Main Menu

বৈশ্বিক সংহতির প্রতিশ্রুতি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা

প্রেসওয়াচ রিপোর্টঃ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অনুমোদিত ও পরীক্ষিত করোনাভাইরাসের প্রথম ভ্যাকসিনটি যখন এই সপ্তাহে ৯০ বছর বয়সী মার্গারেট কিনান গ্রহণ করেন তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন মহামারি হয়তো নাগালের মধ্যে এসে যাবে। রেকর্ড দ্রুত সময়ে প্রথম ভ্যাকসিনটি অনুমোদন পাওয়া এবং অন্য আরও কয়েকটি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকার বাস্তবতা ধনী দেশগুলোর জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের শঙ্কা ভ্যাকসিন পাওয়া এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত অর্থ থাকা ও না থাকায় গিয়ে পৌঁছাবে। বৈষম্যের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই মনে করছেন বৈশ্বিক সংহতির প্রতিশ্রুতি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও মুখ থুবড়ে পড়বে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন- এর এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

ধনী দেশগুলো বিগত কয়েক মাস ধরেই পাগলের মতো করে ভ্যাকসিন কিনছে। ডিউক গ্লোবাল হেলথ ইনোভেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী সম্ভাবনায় ভ্যাকসিন কিনতে বেশ কিছু দেশ শত শত কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরও বেশ কিছু দেশ এবং আঞ্চলিক জোট তাদের মোট জনসংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি ডোজ ভ্যাকসিনের আগাম অর্ডার দিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন তদারকি সংস্থা পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স গত সপ্তাহে জানিয়েছে ধনী দেশগুলো তাদের সব মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে প্রয়োজনের চেয়ে তিন গুণ বেশি ডোজ ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছে।

কানাডার সরকার একাই তাদের মোট জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছে। এমনকি তাদের আগাম আদেশ দেওয়া সব ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমতি নাও পেতে পারে।

পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’র তথ্য অনুযায়ী ধনী দেশগুলো বেশি পরিমাণ ভ্যাকসিন কিনে নেওয়ায় প্রায় ৭০টি দরিদ্র দেশ ২০২১ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রতি দশ জনের এক জনকে ভ্যাকসিন দিতে পারবে।

কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গ্রেগরি হাসি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সমতার প্রতিশ্রুতি থাকার পরও ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদকে সর্বাত্মক হয়ে উঠতে দেখা হতাশাজনক।’

আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর প্রধান জন নাকেনগাসং বলেন, দরিদ্র দেশগুলোর ভ্যাকসিন না পাওয়ার অক্ষমতা বিপর্যয়কর হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে বৈশ্বিক সংহতি এবং সহযোগিতার কথা বলে এসেছি তার লিটমাস টেস্টের (এসিড শনাক্তের বিশেষ পরীক্ষা) সময় এখন।’

নাকেনগাসং বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু দেশ অতিরিক্ত ডোজ ভ্যাকসিন কিনে নেবে আর বিশ্বের অন্য এলাকার মানুষ মোটেই ভ্যাকসিন পাবে না- এটা কোনও নৈতিক আচরণ হতে পারে না।’

সংহতি, কেবল তত্ত্বে

বছরের শুরুতে যখন বিভিন্ন দেশে করোনার সংক্রমণ তীব্র হতে শুরু করে আর হাসপাতালগুলো পূর্ণ হতে থাকে তখন সবার জন্য ভ্যাকসিন চালু করতে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। কোভ্যাক্স নামের এই উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছে ভ্যাকসিন জোট জাভি। দুইটি পথে পরিচালিত হয়েছে এই উদ্যোগ। ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সবার কাছে পৌঁছাতে উচ্চ ও মধ্য আয়ের দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। দরিদ্র, বিশেষ করে আফ্রিকা ‍উপমহাদেশের দেশগুলোর ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করতে  আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব দেশের ভ্যাকসিনের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা অর্থায়ন করে।

এখন পর্যন্ত এই দুটি উদ্যোগে শামিল হয়েছে ১৮৯টি দেশ। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়নিযুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি নিজের ব্যক্তিগত অভিমত জানিয়ে বলেছিলেন, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ন্যায্যভাবে বিতরণ নিশ্চিত করার নৈতিক দায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

সমতার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন বিতরণের প্রয়োজন কেবল আর্থিক ইস্যু নয়। জাভির এক মুখপাত্র জানান, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ভ্যাকসিন কিনতে জোটটি দুইশ’ কোটি ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। আর আগামী বছরের মধ্যে এজন্য প্রয়োজন হবে আরও পাঁচশ’ কোটি ডলার।

তবে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে অর্থ দিয়েও তা কেনা যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডার মতো কোভ্যাক্স-এর মূল দাতা দেশগুলো নিজেরাই বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে রেখেছে। পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স বলছে, এসব চুক্তি কোভ্যাক্স চুক্তিকে উপেক্ষা করতে পারে।

তিক্ত অভিজ্ঞতা

এইচআইভি/এইডস- এর জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পাওয়া নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করছেন আফ্রিকার জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা। পশ্চিমা দুনিয়ায় ওষুধটি বাজারে পাওয়া গেলেও তা পেতে তাদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অতি সম্প্রতি একই ধরনের সংহতির কথা বলার পরও এইচ১এন১ ফ্লু ভ্যাকসিনও মহাদেশটিতে পৌঁছায় মহামারি চূড়ান্ত অবস্থায় যাওয়ার বেশ কয়েক মাস পর।

অধ্যাপক গ্রেগরি হাসি মনে করেন, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতর্ক ওইসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘এটা নতুন কোনও অবস্থা নয়। অতীতেও বহুবার একই ঘটনা ঘটেছে।’

আফ্রিকার কর্মকর্তাদের আশা, সংহতির বার্তা যদি নৈতিক যুক্তির ওপরে উঠতে না পারে তাহলে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত যুক্তি হয়তো সেটা পারবে। কোভিড-১৯ মহামারির অবসান ঘটাতে হলে সব জায়গা থেকে এটি নির্মূল করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আফ্রিকা অঞ্চলের ভ্যাকসিন উন্নয়ন সমন্বয়ক ড. রিচার্ড মিশিনগো বলেন, ‘যতক্ষণ না সবাই সুরক্ষিত হচ্ছে ততক্ষণ কেউই সুরক্ষিত থাকতে পারবে না। আমরা একটি সমন্বিত দুনিয়ায় বসবাস করছি, যদি ওইসব দেশ নিজেদের সুরক্ষিত করে ফেলেও তাহলে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করতে হবে। আমাদের এমন একটি দুনিয়ার দরকার যেখানে আমরা সবাই মিথস্ক্রিয়া করতে পারি। কেবল সামাজিকভাবে নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও।’






Related News