Main Menu

ড. আব্দুল হক তালুকদারকে যেমন দেখেছি

যাঁকে যেমন দেখেছি -মুহম্মদ খলিলুর রহমান

সারল্যের অনাবিল তরঙ্গ যে হৃদয়কে আন্দোলিত করে সে হৃদয় যদি মেধাবিকাশে আগ্রহী হয়, জীবনের গতি হয় সেক্ষেত্রে বিচিত্র; চরিত্রটিতে অসাধারণত্ব দৃষ্টিগোচর হবার বহু ঘটনা ঘটে যাবার সম্ভাবনাই সেখানে প্রবল হয়ে দেখা দেয়। এক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার স্পর্শ জীবনক্ষেত্রে হিরন্ময় ফসলের সম্ভার সৃষ্টি করে জীবনকে বহুমাত্রিক ঐশ্বর্যলাভের সৌভাগ্যে নন্দিত করে। অত্যন্ত নিবিড় জীবনটাকে দিয়ে আমার দেখা এমনি একটি চরিত্র ড. আব্দুল হক তালুকদার। শিক্ষার সর্বক্ষেত্রে গভীর অন্তর্দৃষ্টি তাকে বহুবিষয়ের গবেষকের যোগ্যতা দান করেছে। সাহিত্যসৃষ্টির বাসনা তাকে অত্যন্ত অল্প বয়সেই সৃজনশীলতার সামর্থ্য দান করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেও গবেষকের অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই আত্মস্থ করার অভ্যেস অল্প বয়সেই গড়ে উঠে। চাঁদপুর কলেজে অধ্যাপনা শুরুর প্রারম্ভেই ও আমার প্রিয় ছাত্র হিসেবে মমতা-ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। ডাক নাম কাজল। অত্যন্ত সরলপ্রকৃতির কাজল যে অসাধারণ মানুষ ওকে যারাই দেখেছে তাদের কারো কাছেই এ সত্য দুর্বোধ্য হয়নি। ও সবার মত নয়-দেখলেই এ বোধ সবার মাঝেই উপলব্ধ হবার স্বভাব ও প্রকৃতি ও আজীবন ধারণ করে আছে। এ থেকেই বোঝা যায়, আজীবন সারল্যের সাথেই ওর গভীর সম্পর্ক। হৃদয়-মন সোজা পথের অন্বেষণ ব্যতিরেকে অন্য কিছু বোঝে না, আত্মদর্শন ভিন্ন কিছু খোঁজে না। এমন কাজল আমার ঘনিষ্ঠ স্বজন, আত্মার আত্মীয়, আমার আরাধ্যের সহযাত্রী, অত্যন্ত সুপ্রিয় স্নেহভাজন ছাত্র।

পার্থিব জ্ঞানের উদগ্র পিপাসা দৃষ্টিগ্রাহ্য হলেও বিদ্যাসাগর শব্দের ভাবপরিম-লে যে ব্যাপকতা রয়েছে বর্তমানে তা দুর্লক্ষ্য ব্যাপার। জ্ঞান সাধনার পেছনে মনস্তাত্তি্বক দৃঢ়তা, মানবতাবোধে উজ্জীবিত হয়ে মানবসেবায় নিবেদিত হবার উদগ্রবাসনা, জ্ঞানের সার্বিক দিকের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ এ যুগে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এজন্যে নিরহঙ্কার মন নিয়ে নিরলস জ্ঞানের সাধনা আজীবন হৃদয়ে লালন করা আবশ্যক। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তির চারদিকে এখন লিপ্সা-লালসা, প্রলোভনের মত জঘন্য প্রবৃত্তি মোহনীয় জাল বিস্তার করে প্রতিভাকে কলঙ্কলেপনের হীনতায় পীড়িত করার উন্মত্তলীলায় এমনভাবে মেতে উঠে যা মহাজ্ঞানের সাধককে শেষ মুহূর্তে জ্ঞানপাপীতে পরিণত করে ছাড়ে। প্রচ- প্রতিকূলতার মাঝে হৃদয়ের শুচিতা রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত রেখে কৌলুষমুক্ত জীবনপথের মহাসাধকবৃন্দ এ যুগেও বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করে যাচ্ছেন। বিদ্যাসাগর উপাধি তাঁদের জন্য মুখ্যপ্রাপ্তি নয়, কৌলুষমুক্ত জীবনপথের জ্যোতির্ময়তা তাঁদের পরম প্রাপ্তি। ড. আব্দুল হক তালুকদারকে আমি এমনি এক জ্ঞান সাধকের গ-িতে স্থান লাভের মহিমায় ভাস্বর চরিত্র হিসেবে লক্ষ্য করেছি।

কাজল আমার সাহিত্যভক্ত, সাহিত্যানুরাগী, দেশপ্রেমী ছাত্র। কাজল আমার সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের আগ্রহ অব্যাহত রেখে আমাকে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত, উদ্দীপিত ও আশ্বস্ত করেছে। এটা স্রষ্টার পক্ষ হতে বিস্ময়কর নিয়ামত। কাজল আমার শিক্ষক প্রকরণের ধারক-বাহক। কাজল সৌভাগ্যক্রমে কারিগরি শিক্ষার মত গুরুত্বপ্রাপ্ত জাতীয় বিষয়ে এদেশে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এদেশকে উন্নয়নের শীর্ষে পেঁৗছে দেবার সামর্থ্য কারিগরি শিক্ষার মাঝে বিদ্যমান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর জাপানের সংকট নিরসনে এই কারিগরি শিক্ষাই মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। আমাদের দেশ অপ্রমেয় প্রাকৃতিক সম্পদে ঋদ্ধ। এর মাঝে কারিগরি শিক্ষা সংযুক্ত হলে অভাবনীয় উন্নয়ন সম্ভব। ড. আব্দুল হক তালুকদার কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপে দীর্ঘকাল দায়িত্বপালন করে। এ সময়ে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। যার সুফল বর্তমানে বাংলাদেশ লাভ করে সমৃদ্ধির দিকে ধাবিত হবার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কাজলের এ ভূমিকা জাপানের ড. হুন্ডুর কৃতিত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। ড. হুন্ডুই জাপানে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে রাতারাতি জাপানকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে পেঁৗছে দেবার ভূমিকা পালন করেন। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের সচিব ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব শেষ করে কাজল অতিরিক্ত সচিব পদে যোগদান করে। কাজল অতিরিক্ত সচিব হিসেবেই অবসরপ্রাপ্ত হয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়।

ড. আব্দুল হক তালুকদার বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হলেও জীবনের সোনালী অধ্যায় কাটিয়েছে অধ্যাপনায়। সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে প্রভাষক পদে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু। এরপর সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি কলেজে তার কর্মজীবন কেটেছে। ২০০৬ সালে কাজল ইডেন মহিলা কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করে। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে সরকারের উপ-সচিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কাজল প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার পর কাজলের জীবনে ভিন্নতর অধ্যায়ের সূচনা হয়। কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কাজল কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে প্রভূত ভূমিকা রাখে। কারিগরি শিক্ষার শিক্ষাক্রম, পাঠক্রম, প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও উন্নয়ন, পরীক্ষাপদ্ধতির সংস্কার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, সংস্কার, আয়বৃদ্ধি, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে কাজল আমূল পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। কারিগরি শিক্ষার মত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশীয় প্রতিনিধিত্বের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে কাজল মূল্যবান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয় এবং পৃথিবীর বহু দেশে ভ্রমণের সৌভাগ্য অর্জন করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রেও কাজল যথেষ্ট সুখ্যাতি লাভ করে। ডেভেলপমেন্ট এডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ক প্রশিক্ষণে কাজল প্রথম স্থান অধিকারের যশ ও কৃতিত্ব অর্জন করে। তার যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মকাল কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান পদ লাভের মাধ্যমে শুরু হয়। ২০১৫ সালে কাজল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি হবার পর পরবর্তী সনেই অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করে। ২০১৬ সালে শুরু হয় তার অবসরকালীন জীবন। অবসর নিয়ে কাজল আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেয়ে কর্মময় জীবনে ফিরে আসে। মানসিক শক্তিতে ঋদ্ধ কাজল ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে কৈশোরেই গ্রামের মাঠে কাজের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। এরই সাথে ছিল শিক্ষাজীবনের কঠোর সাধনা। পরিশ্রম ও মানসগঠনের একান্ত সাধনা তার জীবনকে ভরে দিয়েছে সাফল্যের সোনালী ফসলের সম্ভারে। কর্মের মাঝে আত্মনিমগ্ন হয়ে সুখ-শান্তির অমিয়ধারায় অবগাহনের পরমানন্দে তুষ্ট কাজল কাজের মাঝেই তৃপ্তি লাভের প্রত্যাশী।

ড. আব্দুল হক তালুকদার বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত। ‘অন্বেষণ’ নামের ট্যুরিস্ট সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, অগ্রণী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, চকসা নামক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। কাজল বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে আসছে। কাজল লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের গর্বিত সদস্য, ‘আইনাগ’ নামক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক, বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশনের জীবন সদস্য। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী সমিতি, চাঁদপুর জেলা সমিতি, ঢাকা অফিসার্স ক্লাবসহ বহু প্রতিষ্ঠানের জীবন সদস্য। কাজল তিন মেয়াদে বাংলাদেশ সমাজকর্ম শিক্ষক সমিতির মহাসচিব পদে নির্বাচিত হয়ে বহু কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স প্রবর্তন করার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে। কাজল হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, ঢাকাস্থ ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজ, বলাখাল জেএন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য। এছাড়াও কাজল কৈয়ারপুল জামে মসজিদের সভাপতি ও কল্যাণপুর বায়তুল আমিন জামে মসজিদের জীবন সদস্যের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

ড. আব্দুল হক তালুকদার কাজলের জন্ম ১৯৫৫ সালে। কাজল হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন সাতবাড়িয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত তালুকদার পরিবারের সুযোগ্য সন্তান। কাজল আশৈশব মেধাবী ছাত্র হিসেবে শিক্ষকবৃন্দের স্নেহভাজন ছিল। ক্লাসে তার প্রশ্নোত্তরের বাচনভঙ্গি, আচরণে শিষ্টাচারের বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ আমাকে মুগ্ধ ও তার প্রতি আকৃষ্ট করে। তার উদ্যোগে কলেজে ‘চকসা’ শীর্ষক দেয়ালপত্রিকা প্রকাশিত হবার পর তার সাহিত্য-প্রতিভার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কাজল বৃত্তিলাভের কৃতিত্ব অর্জন করে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হবার একান্ত বাসনা লালন করলেও পারিবারিকভাবে তাকে তার চাচা সমাজবিজ্ঞান পড়ায় উদ্বুদ্ধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে সে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। অনার্স পরীক্ষায় কাজল প্রথম হবার কৃতিত্ব প্রদর্শন করে। সংগীতের অনুরাগ কাজলের প্রবল ছিল। সংগীত ও সাহিত্য চর্চার মাঝে তার শিল্পীমনের পরিচয় বিধৃত হয়। গ্রন্থরচনায় আত্মনিয়োগ করে কাজল যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করে। তার রচিত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কাজলের প্রিয় কলেজ শিক্ষক, আমর অগ্রজপ্রতিম সহকর্মী অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ এবং কাজলের যৌথ প্রচেষ্টায় কে আলী প্রকাশনীর উদ্যোগে প্রকাশিত সমাজকল্যাণ বিষয়ক একাধিক গ্রন্থের ব্যাপক চাহিদা থেকে গ্রন্থরচনায় তাদের কৃতিত্ব প্রকাশ পায়।

ড. আব্দুল হক তালুকদারের সহধর্মিণী শিক্ষকতাকেই বেছে নেয়। বর্তমানে তার অবসর জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। কাজল এক ছেলে ও এক মেয়ের স্নেহপ্রবণ পিতা হিসেবে পরিবারিক জীবনে তুষ্ট। পরিবারের সবার কাছেই অত্যন্ত প্রিয় কাজল আমার পরম মমতা ও ভালোবাসার পাত্র। এমন সজ্জন, পরিশীলিত রুচিসম্পন্ন বিদগ্ধ কাজলের চিরকল্যাণ কামনায় হৃদয় আমার আপ্লুত, মমতামেদুরতায় পরিপূর্ণভাবে আচ্ছন্ন।






Related News