Main Menu

চুরি ও ছিনতাই করা ল্যাপটপ-মোবাইল বিক্রির মাধ্যম কুরিয়ার নেটওয়ার্ক!

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি ও ছিনতাই করা ল্যাপটপ-মোবাইল বিক্রির জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠায় একটি চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ডিভাইস ট্র‌্যাক করতেও ব্যর্থ হয়। কারণ ডিভাইসগুলো বন্ধ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রির জন্য পাঠায় চক্রটি। এমনকি সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটে বদলে ফেলে আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বর। এছাড়া হাতেহাতে ভারতেও বিক্রির জন্য মোবাইল পাঠায় তারা।

লিশ জানিয়েছে, ঢাকায় ছিনতাই করা ডিভাইস বিক্রি করা ও বহন করা তাদের জন্য ঝুঁকি। কারণ এখানে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চোরাই ডিভাইস উদ্ধারের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত করে। তাই ছিনতাইকারীরা ডিভাইসটি বন্ধ করে কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেয় ঢাকার বাইরে। সেখানে কমদামে বিক্রি করে।

চুরি হওয়া ডিভাইস বিক্রি হয় তিনবার

ঢাকায় ছিনতাইকারীরা কোনও ডিভাইস এখন আর সরাসরি অপরিচিত কারও কাছে বিক্রি করে না। এসব ডিভাইস বিক্রি করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট ক্রেতা রয়েছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, উত্তরা ও মিরপুরে চক্রের ভ্রাম্যমাণ সদস্য রয়েছে। ছিনতাইকারীরা কোনও ডিভাইস চুরি বা ছিনতাই করতে পারলেই এসব ভ্রাম্যমাণ ক্রেতাদের জানিয়ে দেয়। তারা অল্প টাকায় ডিভাইসগুলো কিনে নেয়। ভ্রাম্যমাণ ক্রেতারা আবার চুরির মাল ক্রয়ের এজেন্টদের কাছে বিক্রি করে। যে চক্রের সঙ্গে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর বিভিন্ন দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এই চক্রটি মোবাইল ও ল্যাপটপ কিনে কুরিয়ার করে ওইসব দোকানে পাঠায়। গ্রেফতার এড়াতে দোকানেই ডিভাইসের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তন করা হয়।

কার ডিভাইস কুরিয়ারে যায় কই!
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) থেকে ল্যাপটপ চুরি হয়। এই ঘটনায় বিটাক থেকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা করা হয়। সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে চোরকে শনাক্ত করে পুলিশ। এরপর কামরুল ইসলাম হাওলাদার (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে মুগদা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কামরুল পেশাদার চোর। সে এনজিওকর্মী পরিচয় দিয়ে স্যুট, কোর্ট ও টাই পরে বিভিন্ন সরকারি অফিসে প্রবেশ করে। এরপর সুযোগ বুঝে ল্যাপটপ ও মোবাইল চুরি করে পালিয়ে যায়। কামরুল গ্রেফতারের পর বিটাক থেকে চুরি করা ল্যাপটপ বিক্রির কথা স্বীকার করে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে কামরুল জানায়, ল্যাপটপ চুরির পর সুমন হাসান শাওন (৩২) নামে অপর এক ব্যক্তির কাছে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে সে। এরপর পুলিশ সুমন হাসান শাওনকেও গ্রেফতার করে। শাওন জানায় ল্যাপটপটি সে মোখলেছুর রহমান নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছে। পুলিশ মোখলেছকেও গ্রেফতার করে। এরপর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মোখলেছুর রহমান পেশায় একজন ব্যাংকার, কিন্তু সে এই চোরাই ও ছিনতাই হওয়া ডিভাইস ক্রয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন এলাকার চোর ও ছিনতাইকারী তার কাছে এসব ডিভাইস বিক্রি করে। সে ডিভাইস ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠায়।

তেজাগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন  বলেন, ‘ল্যাপটপ খুঁজতে গিয়ে ছিনতাইকারী ও ছিনতাই করা পণ্য বিক্রির বিশাল এক সিন্ডিকেট গ্রেফতার করেছি। এই সিন্ডিকেটের প্রধান মোখলেছ। সে চোরাই ল্যাপটপ ও মোবাইল ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির জন্য পাঠাতো।’

মোখলেছ ছিনতাই করা পণ্য ক্রয় করে ব্যবসা করার কথা স্বীকার করেছে। সে দেশের বিভিন্ন জেলায় মোবাইল ও ল্যাপটপ পাঠাতো, তার প্রমাণও পেয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ারের মাধ্যমে চোরাই ল্যাপটপ, মোবাইল ও প্রজেক্টর পাঠানোর এসএ পরিবহনের রশিদ উদ্ধার হয়। সে ঝিনাইদহ, যশোর, রাজশাহী ও পাবনায় এসব ডিভাইস পাঠাতো। তার কাছ থেকে পাবনার ল্যাপটপ গ্যালারি নামক দোকানের তথ্য নিয়ে পুলিশ পাবনায় অভিযানে যায়। পাবনার আব্দুল হামিদ সড়কের হক মার্কেটের নিচ তলার ৫৪ নম্বরের ল্যাপটপ গ্যালারি দোকান থেকে মোখলেছের পাঠানো আটটি ল্যাপটপ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে দোকানের মালিক সুমন হোসেনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। সে পলাতক রয়েছে।

এদিকে মোখলেছের ঢাকার বাসা থেকে চোরাই ও ছিনতাই করা ছয়টি ল্যাপটপ, একটি প্রজেক্টর, একটি ক্যানন ডিজিটাল প্রিন্টার, সাতটি মোবাইল ফোন, তিনটি আইপ্যাড, হার্ডডিস্ক ২০টি, ল্যাপটপ ব্যাটারি চারটি, ল্যাপটপ টুলবক্স একটি এবং অসংখ্য কুরিয়ারের রশিদ উদ্ধার করা হয়।

মোখলেছুর পুলিশকে জানায়, সে বিভিন্ন সময়ে কুরিয়ারেরর মাধ্যমে পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দুই শতাধিক চোরাই ও ছিনতাই হওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন বিক্রির জন্য পাঠিয়েছে। এসব ডিভাইস বিক্রির পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেন করে তারা।

 

সীমানা পেরিয়ে ওপারে ছিনতাই হওয়া মোবাইল

মোখলেছুর রহমানের কাছে নিয়মিত চোরাই ও ছিনতাই করা মোবাইলসহ ইলেকক্ট্রিক বিভিন্ন ডিভাইস বিক্রি করতো শাওন, রাজীব ও শরীফ। পুরো চক্রটিকেই পুলিশ গ্রেফতার করেছে। রাজীব ও শাওনের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ডেমরার শরীফ হোসেন মোল্লার কাছ থেকে দুইটি আইফোনসহ বিভিন্ন ব্র‌্যান্ডের ২০ অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ২০টি ফোন উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় আরেকটি মামলা করে পুলিশ।

শাওন পুলিশকে জানিয়েছে, অ্যান্ড্রয়েড দামি ফোন দেশে বিক্রি করা এখন চ্যালেঞ্জিং, তাই দেশের বাইরে পাঠানো হয়। ভারতে দামি আইফোন পাঠানো হয়। সেখানে বিক্রি করে বা ফোন পরিবর্তন করে দেশে এনে বিক্রি করা হয়।

বদলে যায় আইএমইআই!
বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে কখনও কখনও কয়েক মিনিটেই চোরাই ফোনের আইএমইআই নম্বরও পরিবর্তন করে এই সিন্ডিকেট। যাতে সহজে তাদের গ্রেফতার করতে না পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

৯ মাসে ঢাকার ছিনতাইয়ের চিত্র

ঢাকায় এই বছরের প্রথম ৯ মাসে ১৩৪টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ডিএমপির সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারিতে ১৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, মার্চে ১৩টি, এপ্রিলে পাঁচটি, মে মাসে আটটি, জুনে ১৩টি, জুলাইয়ে ২২টি, আগস্টে ১৩টি এবং সেপ্টেম্বরে ২৬টি ছিনতাই বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ৯ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিমাসেই ছিনতাই ঘটনা ঊর্ধ্বমুখী।

যা বলছে পুলিশ
ডিএমপির তিজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ জানান, প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। ছিনতাইকারীদের গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাই হওয়া ডিভাইসও উদ্ধার হয়। একটি ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে চোরাই ও ছিনতাই মাল বিক্রির একটি বিশাল সিন্ডিকেটকে গ্রেফতার করেছি। এই সিন্ডিকেট ঢাকার চোরাই ল্যাপটপ অন্য জেলায় কুরিয়ারে পাঠিয়ে বিক্রি করতো। তাদের গ্রেফতার করেছি। একটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আরও একটি মামলা তদন্ত চলছে।






Related News