Main Menu

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রতাপশালী ধরনটি ‘শনাক্ত’

বাংলাদেশে নতুন করোনাভাইরাসের কোন রূপটি বেশি সংক্রমণ ঘটাচ্ছে, জিনবিন্যাস বিশ্লেষণ করে তা খুঁজে পেয়েছেন দেশের গবেষকরা।

রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তা তুলে ধরে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ ল্যাব।

এর মধ্য দিয়ে প্রাণ সংহারী এই ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি বুঝে সংক্রমণের পরবর্তী ঢেউ রোধের প্রস্তুতি যেমন নেওয়া যাবে, তেমনি তা এখানকার জন্য টিকা তৈরির কাজটিও সহজ করবে।

সাত মাস আগে গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে বিশ্বে মহামারী বাঁধিয়ে দিয়েছে নতুন ধরনের এই করোনাভাইরাস।

বিশ্বের প্রায় দেড় কোটি মানুষকে আক্রান্ত করার পাশাপাশি ৬ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে এই ভাইরাস, গবেষকরা যার নাম দিয়েছেন সার্স সিওভি-২।

মহামারী সৃষ্টি করা এই ভাইরাসের প্রকৃতি বুঝতে সারাবিশ্বের গবেষকরা এর জিনবিন্যাস উন্মোচনে নামে, যাতে নতুন করোনাভাইরাসটির রূপ বদল করে সংক্রমণ ঘটানোর বিষয়টিও নজরে আসে তাদের।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকরাও দেড় শতাধিক নতুন করোনাভাইরাসের নমুনার জিনবিন্যাস বের করে।

ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (এনসিবিআই) ও গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা (জিএসএআইডি)-তে ১৭১টি জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটা জমা দেওয়ার পর রোববার সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিসিএসআইআরের গবেষকরা।

বিসিএসআইআরের ডেজিগনেটেড রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিকেল মেজারমেন্টস-ডিআরআইসিএম ল্যাবে সংবাদ সম্মেলনে তার বিস্তারিত তুলে ধরেন জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের প্রধান সেলিম খান।

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসে ১ হাজার ২৭৪টি প্রোটিন থাকে। তার মধ্যে ২১২ থেকে ৫২৩ পর্যন্ত হল গুরুত্বপূর্ণ স্পাইক প্রোটিন। এর মধ্যে আমরা কোনো মিউটেশন পাই নাই। ৬১৪-জি করোনাভাইরাস যে স্ট্রেইনটি সিকোয়েন্সিংয়ে শনাক্ত হয়েছে, তা কিন্তু এর বাইরে পড়ছে।

“আমরা প্রত্যেকটি জিনোম সিকোয়েন্সে ‘ডি৬১৪জি’ করোনাভাইরাস স্ট্রেইনটি পেয়েছি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ইতোমধ্যে তার জিনোমিক লেভেলে ৫৯০টি ও প্রোটিন লেভেলে ২৭৩টিরও অধিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘ডি৬১৪-জি’ করোনাভাইরাস স্ট্রেইনটি সিকোয়েন্সিংয়ে শনাক্ত হয়েছে, যাকে আমরা বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে বলছি।”

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে আনুবীক্ষণিক যন্ত্রে দেখা নতুন করোনাভাইরাস

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে আনুবীক্ষণিক যন্ত্রে দেখা নতুন করোনাভাইরাস

নতুন করোনাভাইরাসের ডি৬১৪জি’ ধরনটি গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইউরোপে প্রথম দেখা গিয়েছিল। এখন ভারত, ব্রাজিল, ইরানেও এই ধরনটির প্রতাপ দেখছেন বিভিন্ন দেশের গবেষকরা।

‘ডি৬১৪-জি’ ধরনটি নিয়ে চীনের গবেষকদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন চিকিৎসা সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের দেহে যে এন্টিবডি তৈরি হয়,তা পরবর্তীতে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরনকে ঠেকাতে পারলেও ‘ডি৬১৪-জি‘র ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে।

সেলিম খান বলেন, “আমরা ২১২ থেকে ৫২৩ পর্যন্ত ৮টি মিউটেশন পেয়েছি ইউনিক, এই মিউটেশনগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটে নাই। আমাদের নজর রাখতে হবে আমরা আরও ইউনিক মিউটেশন পাই কি না।”

টিকার ক্ষেত্রে এই গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “যখন কোনো মেডিসিন, ভ্যাক্সিন ডিজাইন করবে, সমস্ত মিউটেশন মাথায় রেখে ডিজাইন করতে হবে।”

বাংলাদেশে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬১৮ জনের। গত ৮ মার্চ প্রথম ইতালিফেরত একজনের দেহে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে।

সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান দেশে করোনাভাইরাসে নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ভিত্তিতে বলেন, “বাংলাদেশের করোনাভাইরাসটি ইতালির ভাইরাসটির সাথে বেশি নিবিড়।”

ইয়াফেস ওসমান চলতি বছর মে মাসে দেশে করোনাভাইরাসের সঠিক চিত্র জানার জন্য বাংলাদেশের ৮টি বিভাগ থেকে ইনফেকশন রেট ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যানিক ভিত্তিতে সর্বমোট ৩০০ করোনাভাইরাসের সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করার জন্য জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে একটি প্রকল্প শুরু করার নির্দেশ দেন।

এরপর থেকে বিসিএসআইআরের গবেষক দলটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের সার্বিক সহযোগিতায় সারা দেশ থেকে নমুনা ও রোগীদের মেডিকেল ইতিহাস সংগ্রহ ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

সেলিম খান জানান, বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের পাশাপাশি কোভিড-১৯ এর রোগীর নমুনায় সহাবস্থায় অন্যান্য আরও রোগ সংক্রামক জীবাণু বা প্যাথোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন।

এই পর্যায়ে বিজ্ঞানী দল সেই জীবাণুগুলোর উপস্থিতিতে সংক্রমনের তীব্রতার সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করতে গবেষণা চালাচ্ছেন।

এছাড়াও বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা কোভিড-১৯ রোগীর নমুনায় অন্যান্য মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জিনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন বলে জানান সেলিম খান।

এই পরিস্থিতিতে রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য জিনোম সিকোয়েন্সিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরেন তিনি।

সেলিম খান বলেন, করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং দ্রুততর এবং বৃহত্তর স্তরে পরিচালিত হলে ভাইরাস কীভাবে কীভাবে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে, তা বুঝতে চিকিৎসক, রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে, যাতে ভবিষ্যৎ মহামারী রোধ করার জন্য কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারণ করা যায়।

তিনি বলেন, “মানুষ হতে মানুষে ইনফেকশন বিস্তারের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের জিনোমগুলো ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে। এই পরিবর্তনগুলো রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করে, ভাইরাসটির বিস্তাররোধে জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করবে।

“সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বার প্রাক্কালে অঞ্চল ভেদে ভাইরাসটি তার স্বতন্ত্র রূপ -মিউটেশন তৈরি করতে পারে, সেক্ষেত্রে সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক এই স্বতন্ত্র ভাইরাস স্ট্রেইন শনাক্তকরণের মাধ্যমে মহামারী পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে সেকেন্ড ওয়েভের সময়ে অতি দ্রুত ভাইরাসের সম্ভাব্য উৎস স্থল শনাক্ত করা সম্ভব হবে।”

এছাড়াও এই ভাইরাসের পরিবর্তনগুলো রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখছে এবং রোগের তীব্রতা বা লক্ষণসমূহের সঙ্গে করোনাভাইরাসের মিউটেশন সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা নির্ধারণেও সিকোয়েন্সিং ডেটা সহায়তা করতে পারে।

এক্ষেত্রে বিসিএসআইআর বাংলাদেশের অন্যান্য গবেষণা সংস্থা ও ঔষধ প্রশাসনকে তথ্যউপাত্ত দিয়ে সহায়তা করবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

বদলে গিয়ে আরও সংক্রামক হতে পারে করোনাভাইরাস: গবেষণা  

জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের বিজ্ঞানীরা ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন ও ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের বায়োইনফরমেটিক্স দলের সঙ্গেও কোভিড-১৯ এর প্রভাব বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন।

বিজ্ঞানমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, “নভেল করোনাভাইরাসের জীবন রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে এর উৎস, গতি, প্রকৃতি ও বিস্তার সঠিকভাবে জানতে পারলে তা থেকে খুব সহজেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারবো। বিশেষ করে এই তথ্য উপাত্ত করোনাভাইরাসের চিকিৎসা এবং ওষুধ বা টিকা তৈরির ক্ষেত্রে বিস্তর সুবিধা দেবে। ফলে দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।”

এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ৬৭ হাজার ৫২৪ এর বেশি করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স ডেটা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা (জিএসএআইডি)-তে প্রকাশ করেছেন।

ইয়াফেস ওসমান বলেন, “এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ১৭১টি করোনাভাইরাসের জীবন রহস্য তথ্য পাঠানো হয়েছে। এই গবেষণার ব্লুপ্রিন্ট বিশ্বে চলমান ভ্যাকসিন গবেষণা গ্রুপের সাথে প্রকাশ করে তাদের ভ্যাকসিন গবেষণায় অংশীদার হওয়ায় চেষ্টা চলছে।”

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক একেএম শামসুজ্জামান। সুত্র- বিডি নিউজ ও এশরার ওসমান ।






Related News