“বন্দুকের গুলি শরীরকে ঝাঁঝরা করে, আর নীতিনির্ধারকদের ঠান্ডা পরিসংখ্যানের একেকটি সংখ্যা গিলে খায় জীবন্ত মানুষের বাস্তব অস্তিত্বকে। এটাই সমকালের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।”
উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন তাঁর কালজয়ী তত্ত্বে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “সাব-অল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?”, তখন বিশ্বজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী মহল ধরে নিয়েছিল এটি হয়তো কেবলই সুদূর অতীতের ঔপনিবেশিক ভারতের সতীদাহ প্রথা কিংবা ব্রাত্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর প্রান্তিকতার চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই মধ্যভাগে এসে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে স্পিভাকের সেই ‘সাব-অল্টার্ন’ (Subaltern) এবং ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ (Epistemic Violence) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার সূত্রটি এক সম্পূর্ণ নতুন, নির্মম ও রূপান্তরিত প্রেক্ষাপটে হাজির হয়। আজ কেবল বনের আদিবাসী, কারখানার পোশাক শ্রমিক কিংবা সমাজের চির-অবহেলিত দলিত সম্প্রদায়ই সাব-অল্টার্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের শতকোটি টাকার ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার লুট আর মেগা প্রজেক্টেঅর আড়ালে পাচার হয়ে যাওয়া কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ভারে পিষ্ট দেশের কোটি কোটি ‘সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নাগরিকই’ আসলে আধুনিক যুগের এক এক জন নব্য-সাব-অল্টার্ন।
নব্য-সাব-অল্টার্ন: যখন সাধারণ নাগরিকই ‘দলিত’
ঐতিহাসিকভাবে সাব-অল্টার্ন বলতে আমরা বুঝতাম যারা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। কিন্তু সমকালীন বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্র এবং প্রান্তের দূরত্ব ভৌগোলিক নয়, বরং তা ‘নিরাপত্তা বলয়’ এবং ‘অর্থনৈতিক হেজিমনি’ বা আধিপত্যের দেয়াল দিয়ে নির্মিত।
বছরের পর বছর ধরে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত পানি করা রেমিট্যান্স আর ঘাম ঝরানো করের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো একে একে তারল্য সংকটে পড়ে ফোকলা হয়ে যাচ্ছে, শেয়ারবাজারের সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রতিদিন অহরহ নানা অনিয়ম, পদে পদে ঘুষের দাপট, অনৈতিক লেনদেন, আর গুম-খুনের মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ঘটছে। এই ব্যবস্থার শিকার যারা—অর্থাৎ আপনি, আমি এবং এই রাষ্ট্রের সাধারণ আমজনতা—তারাই আসলে আজকের ‘নব্য-দলিত’। এই শোষিত শ্রেণীটি খুব তীব্রভাবে বোঝে যে তারা প্রতিদিন লুণ্ঠিত হচ্ছে, প্রতিনিয়ত তাদের পকেট কাটা যাচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোগত জটিলতা আর ক্ষমতার নিজস্ব ব্যাকরণের কারণে তারা এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ বা আইনি বয়ান তৈরি করতে পারছে না। তারা ভুগছে, কিন্তু তাদের এই ভুক্তভোগী সত্তাকে ক্ষমতার উচ্চ অলিন্দে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।
রাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা বলয়’ এবং সমকালীন এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ওঠে স্পিভাকের ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার। আমরা মনে করি সহিংসতা মানেই কেবল রাজপথে লাঠিচার্জ, গুলি বা শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র এর চেয়েও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর এক সহিংসতা জারি রাখে—তা হলো তথ্যের বিনির্মাণ এবং প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা।
আমাদের দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক—তাঁরা মন্ত্রী হোন, প্রভাবশালী সচিব হোন, কিংবা খোদ সরকারপ্রধান—তাঁরা প্রত্যেকেই একটি অভেদ্য, নিশ্ছিদ্র ‘নিরাপত্তা বলয়’ এবং চাটুকার আমলাতন্ত্রের দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রশ্ন হলো, এই যে মাঠপর্যায়ের অন্যায়, অত্যাচার আর দুর্নীতির সত্যিকারের বীভৎস চিত্র, তা কি আদৌ সেই উচ্চ মহলের দেওয়াল ভেদ করে তাঁদের কানে পৌঁছায়?
উত্তর হলো—পৌঁছায় না। আর এখানেই কাজ করে জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা। রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং সুশীল তাত্ত্বিকেরা সাধারণ মানুষের হাহাকার আর কান্নাকে উচ্চ মহলে পেশ করার সময় ‘পরিসংখ্যানের ভাষায়’ রূপান্তর করে ফেলে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়ের ভুয়া সূচক আর উন্নয়নের নান্দনিক বয়ানের আড়ালে সাধারণ মানুষের আসল কণ্ঠস্বরটিকে পুরোপুরি বিকৃত বা ভ্যানিশ (মুছে) করে দেওয়া হয়। যখন একজন রিকশাচালক বা মধ্যবিত্ত পিতা বাজারে গিয়ে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সন্তানের দুধ কিনতে না পেরে নীরবে চোখের জল ফেলেন, নীতিনির্ধারকদের টেবিলে সেই কান্না গিয়ে পৌঁছায় “সামষ্টিক অর্থনীতির সাময়িক মুদ্রাস্ফীতি” (Inflation) নামক একটি প্রাণহীন ও শুষ্ক শব্দ হিসেবে। সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার নিজস্ব যে ভাষা, তাকে ক্ষমতার সুশীল ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে পুরোপুরি হত্যা করা হয়। এটিই হলো আধুনিক এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স, যেখানে কলমের খোঁচায় ও রিপোর্টের পাতায় কোটি মানুষের কষ্টকে অগ্রাহ্য করে এক কৃত্রিম ‘স্বর্গরাজ্যের’ আখ্যান তৈরি করা হয়।
স্পিভাকের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা:
স্পিভাক তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ শাসক ও দেশীয় পন্ডিতদের ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে আসল নির্যাতিত নারীটির কণ্ঠস্বর হারিয়ে গিয়েছিল। আজকের বাংলাদেশেও ঠিক একই চিত্র দৃশ্যমান। এখানে একদিকে রয়েছে অর্থ লুটপাটকারী নব্য-ধনিক শ্রেণী ও তাদের রক্ষাকর্তা দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্র, আর অন্যদিকে রয়েছে গালভরা উন্নয়নের তত্ত্ব কপচানো এক শ্রেণীর ‘জ্ঞানপাপী’ বুদ্ধিজীবী। এই দুই পক্ষের তৈরি করা তথাকথিত ‘উন্নয়নের মহাসড়কের’ বয়ানের নিচে সাধারণ মানুষের চিৎকার ও আর্তনাদ সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ কথা বলতে চাইছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রের শোনার কানগুলো এতটাই ক্ষমতার গল্প শুনতে অভ্যস্ত যে, এই সাধারণের চিৎকার সেখানে কেবলই ‘উচ্ছৃঙ্খল কোলাহল’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে পরিগণিত হয়। ফলে স্পিভাকের সেই চরম সত্যটি আজও কার্যকর: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে নব্য-সাব-অল্টার্নরা আসলে কথা বলতে পারছে না; তাদের কথা পৌঁছাচ্ছে না।
বিকল্প প্রেক্ষাপট: কীভাবে এই কণ্ঠস্বর সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছানো সম্ভব?
যদি এই দান্দ্বিকতার অবসান না ঘটে, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য। নিরাপত্তা বলয়ের কৃত্রিম দেয়াল ভেদ করে নব্য-সাব-অল্টার্ন বা সাধারণ মানুষের খাঁটি কণ্ঠস্বরকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছাতে হলে প্রথাগত পথ ছেড়ে আমাদের একটি সম্পূর্ণ ‘ভিন্ন ও বিকল্প প্রেক্ষাপট’ তৈরি করতে হবে:
১. মধ্যস্থতাকারী বা ‘জ্ঞানপাপীদের’ বর্জন: প্রথমত, সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে যে তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী বা সুযোগসন্ধানী মধ্যস্থতাকারীরা কখনোই তাদের আসল প্রতিনিধি হতে পারে না। এই জ্ঞানপাপীরা সাধারণের ক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতার কাছে বিক্রি করে। তাই প্রান্তিক মানুষকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান সরাসরি তুলে ধরতে হবে।
২. ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’ বা প্রতি-বয়ান তৈরি: ডিজিটাল মাধ্যম ও বিকল্প গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে নীতিনির্ধারকদের চাপিয়ে দেওয়া ‘উন্নয়নের মিথ্যা পরিসংখ্যানকে’ সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে হবে। অর্থনীতির শুষ্ক সংখ্যার বিপরীতে প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, ব্যাংক লুটের কারণে পেনশনের টাকা না পাওয়া প্রবীণ নাগরিকের কষ্টকে একেকটি জীবন্ত মানবিক দলিল হিসেবে জনসমক্ষে আনতে হবে। সংখ্যার সহিংসতাকে রুখতে হবে বাস্তব জীবনের গল্প দিয়ে।
৩. ক্ষমতার কাঠামোকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধকরণ:
নাগরিক সমাজকে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করতে হবে যা মন্ত্রী বা সচিবদের চাটুকার পরিবেষ্টিত রিপোর্টের সত্যতাকে জনসমক্ষে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, এটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা থেকে মুক্তির প্রধান হাতিয়ার।
দেয়াল ভাঙার সময়
নিরাপত্তা বলয়ের দেয়ালগুলো যত ভারী আর উঁচুই হোক না কেন, ইতিহাসের সত্য হলো—জনগণের পুঞ্জীভূত নীরবতার শক্তি যেকোনো কংক্রিটের দেয়ালের চেয়েও শক্তিশালী। আজ যদি আমাদের তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ নাগরিকেরা এই সূক্ষ্ম জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার রূপটি ধরতে না পারেন, তবে ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুটপাটকারী আর অর্থ পাচারকারীরাই এই দেশের ভাগ্যবিধাতা সেজে থাকবে।
লেখক অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী শিক্ষাবিদ এবং সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
আমাদের কাজ এখন কারো হয়ে কথা বলে দেওয়া নয়, বরং এমন এক সম্মিলিত সামাজিক ও নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটি বাধ্য হয় প্রবৃদ্ধির ভুয়া খাতা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আসল আর্তিটিকে শুনতে। যেদিন এই নব্য-সাব-অল্টার্নদের কণ্ঠস্বর কোনো অনুবাদ বা বিকৃতি ছাড়াই সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রের কান ফুঁড়ে প্রবেশ করবে, সেদিনই কেবল এই লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটবে এবং একটি সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক ও মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্ম হবে। সময়ের দাবি এটাই—নিরাপত্তা বলয়ের দেওয়াল ভাঙতে হবে, মানুষের কণ্ঠস্বরকে মুক্ত করতে হবে।