মোহমুক্তির আলো ও আত্মদানের মহিমা: ভাঙনের দোরগোড়ায় এক টুকরো রোদ্দুর – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

ড. দিপু সিদ্দিকী

মানুষের যৌথ জীবনের সবচেয়ে নিবিড় ক্যানভাসটির নাম ‘সংসার’। এটি কেবল সমাজস্বীকৃত আইনি দলিলে বাঁধা দুটি শরীরের সহাবস্থান নয়, বরং দুটি ভিন্ন স্রোতের এক মোহনায় এসে শান্ত হওয়ার পরম সাধনা। কিন্তু সমকালীন দৃশ্যপটে এই শান্ত মোহনায় তীব্র কালবৈশাখীর ঝাপটা লেগেছে। প্রতিনিয়ত চারপাশের দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ছে, বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। একটু নিরাসক্ত চোখে তাকালেই বোঝা যায়, এই ভাঙনের নেপথ্যে কোনো গভীর আদর্শিক সংকট নেই, বরং রয়েছে এক পরম আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদী মানসিকতা, এক আকাশছোঁয়া অবাস্তব অলীক কল্পনা এবং শারীরিক চাহিদার অনিয়ন্ত্রিত মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি। যখন পারস্পরিক সমর্পণকে তুচ্ছ করে কেবল ক্ষণিকের মোহাচ্ছন্নতা কিংবা অন্ধ জৈবিক তাড়না জীবনের ধ্রুবতারা হয়ে ওঠে, তখন একটি বহু যত্নে গড়া সংসার ধুলোয় মিশে যায়। এই ক্রান্তিকালে আমাদের অবিনাশী ত্যাগের এক নতুন দার্শনিক পরশ প্রয়োজন, যা মোহকে জয় করে সম্পর্ককে দেবে এক অলৌকিক স্থায়িত্ব।

মোহের চোরাবালি ও আধুনিকতার অসুখ: আমরা এমন এক গোলকধাঁধাময় সময়ে বাস করছি, যা মূলত ‘তাৎক্ষণিক ভোগের দর্শন’ দ্বারা পরিচালিত। এই পুঁজিবাদী মনস্তত্ত্ব মানুষকে প্রতিনিয়ত প্ররোচিত করে কেবল নিজের আনন্দ, নিজের একক স্বস্তি ও অধিকারের সীমানা নিয়ে ভাবতে। এই আত্মসুখের তীব্র বিষ যখন অলক্ষ্যে দাম্পত্যের পবিত্র আঙিনায় প্রবেশ করে, তখন সম্পর্কের মূল আত্মিক সুতোটি ছিঁড়ে যায়। মানুষ তখন সম্পর্ককে নদীর গভীরতায় মাপে না, মাপে কেবল জৈবিক চাহিদার জোয়ার-ভাটায়। যখন সেই চাহিদা স্বাভাবিকের সীমানা ডিঙিয়ে এক ধরনের বিকৃত জেদ বা চরম স্বার্থপর লালসায় রূপ নেয়, তখন অপর সঙ্গীর মানবিক অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়।

এর সাথে এসে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়নের তৈরি ‘আকাশছোঁয়া স্বপ্নের’ হাতছানি। বাস্তবতার কঠিন, ধূসর জমিনকে অস্বীকার করে মানুষ সেলুলয়েডের ফিতার মতো কোনো কাল্পনিক পরম সুখের খোঁজে মরিয়া হয়ে ছুটছে। এই অলীক মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। ফলে সামান্য মতভিন্নতা কিংবা শারীরিক অতৃপ্তিকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা একটি যৌথ স্মৃতিকে এক মুহূর্তে চূর্ণ করে দিতে মানুষের হাত কাঁপে না। অথচ তারা ভুলে যায়, মোহ মৃগতৃষ্ণিকার মতো; তা হাতের মুঠোয় আসার পর তার ভেতরের শূন্যতা ও রুক্ষতা আরও তীব্রভাবে মানুষকে গ্রাস করে।

অবুজ চোখের ভাষা ও নৈঃশব্দের দায়:

একটি দাম্পত্যের বিচ্ছেদ কখনোই কেবল দুটি মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। এটি একটি আস্ত সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির অপমৃত্যু। আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে তখন, যখন সেই সংসারের উঠোনে কোনো ঔরসজাত সন্তানের হাসিকান্না জড়িয়ে থাকে। একটি শিশু যখন এই পৃথিবীতে চোখ মেলে, সে তো কোনো একক ব্যক্তির নয়, সে মা ও বাবার যৌথ স্নেহের আকাশ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, বাবা-মায়ের অহংকার, বিকৃত জেদ কিংবা সাময়িক শারীরিক স্খলনের কঠিন মাশুল গুনতে হয় সেই নিষ্পাপ নিষ্পাপ শৈশবটিকে।

দার্শনিক ও মানবিক বোধের সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে যদি আমরা ভাবি, তবে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষণিক অধিকার বা শারীরিক অপূর্ণতাকে তুচ্ছ করে হলেও সেই ভবিষ্যৎ শিশুটির নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকিয়ে সমাজ-সংসারকে টিকিয়ে রাখা শুধু সামাজিক চুক্তি নয়, এক পরম আধ্যাত্মিক আবশ্যকীয়তা। একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার শিশুর মনের নরম জমিনে যেভাবে আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো ক্ষত তৈরি করে, তা পৃথিবীর কোনো বৈষয়িক সুখ দিয়ে উপশম করা সম্ভব নয়। এখানে এসে মানুষের তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ হেরে যায় তার ‘অভিভাবকত্ব’ এবং ‘সামাজিক দায়বদ্ধতার’ চিরন্তন সত্যের কাছে।

আত্মদানের সর্বোচ্চ সীমানায় সম্পর্কের পুনর্জন্ম:

সম্পর্ক ধরে রাখার এই কঠিন ঝঞ্ঝাবর্তে যে শক্তির সবচেয়ে বেশি আরাধনা প্রয়োজন, তার নাম ‘ত্যাগ’। আধুনিক বস্তুবাদী সমাজ ‘ত্যাগ’ বা ‘আত্মদান’ শব্দটিকে এক প্রকার দুর্বলতা বা দাসত্ব বলে উপহাস করতে ভালোবাসে। কিন্তু শাশ্বত দর্শন আমাদের শেখায়, ত্যাগই মানুষের পশুবৃত্তি থেকে দেবত্বের দিকে উত্তরণের একমাত্র সেতু।

ভোগের অন্ধত্ব বনাম ত্যাগের আলো : ভোগ মানুষকে নিজের বৃত্তে বন্দী করে অন্ধ করে দেয়, আর ত্যাগ মানুষকে দেয় সীমাহীন আকাশের ব্যাপ্তি। দাম্পত্য জীবনে ত্যাগের অর্থ এই নয় যে নিজের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা, বরং এর অর্থ হলো সাময়িক মোহের চেয়ে বৃহত্তর কল্যাণ ও যৌথতার অস্তিত্বকে বেশি ভালোবাসতে পারা।

সহনশীলতার শেষ রেখা: প্রতিটি মানুষেরই একটা নির্দিষ্ট সহনশীলতার পরিমাপ থাকে। কিন্তু যখন সামনে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ এবং একটি পরিবারের অস্তিত্বের প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তখন সেই সীমানাকে ভালোবাসার জোরে আরও কিছুটা প্রসারিত করতে হয়। এই সর্বোচ্চ আত্মদানই একটি সাধারণ সামাজিক সম্পর্ককে এক পরম তীর্থে রূপান্তর করে।

যৌনতার মানবিকীকরণ: ত্যাগ ও শ্রদ্ধা যখন দাম্পত্যের অন্দরে প্রবেশ করে, তখন যৌনতা আর কেবল অন্ধ জৈবিক ক্ষুধা থাকে না। তা রূপান্তরিত হয় এক নিবিড় আবেগ, গভীর অনুভূতি, প্রেম এবং পারস্পরিক একাত্মতায়। তখন শরীর মনের অনুগামী হয়, মন শরীরের দাসত্ব করে না।

কলুষমুক্ত নীড় ও একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন:

সংসার বা পরিবার হলো একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী একক। এই এককের ভেতরে যখন শান্তি, স্থায়িত্ব ও ক্ষমার আবহ তৈরি হয়, তখন তার সুবাস অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি অলিতে-গলিতে।

যে মানুষটি নিজের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে ত্যাগ, ধৈর্য ও পরম সহনশীলতার পাঠ নেয়, সে বাইরের পৃথিবীতে গিয়েও কখনো ধ্বংসাত্মক আচরণ করতে পারে না। ঘর থেকে শুরু হওয়া এই কলুষমুক্ত, নিষ্পাপ ও নিবিড় সম্পর্কের হাওয়া তখন ছুঁয়ে যায় আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনকেও। আজ আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে যে চরম অসহিষ্ণুতা, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও হিংস্রতা আমরা দেখি—তাও তো আসলে এক প্রকার আধিপত্য বিস্তার ও ভোগেরই বিকার। দাম্পত্যে ও পরিবারে যদি ত্যাগের এই মহিমা পরিস্ফুট হয়, তবে রাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরেও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সহাবস্থানের এক সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

প্রেম, ভালোবাসা এবং যৌনতাকে কেবল মাংসের খাঁচায় বন্দী না রেখে আসুন আমরা তাকে হৃদয়ের আলোয় উদ্ভাসিত করি। মোহের অবসান ঘটিয়ে ত্যাগের মহিমায় যদি আমরা আমাদের চারপাশকে সুন্দর করে তুলতে পারি, তবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি বন্ধন হবে স্থায়ী, নিবিড় এবং চিরকল্যাণময়। ভাঙনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজ সেই ত্যাগের আলোকেই স্বাগত জানানোর দিন।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সমাজচিন্তাবিদ কবি এবং প্রাবন্ধিক। সম্পাদক ডেইলিপ্রেসওয়াচ

Share: