ট্রাস্টি সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ: নর্থ সাউথে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ক্যাম্পাস থমথমে

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা:ট্রাস্টি বোর্ডের এক প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনএসইউ)। এই ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এদিকে অভিযুক্ত ট্রাস্টি সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহানকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ নম্বর ফটকের পাশে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে আয়োজিত এক সংহতি সমাবেশ ও মানববন্ধন থেকে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে যৌন হয়রানি বন্ধ ও ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।

আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী মুশতাক তাহমিদ বলেন, “নারীর নিরাপত্তা একটি মৌলিক অধিকার। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সবার সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।”

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি এক অভিভাবক বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়—চাকরি, পদোন্নতি ও আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারী কর্মী ও ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং ভর্তি-বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন তিনি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কিছু আপত্তিকর চ্যাটের স্ক্রিনশটও বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ১৪ মে ইউজিসি নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

ইউজিসির নির্দেশনার পর গত ১৮ মে জরুরি সভায় বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট বোর্ড। অভিযুক্ত সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত চলাকালীন সময়ে তাঁর ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বোর্ড সভায় অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আগামী ৪ জুন বনানী ক্লাবে অনুষ্ঠেয় বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে তাঁকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জবাব দিতে ব্যর্থ হলে ট্রাস্টের আইন অনুযায়ী তাঁকে স্থায়ীভাবে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটগুলোকে ‘ফটোশপ ও জোড়াতালি দেওয়া’ দাবি করে তিনি বলেন, “এগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা হওয়া উচিত। আগামী জুলাইয়ে আমার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা রয়েছে। আমি যাতে চেয়ারম্যান হতে না পারি, সে জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই শত্রুতামূলক কাজ করা হচ্ছে। আমি আইনি নোটিশ দিয়েছি এবং সব অভিযোগের জবাব দেব।”

অন্যদিকে ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, “নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউজিসি) চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই কেবল ওনাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এটি না করলে বোর্ড নিজেই আইনি জটিলতায় পড়ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, নোটিশ পাওয়ার পর থেকে তিনি ফোনে ও মেসেজে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি জালিয়াতি ও টেম্পারিংয়ের ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল, যা নিয়ে দুদক মামলা করে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনায় অর্থ আত্মসাতের মামলায় অন্য ট্রাস্টিদের সঙ্গে তিনিও কারাভোগ করেছিলেন।

১৯৯২ সালে মাত্র ১৩৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজারেরও বেশি। আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক সাফল্য দেখালেও সাম্প্রতিক এই শীর্ষ পর্যায়ের কেলেঙ্কারি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটি ট্রাস্টিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এ নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”

Share: