Main Menu

মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার, ৬ শ দরিদ্র গৃহহীণ বুঝে পেলেন আধুনিক ফ্ল্যাটের চাবি

তিন দশকের উদ্বাস্তু জীবনের অবসান হচ্ছে ৬ শ পরিবারের। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ঠাঁই হচ্ছে তাদের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন যারা, তারাই আজ বুঝে পেলেন একটি করে আধুনিক ফ্ল্যাট। কেউ গৃহহীণ থাকবে না, সরকারের এই প্রতিশ্রুত অঙ্গীকারে মুজিববর্ষে এই উপহার বুঝে পেলেন কক্সবাজারে অসহায় দরিদ্র গৃহহীণ মানুষেরা। ‘খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে’র আওতায় নামমাত্র মূল্য ১ হাজার এক টাকায় তারা সেই ফ্ল্যাটের মালিকানা বুঝে পেলেন।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ৬ শ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ খ্যাত বিশেষ এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন প্রান্তে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস। তিনি একটি সংক্ষিপ্ত পটভূমি তুলে ধরেন এরপর একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সেনাপ্রধান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। কক্সবাজার প্রান্তে প্রকল্প এলাকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন স্থানীয় প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিরা। উদ্বোধন শেষে কয়েকজন উপকারভোগীর হাতে ফ্লাটের চাবি হস্তান্তর করা হয়। এরপর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় তিনজন উপকারভোগী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তিনটি বৃক্ষ রোপন করেন।

এরপর গণভবন প্রান্তথেকে দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

কক্সবাজার শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশ্বের প্রথম এই ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’। পুরো এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করে ১৩৯টি পাঁচ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে নির্মিত ১৯টি ভবনে আজ স্থান পাচ্ছে ছয়শ পরিবার। গোটা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারের পুনর্বাসন হবে এখানে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়ায় আশ্রয় নেয়। উদ্বাস্তু পরিবারগুলো নতুন করে বিপদ দেখতে পান যখন কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। এই এলাকাটিতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজ চলার কথা। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জলবায়ু উদ্বাস্তু প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের জন্য খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পটির পুরোটাই ব্যয় হচ্ছে সরকারের তহবিল থেকে।

প্রথম ধাপে কাজ শেষ হওয়া ১৯টি ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সাংবাদিকদের প্রকল্প এলাকা ঘুরিয়ে দেখান প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য এমন প্রকল্প এই প্রথম। জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য এখানে যে পুনর্বাসন, এ ধরনের প্রকল্প পৃথিবীতে বিরল।

গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের চেয়ারম্যান জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুনের ২০১৯ সালে এই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে যাওয়ার কথাও বলেন মাহবুব। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আবাসনের জন্য এই বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষে শুরু হয় ভবন নির্মাণ। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের সঙ্গে নদীর ধারে ঝাউবন করার নির্দেশও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কর্মকৌশল প্রণয়ন করে বাংলাদেশ। এরপর গঠন করা হয় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই এ তহবিল পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার বিমানবনন্দর সম্প্রসারণের সময় ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারের তালিকা করা হয়। তারাই এ প্রকল্পে বসবাসের সুযোগ পাবে। এই প্রকল্প দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রসাশকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের সুবিধা থাকবে। প্রকল্প এলাকায় থাকবে ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি। প্রতিটি ভবনের ওপর সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, এটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটি জায়গা। এই জায়গাটিকে সুরক্ষিত করার জন্য মাটিকে অনেক উঁচু করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিচের তলায় কোনো ফ্ল্যাট রাখা হয়নি। ফলে ঘূর্ণিঝড় হলে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢোকারও আশঙ্কা নেই।

তিনি জানান, সুপেয় পানির জন্য ১০টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। দু’টি পুকুরও খনন করা হয়েছে। স্কুল তৈরি করা হয়েছে। প্রচুর তালগাছ ও ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে।

২০২৩ সালে পুরো প্রকল্পের যখন শেষ হবে, তখন এখানে যে কেবল ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার আশ্রয় পাবে, তা নয়। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে আধুনিক পর্যটন জোন। ১৪টি খেলার মাঠ, সবুজ জায়গা, মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন, তিনটি পুকুর, নদীতে দু’টি জেটি, দু’টি বিদ্যুতের সাবস্টেশন থাকবে এখানে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৩৯টি পাঁচ তলা ভবনের পাশাপাশি তৈরি করা হবে ১০ তলা ভবন। সুউচ্চ এই ভবনটির নাম হবে শেখ হাসিনা টাওয়ার। মূল শহরের সঙ্গে প্রকল্প এলাকার সংযোগ স্থাপনের জন্য কস্তুরী ঘাট এলাকায় বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ৫৯৫ মিটার ব্রিজসহ সংযোগ সড়ক।

প্রকল্পটিতে চলাচলের সুবিধার্থে বহুমুখী যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে জেটিঘাট থেকে অফিস ও কৃষ্টের দোকান থেকে সালেহ আহমেদ কোম্পানি পর্যন্ত এইচবিবি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে আলহাজ জয়নাল আবেদীন সংযোগ সড়ক। এর মধ্যে কিছু কাজ এখনো শতভাগ শেষ হয়নি। ৪৪০৯টি পরিবারের নিরাপদ পানির সংস্থানে ৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের মাধ্যমে। প্রকল্পটির আওতায় পাম্প হাউজ ও পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হবে।

খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে স্থাপন করা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। বিনোদনের জন্য রয়েছে পার্ক। স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আবার পুনর্বাসন হবে যেসব পরিবারের, তাদের অধিকাংশই মৎস্যজীবী। ফলে তাদের জীবিকার জন্য আধুনিক শুঁটকি পল্লি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক নগরায়ন পরিকল্পনায় এই পল্লী স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প হবে কক্সবাজার জেলার আকর্ষণীয় একটি পর্যটন এলাকা।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব ইমরুল কায়েস রানা বলেন, খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার পুনর্বাসন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার প্রাথমিকভাবে ৬০০ পরিবারের কাছে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট হস্তান্তর করবেন। বাকি পরিবারগুলো ধাপে ধাপে ফ্ল্যাট বুঝে যাবে। জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার পুনর্বাসনের নজির বিশ্বে এই প্রথম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে এক অনন্য নজির স্থাপন করতে যাচ্ছেন।






Related News