পূজা মণ্ডপে হামলা: হিন্দুদের মধ্যে কতটা আস্থার সংকট তৈরি করেছে?

বিবিসি বাংলা /প্রেসওয়াচ ডেস্কঃ ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন মালবিকা মজুমদার। তার নিজের বাড়ি ফেনী আর শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালী জেলায়।যেসব এলাকায় তিনদিন ধরে পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ফেনী সদর এবং নোয়াখালীর চৌমুহনী।

মালবিকা মজুমদার বলছেন, তার দুই পরিবারেরই আত্মীয়স্বজনেরা এখন আতঙ্কে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। তারা রাত জেগে নিজেদের বাড়িঘর এবং ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান পাহারা দিচ্ছেন।

তিনি বলছেন, এদেশে তিনি ও তার পরিবার কতটা নিরাপদ তা নিয়ে মনে সন্দেহ কাজ করছে।

“দেশে একটা স্থিতিশীল সরকার থাকা অবস্থায় এরকম পরিস্থিতি আমাদের কারো জন্যই কাম্য নয়। আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে, দেশ ছাড়ার কথা কথা ভাবতাম না কিন্তু এখন সেটা প্রথম চিন্তা হয়ে গেছে।”

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “এখানে আমরা কতখানি নিরাপদ? আমরা কি এখানে ভবিষ্যতে থাকতে পারবো? আমার পরবর্তী প্রজন্ম, আমার মেয়েটা এখানে কতটা নিরাপদ এটা এখন আমার মাথায় বারবার ঘুরছে।”

কোন দলে আস্থা নেই

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার গুজবে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়ি-ঘর ও মন্দিরে যেসব আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো সবই ছিল একটি গ্রাম অথবা নির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক।

কিন্তু এবার দুর্গাপূজার সময়ে যেভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে টানা তিনদিন ধরে ব্যাপক মাত্রায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এমনটা সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি।

দুর্গাপূজায় হামলার ছবি
ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন জেলায় পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে তিনদিন ধরে হামলা হয়েছে।

বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বিবিসিকে বলেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নবমীর দিন যে ভাষণ দিলেন, এই বক্তব্যের পর তাদের (হিন্দু সম্প্রদায়) মধ্যে যে আস্থাটা ফিরে এসেছিল, কিন্তু ১৫ তারিখ তার ভাষণের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে ঘটনা ঘটে গেল চৌমুহনীতে, এখন তার উপরও তারা আস্থা রাখতে পারছে না। আস্থার সংকট কাটানোর মতো কোন পদক্ষেপ, দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ আমরা দেখছি না।”

তার ভাষায়, “যে নেতারা ওসব জায়গায় (ঘটনার পর) গেছেন, তারা আন্তরিকতা থেকে গেছেন সেটার তারা (আক্রান্ত ব্যক্তিরা) মনে করতে পারছে না। তাদের কাছে মনে হচ্ছে এর সবটাই হচ্ছে লোক দেখানো।”

আওয়ামী লীগের তরফ থেকে যেসব চেষ্টা

এবারের হামলার সূত্রপাত ১৩ই অক্টোবর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরে। সেখানে একটি পূজামণ্ডপ থেকে কোরআন পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে।

পরের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপরাধীদের কঠোর শাস্তি এবং সেই সাথে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গিকার করেন।

কিন্তু তারপরও শুক্রবার প্রতিমা বিসর্জনের দিনও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, পূজা মণ্ডপ এবং মন্দিরে হামলা হয়। গতকাল শনিবারও ফেনীতে সংঘর্ষ হয়েছে।

 

ঢাকায় সহিংসতার দৃশ্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শুক্রবার ঢাকায় সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে।

এসব ঘটনায় গত তিনদিনে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিনদিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলের অন্যান্য নেতা এবং সরকারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।

সরকারের আরও সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল এমন বক্তব্যও এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় সফরে গেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ তাদের মধ্যে একজন। তার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আস্থার সংকট এবার তৈরি হয়েছে তা কাটাতে কি করা হচ্ছে?

তিনি বলছেন, “যখনই ঘটনা ঘটেছে, পরদিনই সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই ছুটে গিয়েছি দুর্গত মানুষজনের সাথে দেখা করেছি, তাদের সান্ত্বনা দিয়েছি সবজায়গা না যেতে পারলেও প্রতীকীভাবে তাদের আমরা আশ্বস্ত করতে চেয়েছি যে রাষ্ট্র তাদের সাথে আছে।”

“দুর্গাপূজার সময় আমরা সারা বাংলাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছিলাম এবং আমরা চেষ্টা করেছিলাম যেন সবাই নিজ নিজ ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। কিছু যায়গায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি।”

ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে হামলার সময় অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ক্রিয় ছিল এবং কোথাও কোথাও তারা পালিয়ে গেছে।

সংগঠনটি হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন।

এরকম কোন ব্যর্থতা ছিল কিনা সেটি তদন্ত করে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রশাসনে নতুন জনবল দেয়ার কথা জানিয়েছেন হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ।  বিবিসি বাংলা