহে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুর মন ও মগজে। এর পরোক্ষ ও সুদূরপ্রসারী খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা সমাজকে। ১৮ কোটির এই দেশে শুধু শিশুই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধারক আমাদের মায়েরাও তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন।

আজকের সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত যে হানাহানি, খুনখারাবি, পরমতসহিষ্ণুতার চরম অভাব এবং সামাজিক বন্ধন বিনষ্ট হতে দেখছি, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলছে। মানুষ দিন দিন চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, ভেঙে পড়ছে সামষ্টিক ও সামাজিক রীতিনীতি। এমনকি আধুনিক তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কের মধ্যেও এক ধরনের কৃত্রিমতা ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব স্পষ্ট। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল সামাজিক বা নৈতিক অবক্ষয় মনে হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে এর গভীরে পুষ্টিহীনতা এবং জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত তীব্র। মানুষকে পরিচালিত করে তার খুলির ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন। এই নিউরনগুলোর কার্যকারিতা এবং হরমোনের ভারসাম্যই মানুষের বাহ্যিক আচরণে ফুটে ওঠে। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষের নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। সুষম খাদ্যের অভাবে যে কোষটি দুর্বল ও অপুষ্ট থেকে যায়, সেটি তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারায়।

মানবদেহে এমন কিছু বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ বা নিউরোট্রান্সমিটার থাকে, যা আমাদের মেজাজ, অনুভূতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এদের হ্যাপি হরমোন বলা হয়। এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ সরাসরি আমাদের পুষ্টি ও খাদ্যভ্যাসের সাথে জড়িত। যেমন ডোপামিন আমাদের মস্তিষ্ককে কোনো কাজের মাধ্যমে আনন্দ বা সন্তুষ্টির অনুভূতি দেয়। নতুন শিক্ষাক্রমে সরকার যে শিল্পকলা ও কারুকলার ওপর জোর দিচ্ছে, তা শিশুদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণে দারুণ ভূমিকা রাখবে, যা মনোযোগ বৃদ্ধি ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়ায়। অন্যদিকে সেরোটোনিন মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে মেজাজ শান্ত ও ভালো রাখতে সাহায্য করে। শরীরে পর্যাপ্ত সেরোটোনিন না থাকলে মানসিক উদ্বেগ ও উগ্রতা বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ বা সহপাঠীদের সাথে সহিংস আচরণের নেপথ্যে এই নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতি অন্যতম বড় কারণ। একই সাথে অক্সিটোসিন মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সংযোগ তৈরি করে এবং এন্ডোরফিন মানসিক চাপ কমিয়ে আমাদের সতেজ ও আনন্দিত অনুভব করতে সাহায্য করে। আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ স্বাভাবিক রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী শিক্ষা সংস্কারের এই মহৎ উদ্দেশ্য তখনই মাঠপর্যায়ে সফল হবে, যখন আমরা শিশুদের জন্য একটি সুস্থ মস্তিষ্ক নিশ্চিত করতে পারব। আর অপুষ্ট বা রাসায়নিকযুক্ত খাবার খেয়ে কখনোই সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশ সম্ভব নয়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার। ফরমালিন, কার্বাইড, টেক্সটাইল ডাই কিংবা হেভি মেটালের মতো বিষাক্ত উপাদান প্রতিনিয়ত আমাদের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। এই বিষাক্ত ও ভেজাল খাদ্য শিশুদের নিউরনের কার্যক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে এবং তাদের আচরণকে খিটখিটে ও উগ্র করে তুলছে। তাই শিক্ষায় আনন্দের এই নতুন ধারা টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে যুদ্ধঘোষণা করতে হবে খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে। নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বাজার, আড়ত ও উৎপাদন পর্যায়ে শতভাগ ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মাতৃ স্বাস্থ্য এবং শিশুর যথাযথ পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, মেধাবী ও মানবিক জাতি। এই লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যালয়ের টিফিনে কোমল পানীয়, চিপস বা জাঙ্ক ফুড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে সহজলভ্য দেশীয় সুষম খাবার যেমন ডিম, কলা, মৌসুমী ফল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশেপাশের দোকানগুলোতে যেন কোনো প্রকার ভেজাল বা ক্ষতিকর কৃত্রিম রঙ ও রাসায়নিকযুক্ত খাবার বিক্রি না হয়, তা স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। একই সাথে নতুন শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতন করতে নিয়মিত ওরিয়েন্টেশন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল ইট-পাথর আর হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন শিক্ষায়তন বা বহুতল ভবন গড়ে তুললেই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। যদি না সেই ভবনে প্রবেশ করা শিক্ষার্থী মানসিকভাবে সুস্থ, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠে। বর্তমান সরকারের আনন্দময় ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার এই ইতিবাচক উদ্যোগকে সফল করতে হলে আজই আমাদের মা ও শিশুর যথাযথ পুষ্টি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভেজালমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে আমাদের স্বপ্নের এক সুস্থ, মেধাভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ।

লেখক: অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক, ডক্টর দিপু সিদ্দিকী নামে অধিক পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কবি এবং সমাজ সেবক।

Share: