জলবায়ু অভিবাসীদের সুরক্ষায় যুগোপযোগী নীতিমালার দাবি: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জোর দেওয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, ১৮ জুন ২০২৬: দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত জনগণের টেকসই সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালাকে বেগবান করতে এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) অডিটোরিয়ামে কারিতাস বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক জাতীয় পর্যায়ের পরামর্শমূলক সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সভায় জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশ নেন।

 

পরামর্শমূলক সভায় অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ‘চর্চা ডটকম’-এর সম্পাদক সোহরাব হাসান। তিনি জলবায়ু অভিবাসীদের সংকটকে বহুমুখী এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘অদৃশ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে সংকট দিন দিন আরও বাড়ছে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে।”

সরকারি প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকারি প্রকল্পগুলোর অপচয় কমানোর দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। তিনি আরও যোগ করেন, “ইচ্ছে করে কেউ নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে শহরে আসে না। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে থাকায়, শহরে এসে তারা কোনো সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পায় না। ফলে তাদের বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।” সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।

‘ক্লাইমেট যোদ্ধা’ ও সাংবাদিকদের বিশেষ নেটওয়ার্ক

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রাক্তন সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরে তাদের ‘ক্লাইমেট যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন। জলবায়ু সংকটকে মিডিয়ায় নিয়মিত ও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের নিয়ে একটি পৃথক নেটওয়ার্ক বা ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া, বাছাইকৃত ও আগ্রহী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ফেলোশিপের ব্যবস্থা করা হলে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী ও জোরালো প্রতিবেদন প্রকাশের পরিবেশ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।

বৈদেশিক সহায়তা হ্রাস ও নতুন শূন্যতা

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাহী সদস্য শাহীন হাসনাত ঢাকাকে ‘প্রাচ্যের রহস্যময় শহর’ উল্লেখ করে একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ঢাকায় মানুষের ঢোকার সুযোগ আছে, কিন্তু বের হবার সুযোগ নেই। কারণ গ্রামে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় এই বাস্তুচ্যুত মানুষেরা আর ফিরে যেতে পারছে না।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গণ্য করার ফলে বর্তমানে বৈদেশিক সহায়তা অনেকাংশে কমেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এই যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন এবং এর যৌথ দায়িত্ব সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমকেই নিতে হবে।

সঠিক তথ্যের ঘাটতি ও গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা

অনুষ্ঠানে অন্যতম আলোচক জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক এবং প্রাবন্ধিক ড. দিপু সিদ্দিকী মিডিয়ায় জলবায়ু ইস্যুর উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে ক্রীড়া, বিনোদন প্রভৃতি বিষয়ে প্রচুর সংবাদ ও ফিচার প্রকাশিত হলেও জলবায়ু অভিবাসীদের সংকট, সরকারি নীতিমালার ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিষয়ে সঠিক তথ্যের বেশ অভাব রয়েছে।” সাংবাদিকদের কাছে পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী তথ্য না থাকার কারণে মিডিয়ায় এই সংকটটি যেভাবে আসা উচিত, তথ্য ঘাটতির ফলে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কার্বন নিঃসরণ ও উন্নত দেশের দায়বদ্ধতা

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অত্যন্ত নগণ্য ভূমিকা রাখলেও জলবায়ুর ক্ষতির শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।” উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা সরকারকে অনুদান ও সহযোগিতা দিচ্ছে। তবে এই অনুদানের যথাযথ ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই জটিল সংকট সমাধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন।

এর আগে সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (সিডিআই) থিউফিল নকরেক। তিনি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত, বিপদাপন্ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি নিরসন এবং জীবনমান উন্নয়নে কারিতাসের বহুমুখী কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কারিতাস বাংলাদেশের টেকনিক্যাল এডভাইজার (এডভোকেসি) ড. জামিল আহমেদ।

উন্মুক্ত আলোচনা ও সমন্বয়ের তাগিদ

পরামর্শমূলক সভায় উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে আরও বক্তব্য ও নিজস্ব মতামত তুলে ধরেন জাহিদা পারভিন ছন্দা, আল আমীন তৌহিদ, জাহিদ আল আমীন, লতিফ রানা, লোকমান কবীর,আইরিন নাহার ও কে এম ashraf উদ্দিনসহ অনেকে।

আলোচকগণ একমত হন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শহরাঞ্চলে নানামুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি নীতিমালাকে আরও সমন্বিত ও যুগোপযোগী করতে হবে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জরুরি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সংবাদ মাধ্যমগুলো যেন এই বিষয়ে আরও গভীর পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে, সভায় সেই তাগিদ দেওয়া হয়।

 

সভায় উত্থাপিত বিভিন্ন গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য-উপাত্তে জলবায়ু অভিবাসনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবন, তীব্র লবণাক্ততা এবং নদীভাঙনের ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের হার ক্রমাগত বাড়ছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো জীবনধারণের তাগিদে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানে তারা অনিরাপদ আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অভাব এবং চরম সামাজিক বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস (RAMRU & SCMR): বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা রামরু (RMMRU) এবং এসসিএমআর (SCMR)-এর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১.৬ থেকে ২.৬ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

আশ্রিতদের পরিসংখ্যান (GIZ): আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জিআইজেড (GIZ)-এর ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন শহরাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৭ শতাংশই একমাত্র উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বাসিন্দা।

মানবিক সেবায় কারিতাস বাংলাদেশ-এর ভূমিকা,

দুর্যোগ প্রশমণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কারিতাস বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি সময়ের কাজের একটি বিবরণী সভায় তুলে ধরা হয়।

কারিতাস এ পর্যন্ত জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ লক্ষাধিক গৃহ নির্মাণ, পয়নিঃস্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কমিউনিটি অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কাছে মানবিক সেবা পৌঁছে দিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়াতে সংস্থাটি ৩,০০০ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছে এবং ১৪,০০০ কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেছে।

উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের সুরক্ষায় দেশের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় ৩২৯টি আধুনিক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে কারিতাস।

বর্তমানে শহরাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু অভিবাসীদের মর্যাদাপূর্ণ অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জার্মান সরকারের বিএমজেড (BMZ) এবং কারিতাস জার্মানির যৌথ অর্থায়নে ‘DRR & CCA’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্প পরিচালনা করছে কারিতাস বাংলাদেশ।

Share: