অভাবের বুকে জেগে ওঠা প্রজন্ম: এক বিপ্লবীর গল্প
তুহিন আহমেদ। কুমিল্লার বরুড়া গ্রামের এক টগবগে তরুণ, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সমাজের অবহেলিত মানুষদের জন্য। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ছিল অভাব আর সংগ্রামের সঙ্গে যুদ্ধ করার এক অনন্য উদাহরণ। মেধাবী ও সৃষ্টিশীল এই তরুণ বড় হয়েছিলেন পিতামাতার আদর এবং গ্রামীণ জীবনের সংকীর্ণতা দুটোর মধ্যেই। অভাব তার জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী হলেও, এটি তার অদম্য মানসিকতাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
অভাবের শিক্ষালয় ও প্রজন্মের আত্মদর্শন
প্রজন্ম অভাব কি শুধু শত্রু মনে করেনি। অভাবের সঙ্গে সন্ধি না করলেও প্রতিযোগিতা ঘোষণা করেছে তিনি। অভাবের সঙ্গে তাকে কখনো যুদ্ধ কখনো প্রতিযোগিতা চালিয়ে দিতে হবে।
অভাব প্রজন্মকে শিখিয়েছে কিভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, আর স্বপ্ন প্রজন্মকে শিখিয়েছে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয়।
তার শৈশবের প্রতিটি দিন ছিল কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার একটি পাঠ। ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে স্কুলে যাওয়া, পুরনো বই দিয়ে পড়াশোনা করা, আর দুঃখে ভরা পিতামাতার মুখ দেখে বড় হওয়া তাকে একজন অন্যরকম মানুষ করে তুলেছিল।
লেখনীতে বিপ্লবের বীজ
ঢাকায় এসে তুহিনের জীবন নতুন মোড় নেয়। শাহবাগের ফুটপাত আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাগুলো তার নতুন ঠিকানা হয়ে ওঠে। ক্ষুধা আর নিঃসঙ্গতার মাঝেও তার লেখনী ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ প্রজন্ম জেনে গিয়েছিলেন যে অভাবের কাছেও কলম দিয়ে যে যুদ্ধ করা যায়।
তার লেখাগুলো ধীরে ধীরে অন্যায়, বৈষম্য আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
‘প্রজন্ম’ নামের জন্ম
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচিত “পাগল” তুহিনের মাঝে দেখেছিলেন এক অনন্য সম্ভাবনা। সেই পাগলই তাকে “প্রজন্ম” নাম দেন। এই নামের পেছনে ছিল একটি প্রতীকী ধারণা—তুহিন যেন নতুন প্রজন্মের চেতনা, নতুন আলোর প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন,
“প্রত্যেকটি প্রজন্মই একটি বিপ্লব।”
বিপ্লবের পথে সংগ্রামী যাত্রা
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবে তুহিন ছিলেন সামনের সারির এক বিপ্লবী। তার হাতে প্ল্যাকার্ড আর কাঁধে একটি ব্যাগ নিয়ে তিনি রাজপথে নেমেছিলেন বৈষম্যমুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ার জন্য।
তুহিন বিশ্বাস করতেন:
“স্বাধীনতা মানে শুধু মুক্ত বাতাস নয়, এটি মানুষের অধিকার এবং মর্যাদার নিশ্চয়তা।”
তার নেতৃত্বে একদল তরুণ সমাজের পরিবর্তনের জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম চালিয়েছিল।
অভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দর্শন
তুহিন একবার লিখেছিলেন,
“অভাব আমাদের শত্রু নয়, এটি আমাদের সেরা শিক্ষক। এটি আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে লড়াই করতে হয়, কিভাবে নিজেকে গড়তে হয়।”
তার এই দর্শন তাকে শুধু একজন বিপ্লবী নয়, একজন দার্শনিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছিল।
একটি কবিতায় প্রজন্মের আত্মদর্শন
তুহিনের কবিতায় তার সংগ্রাম এবং দর্শনের গভীর প্রতিফলন পাওয়া যায়:
” বাড়ি গেলেই অভাবের সাথে দেখা হয়,
চিনি তাকে ছোটবেলা থেকে, একসাথে বড় হয়।
ঘরের আনাচে-কানাচে সে খেলে যায়,
আমার শৈশব তার দাগেই রঙ পায়।
নিজ হাতে সে শিখিয়েছে আমায়,
দেখিয়েছে, বুঝিয়েছে কত স্রোত, কত মায়া।
তবু তার যন্ত্রণা সহ্য না করে,
বাড়ি ছেড়ে যাই, দুঃখ ভরে।
…
অভাব হেসে বলে, “তুই নিজেকে মুছলেই তবেই হারবি।”
তাই ভাবি, অভাব কি সত্যি শত্রু আমার?
নাকি সে আমার ভেতরের অদম্য কারিগর!”

তুহিন আহমেদ, যিনি প্রজন্ম নামে পরিচিত, আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে সীমাহীন প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য সংগ্রাম করা যায়। তার লেখা, তার সংগ্রাম, এবং তার জীবন আমাদের প্রমাণ করে যে অভাব আর সংগ্রামের মধ্যেও একজন মানুষ ইতিহাস তৈরি করতে পারে।
প্রজন্মের সঙ্গে যখন আমার কথোপকথন চলে তখন মনে হয় রুহের সঙ্গে রুহের বৈঠক হচ্ছে। যে বৈঠকে সে বলছে,”যে অভাব আমাকে নির্মাণ করেছে, সেই অভাবের প্রতিরোধেই আমি আমার অস্তিত্ব খুঁজে পাই,”—তুহিন আহমেদের এই কথাগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে সংগ্রামের চেতনা কখনো ম্লান হয় না। তুহিনের এই বিপ্লবী চেতনাকে শাণিত করেছে একজন বিপ্লবী, উত্তর প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর কথা আজকে নাইবা বললাম। তিনি যে লোক চক্ষুর আড়াল থেকেই মানবতার সেবা করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।