জলবায়ু অভিঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম: কারিতাস সংলাপের আলোকে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ – প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আজ আর শুধু বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা আমাদের বাস্তব জীবনের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জনমিতিক কাঠামোকে তীব্রভাবে ওলটপালট করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কারিতাস বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় পরামর্শমূলক সভাটি এই সংকটের বহুমাত্রিক দিককে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে জলবায়ুর প্রত্যক্ষ প্রভাবে গর্ভস্থ শিশু ও নবজাতকের জৈবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আসা লাখ লাখ জলবায়ু শরণার্থীর নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা চরম সংকটের মুখে পড়ছে। এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

অদৃশ্য সংকট এবং অধিকারহীনতার বৃত্ত: কারিতাসের পরামর্শমূলক সভায় বিশিষ্ট আলোচকদের বক্তব্যে জলবায়ু অভিবাসীদের সংকটকে ‘বহুমুখী এবং অদৃশ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আমাদের পূর্ববর্তী বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সরাসরি সমর্থন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে গ্রাম থেকে শহরে—বিশেষ করে ঢাকার মতো মেগাসিটির বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, তারা এক চরম নাগরিক অধিকারহীনতার আবর্তে পড়ছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাদের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে থাকায়, শহরে এসে তারা রাষ্ট্রীয় কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পায় না। এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে পরিবারগুলোর শিশু ও সন্তানসম্ভবা মায়েরা। অস্বাস্থ্যকর বস্তি, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবের পাশাপাশি মৌলিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এই শিশুরা ক্রনিক অপুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক অভাব শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করছে না, বরং একটি পুরো প্রজন্মকে শুরুতেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

গণমাধ্যমের তথ্য-ঘাটতি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা:

জলবায়ু পরিবর্তনের এই গভীর সংকটটি নীতিনির্ধারকদের নজরে আনার প্রধান মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। তবে কারিতাসের সভায় প্রাবন্ধিক ও জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ড. দিপু সিদ্দিকী অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গণমাধ্যমে বিনোদন বা ক্রীড়া জগতের সংবাদের আধিক্য থাকলেও জলবায়ু অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সংকট, সরকারি নীতিমালার শূন্যতা এবং এর বৈজ্ঞানিক প্রভাব নিয়ে গভীর ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনের বেশ অভাব রয়েছে।

সাংবাদিকদের কাছে পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্য না থাকার কারণে এই মানবিক বিপর্যয়টি নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক গুরুত্ব সহকারে পৌঁছাচ্ছে না। এই তথ্য-ঘাটতি দূর করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। উপকূলের ‘ক্লাইমেট যোদ্ধাদের’ গল্প এবং জলবায়ুজনিত কারণে শিশুদের প্রতিবন্ধী হয়ে ওঠার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়মিত তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের বিশেষ ফোরাম গঠন এবং ফেলোশিপের ব্যবস্থা করা এখন অত্যন্ত আবশ্যক।

বৈদেশিক সহায়তার শূন্যতা এবং রাষ্ট্রীয় টেকসই প্রযুক্তির অভাব

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাহী সদস্য শাহীন হাসনাতের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকে জলবায়ু মোকাবিলায় বৈদেশিক অনুদান ও সহায়তার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অথচ জলবায়ুর কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ ও এর ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এই যে একটি বড় আর্থিক ও কাঠামোগত শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের জন্য দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সরকারি প্রকল্পগুলোর অপচয় বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষ করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প কলকারখানায় আধুনিক ও গ্রিন প্রযুক্তির অভাবের কারণে যে বিষাক্ত রাসায়নিক পরিবেশ ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা বন্যা ও বৃষ্টির পানির মাধ্যমে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। কারিতাসের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা যেমনটি মনে করিয়ে দিয়েছেন—বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য হলেও আমরাই সবচেয়ে বড় শিকার। তাই উন্নত বিশ্ব থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণ বা জলবায়ু তহবিলের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তা সরাসরি জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং ঝুঁকিপূর্ণ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজে আসে। নীতিগত সুপারিশ এবং সমাপনী ভাবনা:

কারিতাস বাংলাদেশের এই জাতীয় পরামর্শমূলক সভাটি আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, জলবায়ু অভিবাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে একটি সামগ্রিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

১. পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন, আবাসন, শিক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় বা বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে।

২. নীতিমালার আধুনিকায়ন: জলবায়ু অভিবাসীরা দেশের যে প্রান্তেই স্থানান্তরিত হোক না কেন, তারা যেন তাৎক্ষণিকভাবে শহরের বস্তি বা নতুন আশ্রয়স্থলে সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে লক্ষ্যে জাতীয় নীতিমালায় জরুরি সংশোধন আনা প্রয়োজন।

৩. গবেষণা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা: জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গর্ভস্থ শিশু এবং নবজাতকেরা যেভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে, তা প্রতিরোধে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দসহ গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করা দরকার।

বাংলাদেশ সরকার, গণমাধ্যম এবং কারিতাসের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর যৌথ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবল এই জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, সবল এবং প্রতিবন্ধকতাহীন পৃথিবী উপহার দিতে হলে এখনই সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক’ ডক্টর দিপু সিদ্দিকী,গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

Share: