Main Menu

র‌্যাপিড টেস্টিং: কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সেরা বিকল্প উপায়

এটা খুব আনন্দের খবর যে কোভিড-১৯ শনাক্তের জন্য সরকার অবশেষে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্টকে অনুমোদন দেওয়ার কথা ভাবছে। এ মাসেই অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ করোনা মহামারির ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করেছে। আমাদের এখনও দৈনিক করোনা পরীক্ষার সক্ষমতা ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ পরীক্ষার পজিটিভিটি রেট ২১ শতাংশ। এমন অবস্থায় বিকল্প ও তুলনামূলকভাবে সস্তা বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের এখনই সময়। অন্যান্য দেশে এরইমধ্যে এর ব্যবহার হচ্ছে।

আরটি-পিসিআর টেস্টের মান নিয়ে সমস্যা কী?

প্রথমত, গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড-এর আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফলস নেগেটিভ আসার হার ২০ শতাংশ। তার মানে, প্রতি ১০০ জনে ২০ জনের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে পরীক্ষায় নেগেটিভ এলেও সত্যিকার অর্থে তাদের শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব আছে। আবার উল্টোভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আরটি-পিসিআর-এর চরম স্পর্শকাতর দিক হলো, কাউকে হয়তো কোভিড পজিটিভ দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তার শরীরে অন্যকে সংক্রমিত করার মতো যথেষ্ট ভাইরাস নেই।

এখন পর্যন্ত মানসম্পন্ন প্রটোকল হলো, কেউ যদি আক্রান্তের সংস্পর্শে আসে, তবে তাকে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে রাখা। আর তার মধ্যে যদি উপসর্গ দেখা দেয় তবে পরীক্ষা করাতে হবে। বাস্তবতা হলো, আক্রান্তের সংস্পর্শে এলেই যে কেউ আক্রান্ত হয়ে যাবে তা নয়। আবার সংস্পর্শে আসার কারণে কেউ আক্রান্ত হলেও তার শরীরে উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। আমরা যেহেতু অর্থনীতির চাকা আবারও সচল করেছি, সেক্ষেত্রে এ কোয়ারেন্টিন প্রটোকল বজায় রেখে অফিস, কারখানা, সেবা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনও কার্যক্রম পরিচালনা করাকে অসম্ভব করে তুলবে। আর সবশেষ কথা হলো আরটি-পিসিআর পরীক্ষা খুব অস্বস্তিকর এবং খুবই ব্যয়বহুল। এর জন্য ভালো মানের যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ পরীক্ষাগার, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও বেশ কয়েকটি উপকরণের প্রয়োজন হয়। এ পরীক্ষার ফল পেতে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েকদিন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

র‌্যাপিড টেস্ট কী এবং কেনইবা একে গেম চেঞ্জার মনে করা হচ্ছে?

র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্টের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনকারীকেও শনাক্ত করা যায়। এতে সুবিধা হলো, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় কারা এরইমধ্যে আক্রান্ত হয়ে পুনরায় আক্রান্ত না হওয়ার মতো যথেষ্ট ইমিউনিটি অর্জন করেছে। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কারা এরইমধ্যে ইমিউনিটি অর্জন করেছে তা জানার জন্য আর কোনও সহজ পদ্ধতি এ মুহূর্তে নেই। এ পরীক্ষাটি বাড়িতে বসেই করা যায়, অনেকটা ডায়াবেটিস পরীক্ষার মতো।

র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট দিয়ে সক্রিয় সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত এটি সংক্রামক থাকে ততক্ষণ শনাক্ত করা যায়। র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের বেশ কয়েকটি সুবিধা আছে: ৩০ মিনিটের মধ্যে এ পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। এর জন্য শুধু লালা/থুতু কিংবা ন্যাজাল সোয়াব প্রয়োজন হয়। এর জন্য সুসজ্জিত পরীক্ষাগার কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষিত ব্যক্তির প্রয়োজন হয় না।

অনেক ব্র্যান্ডের তৈরি র‌্যাপিড কিটই ৯৮-৯৯ শতাংশ যথার্থতা অর্জন করতে পেরেছে। এ র‌্যাপিড কিটগুলো যদি বাড়িতে বাড়িতে কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহজলভ্য করা যায়, তবে আমাদের অর্থনীতিকে নিরাপদে সচল করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

আসুন, একটা দৃশ্যপট চিন্তা করি। ধরুন, একটি কারখানায় দুই হাজার শ্রমিক আছে। কারখানাটি আবারও চালু হয়েছে এবং শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করানোর বিধি জারি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা পদ্ধতিতে সবার করোনা পরীক্ষা করলো। দেখা গেলো, ৪০০ শ্রমিকের শরীরে ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ বিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। আর র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে ৫০ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে।

এরপর ওই ৫০ জন শ্রমিককে আইসোলেশনে পাঠানো হলো। ১৪ দিন পর ওই একই শ্রমিকদের শরীরে আবারও করোনা পরীক্ষা করতে হবে। আবার আগের পরীক্ষায় যে ৪০০ জনের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে তাদের সবদিক থেকে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। তারা কারখানায় কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। অন্তত পরবর্তী ছয় মাস তাদের শরীরে করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। এ শ্রমিকেরা নিরাপদে কাজে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি গুরুতর রোগীদের থেরাপি দেওয়ার জন্য প্লাজমা দান করতে পারেন।

নতুন করে কেউ আক্রান্ত হলো কিনা তা জানতে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাকি শ্রমিকদের ওপর প্রতি তিনদিন অন্তর এ কম দামি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট চালাতে পারে।

র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিধা কীসের?

অন্যতম যুক্তিটি হলো, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট পদ্ধতি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ আরটি-পিসিআর থেকে কম যথার্থ ও কম স্পর্শকাতর। কথাটি সত্য। অবশ্য, প্রতিদিন যখন ‘administered virtually’ হবে তখন এ পরীক্ষা অতটা স্পর্শকাতর হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনও ব্যক্তির শরীরে যখন ভাইরাস উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং তা যখন অন্যের জন্য অনেক বেশি সংক্রামক হয়, তখনই র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট পজিটিভ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে আক্রান্তের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ কম থাকলে তা অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে না।

উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ ৩০ মিনিটের মধ্যে জানতে পারবে তারা আক্রান্ত কিনা। একবার সংক্রমণ শনাক্ত হলে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে অন্য কারও মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে যায়। কারণ, সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর পরই তারা নিজেদের দ্রুত কোয়ারেন্টিনে রাখতে পারেন। নিয়মিত র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের মধ্য দিয়ে ভাইরাল ধাপের মতো প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্তকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত উপসর্গগুলোকে পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে এসে গুরুতর কিছুকে আগে থেকেই ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে।

নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের নিজেদের দায়িত্ব কী?

কোভিড-১৯ হলো নতুন একটি রোগ এবং প্রতি মাসে এ নিয়ে নতুন নতুন আবিষ্কার দেখা যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পাঠানো খোলা চিঠিতে ৩২টি দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী এ ধরনেরই একটি আবিষ্কারের কথা জানিয়েছিলেন। তারা দাবি করেন, করোনাভাইরাস যে শুধু ড্রপলেট কিংবা ফোমাইটের মাধ্যমে ছড়ায় না– এ ব্যাপারে তাদের কাছে প্রমাণ আছে। এটি বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়।

তারা জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাইরাসটি বাতাসে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় থাকলে তার চারপাশে থাকা ভাইরাসগুলো নিজেদের সক্রিয় করে তোলে।

সার্স-কভ-২ ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ পর্যন্ত না ভ্যাকসিন কিংবা যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর বিস্তার ঠেকাতে আমাদের অবশ্যই নন-মেডিক্যাল পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে হবে।

আমাদের অবশ্যই জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। আর অজান্তে যদি কোনও জনসমাগমের এলাকায় চলেও যাই, তবে আমাদের অবশ্যই সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে হবে। ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। জানালাগুলোকে এমনভাবে খুলে দিতে হবে যেন যথাযথভাবে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল করতে পারে এবং হাত ধুতে হবে।

বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র নয়। আমাদের দেশের জনগণের সিংহভাগই যখন ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করছে, তখন লকডাউন অব্যাহত রাখারও উপায় নেই। বর্তমানে আমরা কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মধ্যে আছি। লকডাউন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ও কন্টাক্ট ট্রেসিং-এর ক্ষেত্রে র‌্যাপিড টেস্টিং একটি সহজ ও সস্তা পদ্ধতি। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, উপাসনালয় খুলতে এবং টানেলের শেষ প্রান্তে থাকা আলোর দেখা পেতে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট জরুরি।

লেখক: অর্গানিকেয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক।  এমবিবিএস, এমবিএ এবং হেলথকেয়ার লিডারশিপে মাস্টার্স।






Related News