Main Menu

“লাল সালাম, মুনীর ভাই” —জাঁ-নেসার ওসমান

“লাল সালাম, মুনীর ভাই”

সালটা ১৯৬৪ কি ১৯৬৫হবে, আমাদের. শ্রী শ্রী মা সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল মাঠে পাঁচ’ছ জন ছাত্র নিয়ে ক্লাস করছেন মুনীর ভাই, মানে সদ্য প্রয়াত সংবাদের. ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান ও মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। চৌদ্দ পনের বছরের চার পাঁচ জন ছেলের মাঝে রয়েছে যত দূর. মনে পড়ে, সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দিনের সেজ ছেলে পারভেজ, অবিভক্ত বৃটিশ ভারতের পুলিশ অফিসার আবদুল বাকী চাচার ছোট ছেলে আহমেদ ইকবাল বাচচু, শ্রদ্ধেয় মন্জুরুল আহ্সান ভায়ের ছোট ভাই কামরুল হাসান, মোজাফ্র. হোসেন পল্টু ভায়ের ছোট ভাই শাহদাত হোসেন ও শাহেদ ইমাম, খোকন।
ছোট খাট হালকা পাতলা গড়নের মুনীর ভাই পড়াচ্ছেন ছোটদের. রাজনীতি।
শুরু হচ্ছে আমাদের.বাম রাজনীতির হাতে খড়ি।
ঢাকার শান্তিনগরের খুব সম্ভব ৭নং চামেলি বাগে মুনীর ভায়ের পৈতৃক নিবাস। একদিন মুনীর ভায়ের প্রতিবেশী মাহমুদ হাসান ভুলু আমাকে মুনীর ভায়ের বাসায় নিয়ে গেলো। দু’তিনটি টিনের দো’চালা বাড়ী।
মুনীর ভায়ের রুমের ভেতর তাকের মাঝে থরে. থরে. বই সাজানো। পুরো রুমটা জুড়ে বই আর বই। সেই থেকে ধীরে. ধীরে. মুনির ভায়ের সাথে যোগা যোগটা বাড়তে থাকে।এই সময় শুরু হলো সারা দেশ ব্যাপী বর্বর. পাকিস্তানি সৈরশাষক আয়ুব বিরোধী গণ-আন্দোলন। ঢাকার রাজ পথে মুনীর ভায়ের পেছনে আমরা সব মিছিল করছি। মুনীর ভায়ের শ্লোগানের সাথে আমরা শ্লোগান ধরছি। সালটা খুব সম্ভব ১৯৬৬।
এর কিছুদিন পর আমরা বকশী বাজারের কোন এক পাকা বাড়ীর দোতালায় কমিউনিষ্ট পার্টির. গোপন মিটিং’এ যোগ দিলাম। ঐ মিটিং’এ আজাদ ভাই মর্মর্স্পশী এক বক্তব্য রাখলেন। পরে. ১৯৭১’এ বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞাণ ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের নেতৃত্বে কুমিল্লার বেতিয়ারায় পাকিস্তানি সেণাবাহিনীর. সাথে সন্মুখ সমরে আজাদ ভাই শহীদ হন।
মুনীর ভাই ২৫শে’ মার্চের. কাল রাত্রির পর বর্ডার. পেরিয়ে ভারতের আগর তলায় যেয়ে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির. সহায়তায় সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধের.জন্য দল গঠন গ্রহণ করেন।
এ’দিকে ২৫শে’ মার্চের. কাল রাত্রির পর পাকিস্তানি সামরিক জুনটা পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালী জন-সাধারনের উপর চালাচ্ছে তাদের. অবর্ননীয় অত্যাচার। টোকাই কার্টুনের শিল্পী, র.নবীর মানে রফিকুন নবী ভাইয়ের বাবা ১৯৭১’এ জানান যে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ব্যাক্তিদের. হত্যার জন্য লিষ্ট করা হয়েছে অনেকের মাঝে, আব্বা অর্থাৎ কথাশিল্পী শওকত ওসমানের নাম রয়েছে।
চট্ যলদি সব গুছিয়ে মেজ ভাই আশফাক ওসমানের সহর্কমী ইদ্রিস মিয়ার সাথে আমি আর আব্বা, মঈনপুর হয়ে সকাল সকাল ভারতের আগরতলা পৌঁছালাম। আগরতলায় পৌঁছে দেখি খোলা ছাদের. উপর ঢালাও বিছানায় সেলিম ভাই মুনীর ভাই সব লুঙ্গি গেঞ্জি পরে. বসে। মুনীর ভাই ঢাকা কলেজে আব্বার সরাসরি ছাত্র।
আব্বাকে সালাম করতে এলে আব্বা মুনীর ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সে এক আভাবনীয় দৃশ্য।
মুনীর ভাই আমাকে দেখে খুব খুশী হলেন। দু’জনের চোখে জল। স্বর্গীয় অনুভুতি।
পরে. আমি আব্বার সাথে মুজিব নগরে. চলে আসি। মুনীর ভাই আগরতলায় থেকে গেলেন। এ সময় হাসপাতলে থাকা পাকিস্তানি বর্বদের. পৈশাচিক অত্যাচারে যুদ্ধাহত বাঙালী ইপ্আির সৈণ্যদের. দেখতে ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি আগরতলায় এসেছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীনের পর মুনীর ভাই তখন সংবাদের. ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আর আমি তখন তারা-টিভির বাংলাদেশ প্রধান। একবার বাংলাদেশের এক বিষম বড় বিজনেস গ্রুপ আমার সহকর্মীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিলেন তাঁদের. এক খবর তারা টিভিতে প্রচারের জন্য। যথারিতী খবর প্রচার হলো। পরদিন আমার সহকর্মী পঞ্চাশ হাজার টাকা এনে আমায় দিলো। আমিতো অবাক, কেন, টাকা কেন? স্যারেরা খুশী হয়ে মিষ্টি খেতে দিয়েছেন। সেই দিনই সহকর্মীকে নিয়ে বিষম বড় বিজনেস গ্রুপকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ফেরৎ দিতে যেয়ে প্রচুর গালাগালি শুনলাম। ঘুষের টাকা ফেরৎ দেয়াতে বিষম বড় বিজনেস গ্রুপের নাকি অপমান হয়েছে।
আমি এই গালাগালি হযম না করে. প্রায় সব বড় বড় নামি দামী খবরের কাগজে অনুরোধ করলাম এই বিষয়টা ছাপানোর জন্য। কিন্তু কোনো নামি দামী কাগজ রাজী হলো না, কারণ, “এঁরা আমাদের. কাগজে এত্ত বড় বড় বিজ্ঞাপণ দেয়। মাঝে মাঝে মলাট উল্টালে মূল কাগজ। হতে পারেন আপনি কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ছেলে, হতে পারেন আপনি তারা টিভির বাংলাদেশ প্রধান তাই বলে আমরা নিজের পায়ে কুঠার মরাব নাকি!!!”
শেষ ভরসা, সৎ নীতিবান শিক্ষিত মুনীর ভাই’এর কাছে গেলাম।
উনি সব শুনে বিজ্ঞাপণের তোয়াক্কা না করে. নিজে “খায়রুল বশর” ছদ্মনামে সোমবার, ৯ই, জুলাই, ২০০৭ সালে সংবাদে খবরটা ছাপলেন।
এই হচ্ছে সৎ সুন্দর. মুনীর ভাই। যিনি জীবনে কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াননি, আর সবার মতো টাকার কাছে মাথা ঝুঁকাননি।
একবার তারা বাংলায় এক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে. বামরাজনীতি থেকে সরে. আসার ব্যাপারে. বড় বেদনার সাথে মুনীর ভাই বলেছিলেন; টাকার কাছে হেরে যাওয়া দলে, জিয়াউর রহমানের খালকাটার দলে, নীতির কাছে পরাজিতের দলে“ খন্দকার মুনীরুজ্জামানের” মত মানুষ আপোষ করতে পারে. না।
শ্রদ্ধেয় মুনীর ভাই আপনি যত দূরেই পাড়ি জমাননা কেন, আপনার জীবন বাজী রাখা মুক্তিযূদ্ধের.দেশ এক দিন না এক দিন আপনার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদিয়ে সৎ সুন্দর. সমাজ গড়বেই গড়বে।
এই কামন্য়া শ্রদ্ধেয় মুনীর ভাই, গ্রহণ করুন আমার শত সহস্র লাল সালাম।






Related News