বাংলাদেশে যৌন সহিংসতা ও সামাজিক অবক্ষয়: একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

কবি দিপু সিদ্দিকীএকটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কেবল তার মাথাপিছু আয়, জিডিপি কিংবা মেগা প্রজেক্টের অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্রের আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে অবহেলিত এবং দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তার নিশ্চয়তায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৭১ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত যেভাবে নির্মম যৌন সহিংসতা ও পাশবিকতার শিকার হচ্ছেন, তা কেবল সাধারণ অপরাধের খতিয়ান নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ক্যানসারের বহিঃপ্রকাশ।

গত ২২ মে ২০২৬ তারিখে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। একজন বৃদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা, উপর্যুপরি ধর্ষণ এবং মৃত্যুর পরও মরদেহের ওপর বিকৃত পাশবিকতা—এই চরম মানসিক বিকৃতি কোনো বিছিন্ন ঘটনা হতে পারে না। এই নৃশংসতা আমাদের বাধ্য করে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে: আমরা সমাজ হিসেবে আসলে কোথায় যাচ্ছি? আমাদের চারপাশের এই মানুষগুলো কি ক্রমান্বয়ে হিংস্র পশুতে রূপান্তরিত হচ্ছে?

 

বর্তমান চিত্র: পরিসংখ্যানের অন্তরালে মানবিক বিপর্যয়

মানবাধিকার সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ধারাটি কোনো নির্দিষ্ট বয়স, শ্রেণি বা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

 

যৌন সহিংসতার শিকার (বয়সভিত্তিক বিস্তার):

৩ বছরের শিশু ───► [চরম অবুঝ ও অরক্ষিত]

১০-১৮ বছরের কিশোরী ───► [সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি]

৭০+ বছরের বৃদ্ধা ───► [শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল]

 

 

এই পরিসংখ্যান ও বাস্তব ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই ধরনের অপরাধের নেপথ্যে কোনো ‘যৌন আকর্ষণ’ কাজ করে না, বরং কাজ করে চরম **ক্ষমতার দাপট**, **মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি** এবং **সহিংস প্রবৃত্তির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ**। যখন একজন তিন বছরের শিশু কিংবা একজন বৃদ্ধা নিরাপদ থাকেন না, তখন বুঝতে হবে অপরাধীর মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় বা নূন্যতম নৈতিকতাবোধ অবশিষ্ট নেই।

অপরাধের বহুমাত্রিক কারণ: পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণ

এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। এর পেছনে রয়েছে রাজনীতি, সমাজকাঠামো, মনস্তত্ত্ব এবং মাদকের এক আত্মঘাতী চক্র।

 

১. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা

অপরাধ বিজ্ঞানের একটি সাধারণ সূত্র হলো—অপরাধের শাস্তি যদি নিশ্চিত এবং দ্রুত না হয়, তবে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ঘাটাইলের ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ দ্রুত সাইফুলকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও, দেশের সিংহভাগ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্য সম্ভাব্য অপরাধীদের মনে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।

 

২. রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অপপ্রয়োগ ও ধামাচাপা

অনেক সময় এই ধরনের পৈশাচিক ঘটনাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কোনো ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার বানালে মূল অপরাধীর গুরুত্ব কমে যায়। আবার বিপরীতভাবে, অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চলে। ফলে সুস্থ বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং সমাজ প্রকৃত সমাধান থেকে দূরে সরে যায়।

 

৩. ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি

আমাদের ঐতিহ্যগত সমাজব্যবস্থা ছিল যৌথ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানের পুঁজিবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনধারা সমাজকে এক চরম বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পশ্চিমা ‘পেপার কাপ সোসাইটি ফিলোসফি’ বা ভোগবাদী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে যে পবিত্র মানবিক সম্পর্ক, যে সামাজিক নজরদারি (Social Policing) ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্ত। এই শূন্যতার সুযোগে মানুষের মনে চরম মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি ও বিকৃতি দানা বাঁধছে।

 

৪. মাদক, অনলাইন অবক্ষয় এবং সুস্থ সংস্কৃতির অভাব

এই ধরনের প্রায় প্রতিটি পাশবিক অপরাধের পেছনে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। মাদক মানুষের মস্তিস্কের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব। আমাদের তরুণ সমাজ আজ নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্ম এবং ন্যায়চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুস্থ নাটক, সিনেমা, সাহিত্য বা খেলাধুলার চর্চা না থাকায় এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও মানসিক দেউলিয়াত্ব তৈরি হচ্ছে।

 

শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব

একটি সমাজ যখন ক্রমান্বয়ে অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তার প্রথম ধাক্কাটি আসে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।

* **শিক্ষাজীবনে স্থবিরতা ও আতঙ্ক:** সন্তান স্কুলে গিয়ে নিরাপদে ফিরবে কিনা, তা নিয়ে বাবা-মায়েরা সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকেন। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

 

নৈতিকতাহীন প্রথাবদ্ধ শিক্ষা:আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত জিপিএ-কেন্দ্রিক এবং প্রতিযোগিতামূলক। এখানে মুখস্থ বিদ্যা আর অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে দৌড়াতে শেখানো হয়, কিন্তু একজন ভালো মানুষ বা সংবেদনশীল নাগরিক হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয় না। মানবিক মূল্যবোধ, নারীর প্রতি সম্মান এবং পরমতসহিষ্ণুতার মতো বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ে থাকলেও বাস্তবে তার চর্চা অনুপস্থিত।

উত্তরণের পথ: সমন্বিত প্রতিকার

এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ বা পুলিশের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা।

 

┌──► আইন ও বিচার (দ্রুত ট্রাইব্যুনাল, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি)

জাতীয় শিশু ও নারী সুরক্ষা কৌশল ┼──► শিক্ষা ও সংস্কৃতি (নৈতিক শিক্ষা, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা)

└──► সামাজিক প্রতিরোধ (পারিবারিক মূল্যবোধ, মাদক নির্মূল)

 

 

ক) বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও দ্রুততম সময়ে শাস্তি

ধর্ষণ ও হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোর জন্য বিশেষায়িত ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ঘটনার তদন্ত থেকে শুরু করে রায় কার্যকর করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একটি নির্দিষ্ট এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

খ) শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও দেশীয় সংস্কৃতির সুসমন্বয়

কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উন্নয়ন নয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজ ব্যবস্থা, ধর্ম, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সুসমন্বয় ঘটাতে হবে। শৈশব থেকেই শিশুদের শারীরিক সীমানা (Body Autonomy), কুৎসিত সংস্কৃতি (Toxic Culture) পরিহার এবং অন্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে হবে।

গ) সুস্থ সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মাদক নির্মূল

অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রুখতে হলে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকের চোরাচালান ও ব্যবসা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কারণ মাদকাসক্ত মন যেকোনো ধরনের বীভৎস অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না।

ঘ) পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়করণ ও সামাজিক প্রতিরোধ

পরিবার হলো মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। সন্তানদের সাথে বাবা-মায়ের দূরত্ব কমাতে হবে, তাদের মানসিক পরিবর্তনের ওপর নজর রাখতে হবে। একই সাথে, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, কোনো অবস্থাতেই তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

 

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল তার আকাশচুম্বী অট্টালিকা বা মসৃণ মহাসড়ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ইতিহাস আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব মনে রাখবে না; ইতিহাস বিচার করবে আমরা আমাদের সমাজকে কতটা মানবিক করতে পেরেছিলাম, আমাদের সন্তানদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পেরেছিলাম।

৩ বছরের শিশু কিংবা ৭১ বছরের বৃদ্ধার ওপর যে বর্বরতা আজ আমরা দেখছি, তা আমাদের গোটা সভ্যতার মুখে এক বড় চপেটাঘাত। এই ক্রন্দন কেবল ভুক্তভোগীদের নয়, এটি মূলত ভেঙে পড়া একটি সমাজ ব্যবস্থার আর্তনাদ। এই পৈশাচিকতার শেষ কোথায়, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার। যদি আমরা আজ চুপ থাকি, তবে এই অন্ধকারের গ্রাস থেকে আমাদের নিজেদের পরিবারও রেহাই পাবে না। তাই এখনই সময়—আইন, বিচার, সমাজ, শিক্ষা এবং ধর্মের আলোয় এই মানসিক বিকৃতির অন্ধকারকে দূর করে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

লেখক: অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক । তিনি ডক্টর দিপু সিদ্দিকী হিসেবে তিনি পরিচিত। সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি এবং প্রাবন্ধিক।

Share: