মতামত/উ্প-সম্পাদকীয়

now browsing by category

 
Posted by: | Posted on: September 11, 2021

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার স্থাপনের খবরে হতাশা

প্রেস ওয়াচ ডেস্ক ঃ

পত্রিকান্তরে ঢাকায় একটি বিদেশি স্টাডি সেন্টার নিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরোধিতার খবর পড়লাম। ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ কলেজের লাভজনক স্টাডি সেন্টার স্থাপনকে অনেকে দেশে বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অলাভজনক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলছেন। মোনাশ কলেজের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সেখানকার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেবেন। সুতরাং অনেকে এটিকে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখছেন।

আমার মনে পড়ছে, বছর দেড়েক আগে আমি দেশের অন্য একটি দৈনিক পত্রিকায় এক কলামে লিখেছিলাম, সরকার যদি দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দেয় তাহলে বিদেশের টপ র‍্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এত পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও উচ্চ মাধ্যমিকের পরে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়। সুতরাং সরকারের বিদেশি ক্যাম্পাসের অনুমতিদানের ব্যাপারটি অনুমেয়। আমার বক্তব্য ছিল বিদেশি শাখা ক্যাম্পাস খোলার যদি অনুমতি দিতেই হয় তাহলে কাতারে বা ইউএই-তে যেভাবে বিশ্বখ্যাত জর্জটাউন বা জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলা হয়েছে সে রকমটি এখানেও হতে পারে। এর পরিবর্তে বিদেশের একটি কলেজের স্টাডি সেন্টার স্থাপনের খবরে আমি অন্য সবার মতো চরম হতাশ হয়েছি। সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ অবশ্যই যৌক্তিক। বিদেশের শাখা ক্যাম্পাস হলে তাও অন্তত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক ধরনের আন্তর্জাতিকীকরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিদেশের ছেলেমেয়েরাও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে পড়তে আসবে। কিন্তু দুই চার জন শিক্ষক আর একটা বিল্ডিংয়ের কিছু অংশ ভাড়া নিয়ে এ ধরনের স্টাডি সেন্টার চালানো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যেহেতু এখানে বিদেশের প্রলোভন আছে।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনাকালে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট, ভর্তি সমস্যা নিয়ে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এখন গলদঘর্ম। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে স্টাডি সেন্টারসহ নানা বিতর্ক। এ রকম আরেকটি বিতর্ক পত্রিকায় পড়লাম, তা হলো সরকার নাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোত ভিসি নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইউজিসি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০-এর অনেক ধারা পরিবর্তন করতে চাইছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সরকার তার ইচ্ছেমতো–এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেওয়া প্যানেলের বাইরে থেকেও ভিসি নিয়োগ করতে পারবে। এটি পত্রিকার শিরোনামও হয়েছে।

যদিও প্রায় ১৫টি ধারা পরিবর্তনের কথা পত্রিকায় এসেছে, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ভিসি নিয়োগের ব্যাপারটি সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অ্যাসোসিয়েশন এর সমালোচনা করেছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসিদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ জনগণ চরম বিরক্ত। আমি অন্য ধারাগুলোর পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে চাইছি না, কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ শুরু হয় তাহলে শিক্ষার পরিবেশ ভয়াবহ ক্ষুণ্ন হতে পারে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত তাদের ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনীতিমুক্ত বা সেশনজটমুক্ত রাখতে পারায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। পড়াশোনা চাকরিমুখী হওয়ায়, ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরি পাওয়ার হার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি। এখন সেখানে যদি সরকারের ইচ্ছায় বা রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ হয়, তাহলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে শুধু হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিদেশ গমনের প্রবণতা ঠেকানোর মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাচ্ছে যে তা নয়, মেধাবীদের চাকরি প্রাপ্তির একটি বড় ক্ষেত্রও হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা আছে। যেগুলো বিতর্কিত বা নিম্নমানের সেগুলো তো ইউজিসি চিহ্নিত করছেই। কিন্তু অনেক ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ও তো আছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে এক কাতারে ফেলে একই ধরনের নিয়ম চালু করলে তা কোনোভাবেই ভালো ফল দেবে না। যেমন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি একজন বিদেশি। তিনি দেশে-বিদেশে খুবই হাইপ্রোফাইল একজন অ্যাকাডেমিক। তিনি আসার পর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অনন্য উচ্চতায় পেয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে আসা শুরু করেছে। সরকার ভিসি নিয়োগ দিলে সঙ্গত কারণেই আমরা এ রকম ভিসি দেশে হয়তো দেখবো না।

অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যেমন সমালোচনা আছে, তেমনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান অনেক পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ বিকাশ কিছুটা ঝুঁকির মুখেও পড়েছে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি অধিভুক্ত কলেজের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশ কমে গেছে বা যাবে। এই কলেজগুলোতে শিক্ষার মানের কি উন্নতি হয়েছে তা আমরা জানি না, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়ার আশায় অনেকেই এখন এসব কলেজে পড়তে আগ্রহী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের সঙ্গে তো অন্য কিছুর তুলনা চলে না! একদিকে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি বাড়ানো কিছুটা বিস্ময়করই বটে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর মাধ্যমে যে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে তা নয়; বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমে গেছে। যতদূর জানি সরকারি চাপে এখন সান্ধ্যকোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ আছে, তবে শিক্ষকদের একাংশের এ বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বলাবাহুল্য, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের তা মোটেই পছন্দ নয়। তারা মাঝে মধ্যেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।

অনেক বিতর্কের মধ্যে আরেকটি বিতর্ক হচ্ছে ক্যারিকুলাম। তবে এক্ষেত্রে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হচ্ছে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন, আউটকাম বেজড এডুকেশন ইত্যাদির ওপর গুরুত্বারোপ। কিন্তু ক্যারিকুলাম তৈরি বা সংশোধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকদের মতামতকে আবশ্যকীয় বিষয় করার কারণে ক্যারিকুলামে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। যেমন, আমি আমার বিষয় সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিষয়েরই উদাহরণ দেই। আমি যতদূর জানি দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটামুটি একই ধরনের নামে বা একই ধরনের ক্যারিকুলামে একত্রিত এই বিষয়গুলো পড়ানো হয়। উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের অধীনে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু দিন পর পর নতুন নতুন প্রোগ্রাম চালু করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ক্যারিকুলামে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা খুবই দুরূহ ব্যাপার। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক সাংবাদিক সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু এর জন্য দরকার ক্যারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন। আমি মনে করি দেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে সাংবাদিকতা বিভাগগুলো অবদান রাখতে চাইলে বর্তমান ক্যারিকুলামের ব্যাপক সংস্কার দরকার। কিন্তু এটাও বুঝি, ক্যারিকুলাম সংশোধনের যে পদ্ধতি আছে, একক কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

করোনাকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন অর্থাভাবে ধুঁকছে তখন কীসের ভিত্তিতে বাজেটে ১৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন এত কর দেবে এটা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে।

আসলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের পলিসি মেকার তথা ইন্টেলেকচুয়াল এলিটদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবে না (যতই মেধাবী হোক, সাধারণত এ রকম নিয়োগ দেওয়া হয় না), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারবে না (যেমনটি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে)। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে স্থান করে নিলেও কোনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারবে না, এসব যুক্তি মেনে নেওয়া কষ্টকর। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে দেশের কোনও কল্যাণ বয়ে আনবে না।

Posted by: | Posted on: September 5, 2021

গণমাধ্যমকে পুষ্টিহীন করে তুলছে পেশার মানুষেরাই

তুষার আবদুল্লাহ : আমি লজ্জিত। নিজ সহকর্মীদের নিয়ে। পেশার মানুষদের বোকামি দেখে। গণমাধ্যমকে কীভাবে পুষ্টিহীন করে তুলছে পেশার মানুষেরাই। গণমাধ্যমকে বিকলাঙ্গ করার জন্য বাইরের শত্রু’র প্রয়োজন নেই। নিজ ঘরেই আছে বিভীষণ। এখানে স্বীকার করতে হবে সকলে সাংবাদিকতা করতে এই পেশায় আসেননি। আবার নিজ যোগ্যতায় ফোলা আঙুল হননি সকলে। পরজীবী অর্কিড হয়েই কেউ কেউ ফুটে আছেন। যোগ্যতার ঘাটতিতে থাকা মানুষেরা ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে। লক্ষ্য, যোগ্যদের কোণঠাসা করা। যোগ্যদের সহজ-সরল সৃজনশীল বিস্তার ঘটানোই তাদের মিশন। আজকাল প্রমাণ বা বাস্তবের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না থাকলেও কারও নামের সঙ্গে, কাজের সঙ্গে মিথ্যের লেবাস এঁটে দেওয়া সহজ। সেই কাজটি একে-অপরের বিরুদ্ধে দিব্যি করে যাচ্ছি আমরা। প্রবাসে বসে দেশে সাংবাদিকতা যারা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা বচন চালিয়ে যাচ্ছেন। আর দেশের ভেতরেও একে-অপরের বিরুদ্ধে যেন ‘জেহাদে’ নেমে পড়েছি আমরা। সাংবাদিকতা আড়াল হয়ে যাচ্ছে নিজেদের ভেতরকার সাংঘর্ষিক আবহাওয়ায়।

সব পেশার মতো সাংবাদিকতা পেশার মানুষদের ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। সেই ভুল প্রকাশ্যে আনার দায়িত্বটি কেন সহকর্মী হিসেবে আমি নেব? অপ্রমাণিত ও মিথ্যে তথ্য সরবরাহ করেও আমরা পাশের সহকর্মীকে বিব্রত করছি। যে বিষয়ে অন্য সহকর্মীর নামে কুৎসা ছড়াচ্ছি, সঠিক রিপোর্টিং করলে দেখা যাবে, ওই দোষে আমি নিজেই দোষী। কেন করছি এ কাজগুলো? যখন নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমি নিজেই আত্মবিশ্বাসী নই, আমরা প্রয়োজনের সঙ্গে জড়াচ্ছি, আত্মার নয়। এই বোধ গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে আমার, আমাদের থাকা উচিত। কিন্তু দেখছি আমরা ক্রমশই বোধশূন্য হয়ে পড়ছি।

সহকর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কটা ঈর্ষার হতেই পারে। যা তাড়িত করবে কাজের মাধ্যমে একজন, আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। সেটা অবশ্যই কাজের মাঠে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। মহল্লার খেলার মাঠে দেখেছি, যে দলটি খেলে জিততে পারবে না নিশ্চিতভাবে জানতো, তারাই গোল দিতে না পেরে খেলার মধ্যখানে বা শেষে গোলমাল বাঁধাতো। প্রতিদ্বন্দ্বী যেই হোক- ছোট দল, বড় দল, উভয়কেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করাটাই বীরের কাজ। খেলার মাঠে যারা গোল বাধায় তাদের কেউ কখনও সেরা বা বীর বলে স্বীকৃতি দেয় না।

গণমাধ্যমকে সুষম ও পুষ্টিকর শুধু নিজ স্বার্থে হতে হবে তা নয়। রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, রাজনীতি ও জনগণের স্বার্থেই এর প্রয়োজন। আমরা স্বাধীকার আন্দোলন, স্বৈরাচার আন্দোলনের সময় দেখেছি, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গণমাধ্যম কীভাবে সহচরের ভূমিকা পালন করেছে। রাজনীতির শুদ্ধতা এবং শুভচিন্তার অনুশীলন, সর্বোপরি বাংলাদেশের বিজয় উদযাপন প্রবাহমান রাখতে, ‘আত্ম-কাজিয়া’ থেকে বেরিয়ে এসে, নিজের কাজ অর্থাৎ সাংবাদিকতায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের ভেতরকার দূষিত ও গুমট আবহাওয়ার জন্য বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তাদের আমি দায়ী করি না। কারণ গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর লু’ হাওয়া প্রবাহিত করার নকশাগুলো,আমরাই তাদের এঁকে দেই। নকশায় নীল রঙ ঢেলে দেওয়ার কাজটিও আমাদের করা। কালো পিচ ঢেলে সেখানে নাম খোদাই করার কাজটিও আমরাই করি।

স্মরণে এলো– একুশে টেলিভিশন বন্ধ হওয়ার পরে, এনটিভি নামের একটি চ্যানেল অন এয়ারে আসে। সেখানে একুশের সহকর্মীদের প্রায় সকলেই যোগ দিতে পারলেন। আমরা কয়েকজন পারিনি। কারণ আমরা নাকি ‘আওয়ামী সাংবাদিক’। কাজটি কারা করেছিলেন? আমাদের সহকর্মীরাই।

আমাদের সকলকেই স্মরণে রাখা দরকার, এই পেশার সবার আমলনামাই প্রকাশিত। সাময়িক সম্পাদনা করে, মুছে ফেলা যাবে না। সত্যের জলছাপ রয়েই যাবে। তাই অপকাজে বৃথা ঘাম না ঝরিয়ে আসুন, মাঠে মেধার পরীক্ষায় মনোযোগী হই। বিভীষণের রূপ থেকে বেরিয়ে এসে কুশলী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠি একে অপরের। মেধার লড়াইয়ে যদি হেরেও যাই, জয়ীদের প্রতি নিরন্তর আমার টুপি খোলা অভিনন্দন।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

Posted by: | Posted on: August 16, 2021

যে কারণে ১৫ আগস্টকে বেছে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা

রঞ্জন বসু, দিল্লি 

ডেইলি প্রেসওয়াচঃ ছেচল্লিশ বছর আগে আজকের দিনেই বাংলাদেশের জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। কিন্তু সুপরিকল্পিত সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য ১৫ আগস্ট তারিখটা বেছে নেওয়া নিছকই কোনও ঘটনা নয় বলে ভারতের সাবেক সামরিক ও কূটনীতিক কর্মকর্তাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

জাতি হিসেবে ভারতীয়দের সবচেয়ে আনন্দের ও গৌরবের দিন দেশের স্বাধীনতা দিবস, ১৫ আগস্ট। সেই দিনটিকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে শোকাবহ দিবসে পরিণত করার মধ্যে একটা ষড়যন্ত্র ও ভূ-রাজনৈতিক বার্তা অবশ্যই ছিল বলে সরাসরি জানাচ্ছেন তারা।

যেমন, এদেরই একজন বীর চক্র খেতাবে ভূষিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল অশোক তারা। একাত্তরের ১৭ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কব্জায় থাকা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের প্রায় একার হাতে উদ্ধার করেছিলেন এই সেনা কর্মকর্তা। কয়েক মাসের শিশুপুত্র জয়কে কোলে নিয়ে শেখ হাসিনাও ছিলেন তার মধ্যে— পরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকার কর্নেল তারাকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননাতেও ভূষিত করেছে।

সেই কর্নেল তারা এদিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘এমনি এমনি তো ১৫ আগস্ট তারিখটা বেছে নেওয়া হয়নি। আজ  এত বছর পরেও নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য ওই দিনটি সবচেয়ে শোকের দিন। কয়েকজন মৌলবাদী ও ক্ষমতালিপ্সু লোক সেদিন মানবতাকে হত্যা করেছিল বলে আমি মনে করি।’

‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে ধূলিস্যাৎ করার মধ্যে দিয়ে তারা প্রতিবেশী ভারতকেও একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল— তোমাদের স্বাধীনতা দিবসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীককে হত্যা করা হলো।’কর্নেল (অব.) অশোক তারাকর্নেল (অব.) অশোক তারা

‘বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ওই ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে অনেকগুলো বছরকে তারা টালমাটাল করে দিতে পেরেছিল অবশ্যই’, বলছিলেন প্রবীণ ওই সামরিক বিশেষজ্ঞ।

সাবেক কূটনীতিবিদ অরুণ ব্যানার্জি মালদ্বীপ, গ্রিসের মতো দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ও ভোরতের কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন দানা বাঁধছে, দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী ও ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের মতো দুই দিকপাল রাষ্ট্রনেতা ক্ষমতায়, সেই সময় তিনি দীর্ঘদিন ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন।

অ্যাম্বাসাডর ব্যানার্জিও এদিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আততায়ীরা ১৫ আগস্ট তারিখটা বেছে নিয়েছিল খুব সচেতনভাবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে রক্তের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেই ইতিহাসটা মুছে দিতেই যেন ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ওই হামলা চালানো হয়।’

সাবেক কূটনীতিবিদ অরুণ ব্যানার্জিসাবেক কূটনীতিবিদ অরুণ ব্যানার্জি

‘ওই আততায়ীরা স্পষ্টতই পাকিস্তান ও সিআইএ-র মদতপুষ্ট ছিল। এবং ১৫ আগস্ট সকালে হামলাটা চালিয়ে তারা বার্তা দিতে চেয়েছিল, শেখ সাহেব ভারতের এত প্রিয় মানুষ, কিন্তু তাদের স্বাধীনতা দিবসেই তাঁর বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়ে আমরা সপরিবারে তাকে নিকেশ করেন এলাম … কিন্তু ভারত কিছুই করতে পারলো না!’

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের আগে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি হয়েছিল কিনা, বা ভারতের সেখানে কোনও ব্যর্থতা ছিল কিনা– তা নিয়ে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত অবশ্য কোনও মন্তব্য করতে চান না।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে– বজ্রপাতের মতো এই খবর যখন দিল্লিতে আসে, তখন দেশের বেশির ভাগ মন্ত্রী, এমপিরা সকলেই রাষ্ট্রপতি ভবনে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের দেওয়া ‘অ্যাট হোম’ অনুষ্ঠানে তারা সেখানে মিলিত হয়েছিলেন, কিন্তু সেই আনন্দ আসর নিমেষেই পরিণত হয় শোক আর বিহ্বলতায়।

Posted by: | Posted on: August 15, 2021

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বদলা: এ যেন আরেক মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা

পাভেল হায়দার চৌধুরী/প্রেসওয়াচ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকের দল। বাদ যায়নি পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট্ট রাসেলও। ইতিহাসের জঘন্যতম এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে আসেনি কেউ। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর কিছু ভক্ত। এ সময় কেউ নীরব থেকেছেন, কেউ খুনি মোশতাক সরকারের ছায়াতলে ভিড় করেছেন। জাতির জনককে হত্যা যেন স্বাভাবিক ঘটনা! এমনটা দেখে চট্টগ্রামের ছাত্রলীগের সাবেক কিছু নেতা প্রথমে মুষড়ে পড়েন। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকেন দলের তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের ওপর। শীর্ষ সারির কোনও নেতার কাছ থেকে সাহস-পরামর্শ না পেলেও দমে যাননি চট্টগ্রামের ওই নেতারা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন তারা। গঠন করেন জাতীয় মুজিব বাহিনী।

গেরিলা যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নেয় দলটি। খুনি মোশতাকের পুরান ঢাকার আগামাসি লেনের বাড়িতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল জাতীয় মুজিব বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য।

এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন মুজিব ভক্ত মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তিনি চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, দক্ষিণ জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক ও যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তখন।

অন্যদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী (নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক), শেখ মো. আইয়ুব বাঙালি (নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি), মোহাম্মদ ইউনূছ (নগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক), যুবনেতা শফিকুল ইসলাম ও যুবনেতা ডা. শফি মৌলভী সৈয়দ আহমেদ।

তারা সবাই মৌলভী সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় বদলা নেওয়ার নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে ’৭৫ পরবর্তী জাতীয় মুজিব বাহিনীর পরিকল্পনার বৃত্তান্ত জানান ওই সংগঠনের সক্রিয় কর্মী মোহাম্মদ ইউনূছ। শোনা যাক তার ভাষ্যে-

সৈয়দ ভাই বললেন, গ্রেনেড জোগাড় করা যাবে?

‘১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। বাকশালের কমিটি গঠন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঢাকায় ছিলেন। এবিএম মহিউদ্দিন ভাই, ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহিম ভাই, মৌলভী সৈয়দ আহমেদ আমরা সবাই ঢাকায়। আইয়ুব বাঙালি ভাই ও আমি কমলাপুর স্টেশনের একটি রুমে। রাতে মহিউদ্দীন জানালেন সকালে সবাই মনছুর আলী সাহেবের বাসায় যাবো।

গভীর রাতে বোমার আওয়াজ পাই। ভেবেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পটকা ফুটছে। আমি ও আইয়ুব ভাই ভোরে হোটেল নিরালায় মহিউদ্দিন ভাইয়ের রুমে যাই। ইব্রাহিম ভাই নাস্তা এনেছেন। মহিউদ্দিন ভাই মনছুর আলী সাহেবের বাসায় সবাইকে আসতে বলে রুম থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি বললাম আমিও যাবো। এরইমধ্যে হঠাৎ একজন এসে খবর দিলো সর্বনাশ হয়ে গেছে, বঙ্গবন্ধু আর নেই।

দ্রুত রেডিও ছাড়লাম। শুনলাম মেজর ডালিমের কণ্ঠ। এ সময় নিরালায় মৌলভী সৈয়দ আহমেদ ভাই হাজির। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বললেন, এ মুহূর্তে করণীয় কী? আমাকে পাঠানো হলো ঢাকার অবস্থা দেখতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেক ভাই থাকতেন এলিফেন্ট রোডে। প্রথমে সেখানে যাই। দেখি উনি নাই। সেখান থেকে ৩২ নম্বরের দিকে এগুতে থাকি। কলাবাগানের সামনে ব্যারিকেড। কেউ পার হতে পারছে না। শহরে কারফিউ। হোটেলে ফিরে সৈয়দ ভাই ও মহিউদ্দিন ভাইকে জানালাম।

হঠাৎ সৈয়দ ভাই বললেন, হ্যান্ডগ্রেনেড জোগাড় করা যাবে? আমরা আক্রমণ করবো। আমরা আমাদের কানেকশনগুলোতে খোঁজাখুঁজি করে গ্রেনেড পেলাম না। ঢাকায় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল না। সবাই এমন ব্যবহার করলেন যেন আমরা অচেনা। তাদের কাছে এই হত্যাকাণ্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনা! নেতাদের এমন আচরণ দেখে হতাশ হয়ে ১৬ আগস্ট রাতে ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম আসি। কয়েক দিনের জন্য আত্মগোপনে যাই।

যুদ্ধ করতে হবে একাত্তরের মতো

ওই বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগ্রাবাদের যে বাসায় মৌলভী সৈয়দ ভাই আত্মগোপনে থাকতেন, সেখানে সবাই উপস্থিত হয়ে মিটিংয়ে বসি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে করণীয় ঠিক করি। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিপন্ন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে ’৭১-এর মতো যুদ্ধ করতে হবে খুনি চক্রের বিরুদ্ধে। এরজন্য প্রথমেই মৌলভী সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে একটি সংগঠন করা জরুরি বলে সিদ্ধান্ত নিই। সংগঠনের নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় মুজিব বাহিনী’।

সিদ্ধান্ত হয় মুজিব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো, খুনি মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে লড়বো। এর জন্য প্রথমে যা দরকার তা হলো অস্ত্র। শুরু করি অস্ত্র ও গ্রেনেডের সন্ধান। প্রথমে ভারতে ধরনা দিলাম। তখন কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায়। তারা জানালো দলীয় এমপিদের যুক্ত করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যোগাযোগও করলাম। কিন্তু কাউকে পেলাম না। যাদের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলাম তারা বললো, আগুন নিয়ে খেলো না।

নেতাদের আচরণে হতাশ হয়ে পড়ি। ভারতে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাদের জানাই আমাদের নেতৃত্বে আছেন মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তারা জানালো আপনারা সরকারের বিরুদ্ধে অ্যাকটিভিস শো করুন। আমরা পরিস্থিতি বিবেচনায় সহযোগিতা করবো। এরপর আমরা কিছু কার্যক্রম দেখানোর পরিকল্পনা নিই।

খুনিচক্র জেনে যায় মুজিব বাহিনীর কথা

হাতে নেই কোনও অস্ত্র। তারপরও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হামলা করার ছক করি। নিজেরা হাতবোমা বানানো শুরু করি। কলকাতা থেকে বোমার কারিগর কেশব সেনকে নিয়ে আসি। তিনি নকশাল আন্দোলনে বোমা বানিয়েছিলেন। কয়েক ধরনের বোমা বানাই আমরা। সেপ্টেম্বরেই চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, চট্টরেশ্বরীসহ সাতটি স্পটে হামলা চালাই। এর আগে খুনি মোশতাকের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করি। যা ভারত থেকে ছাপিয়ে আনা হয়। বোমা হামলা ও লিফলেট বিতরণের ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তৈরি করে। বিবিসিসহ বিশ্বগণমাধ্যমেও আলোচনায় আসে খুনিচক্রের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছে কে বা কারা।

ততক্ষণে খুনিচক্র জানতে পারে জাতীয় মুজিব বাহিনীর কথা। নগরে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেফতার এড়াতে আমাদের নেতা মৌলভী সৈয়দ আহমেদকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভারতীয় যোগাযোগটা যেন আরও মজবুত হয় সেজন্য।

দেশে থেকে যাওয়ায় মহিউদ্দীন চৌধুরী গ্রেফতার হন। সুনির্দিষ্ট মামলা দিতে না পারায় কিছু দিন পর তাকে ছেড়ে দিতে হয়। কারামুক্ত হলে আমরা মহিউদ্দীন ভাইকেও ভারতে চলে যেতে বলি। উনি প্রথমে রাজি হননি। পরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ’৭৬-এর মাঝামাঝি ভারতে যান।

আমরা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কাছে ভারতের রাধানগর নামের একটি এলাকায় জাতীয় মুজিব বাহিনীর সদর দফতর স্থাপন করি। বিশ্বম্ভর দেবনাথের বাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে অফিস করা হয়।

চট্টগ্রামের দামপাড়ায় জাফর কন্ট্রাকটরের বাড়ি থেকে চলে দেশের কার্যক্রম। প্রথম দফায় চট্টগ্রামের সাতটি স্পটে অপারেশন চালানোর পর প্রস্তুতি গ্রহণ করি দ্বিতীয় অপারেশনের। এ অপারেশনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা হামলা করি। লক্ষ্য ছিল যুব সমাজের ভেতরে ‘পোলারাইজেশন’ তৈরি করা এবং আমাদের নেতাকর্মী যারা খুনি মোশতাকের সরকারের দিকে ঝুঁকছে তাদের সাবধান করা। সারা দিন কী করেছি তার রিপোর্ট মহিউদ্দিন ভাই ও ভারতে থাকা মৌলভী সৈয়দ ভাইকে জানাই।

এরইমধ্যে মুক্তি পান মহিউদ্দীন চৌধুরী। পরে জাতীয় মুজিব বাহিনী সদস্যরা মিলে একটি ইশতেহার রচনা করি। সেখানে সন্নিবেশিত করি খুনিচক্রের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পাকিস্তানি ভাবধারা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ চালাতে হবে। এ ছাড়াও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কাজও করতে হবে। ইশতেহার প্রকাশ হওয়ার পরেই আবার আতঙ্ক নেমে আসে।

ইঁদুর-তেলাপোকার ওষুধের আড়ালে

সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাকে মুক্ত এলাকা ঘোষণা করবো। পরিকল্পনা নিলাম বেবিট্যাক্সিতে মাইক বেঁধে ইঁদুর ও তেলাপোকার ওষুধ বিক্রির আড়ালে চলবে কিছু কার্যক্রম। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেকর্ড থাকবে। ওষুধের ক্রেতাদের কাছে ভাষণের রেকর্ড বিলি করবো। আন্দরকিল্লার ৫টি এলাকা চিহ্নিত করলাম। দুটি কিলিং গ্রুপ হাতবোমা নিয়ে উপস্থিত থাকবে। ৫টি এলাকায় পোড়া তেল, কেরোসিন ও চটের বস্তার নিয়ে রিকশায় থাকবে ৫ গ্রুপ। আমরা নির্দিষ্ট একটি টাইম সেট করে ওটাকে ‘জিরো আওয়ার’ ঠিক করে একসঙ্গে কিছু বোমা চার্জ করার সিদ্ধান্ত নিই।

চটের বস্তা, পোড়া তেল ও কেরোসিন নিয়ে অপেক্ষায় থাকা ওই গ্রুপগুলো জিরো আওয়ারে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেবে। এগুলোর সঙ্গে ওষুধ বিক্রির বেবিট্যাক্সিতে বাজবে ৭ মার্চের ভাষণ। এই পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ ঘিরে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর মহিউদ্দীন ভাইকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বোমা বানানোর জন্য মেহেদীবাগের একটি বাসা ঠিক করেন তিনি। সেখানে বোমা বানাতে শুরু করেন কেশব সেন। আমি ও রবি আরও কিছু বোমার সরঞ্জাম কিনতে বকসীর হাটে রওনা হলাম। এরইমধ্যে বানানো একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে মেহেদীবাগের বাসায়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। পুলিশ, আর্মি সবাই হাজির। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। কেশব সেন পালিয়ে গেলেও আর্মির হাতে ধরা পড়ে যায় পিযুষ। আমি ও রবি টিফিন ক্যারিয়ারে বোমার সরঞ্জাম নিয়ে মেহেদীবাগের কাছে আসতেই আর্মি আমাদের চ্যালেঞ্জ করে। আমরা দাবি করি গ্যারেজের মালিকের জন্য ভাত নিয়ে যাচ্ছি। এ বলে ছাড়া পাই।

এদিকে পিযুষ রক্ষিতকে ধরে নিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু পিযুষ থেকে কোনও তথ্যই বের করতে পারেনি ইন্টারোগেশন সেল। তবে পরে আর আন্দরকিল্লা মুক্ত ঘোষণা মিশন সফল করা সম্ভব হয়নি আমাদের পক্ষে। এরপর আমরা মহিউদ্দীন ভাইকে বুঝিয়ে আবার ভারতে পার করে দিলাম। বিভিন্ন ধারায় মহিউদ্দীন ভাইয়ের নাম ৫টি ও পিযুষের নামে ৭টি মামলা দায়ের হয়।

সব থেমে গেলো ১১ আগস্ট

এরপর আমরা ঢাকাকে টার্গেট করি। প্রথমে পুরান ঢাকার খুনি মোশতাকের বাড়ি ছিল টার্গেট। ওই বাড়ি রেকি করি। এর জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করার নির্দেশনা পাই। সেই নির্দেশনায় তিন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়, অ্যাডভোকেট সবিতা দাশ পাল, আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ফজলুল হক বিএসসি ও ডা. এসএ মালেক।

মৌলভী সৈয়দ আহমেদের চিঠি নিয়ে ১৯৭৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাতে আমরা কয়েকজন ঢাকার ট্রেনে চড়ি। আমার হাতে ছিল তিন নেতাকে লেখা গুরুত্বপূর্ণ ওই চিঠি ও অন্যদের কাছে ছিল ভারত থেকে পাওয়া ৫টি গ্রেনেড।

১২ সেপ্টেম্বর সকালে কমলাপুর নেমে আমি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখার হাতে ধরা পড়ি। এ সময় উপায় না দেখে ওই চিঠি আমি গিলে ফেলি। পরে ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে গ্রেফতার হন সালাউদ্দীন হারুন ও অ্যাডভোকেট দীপেস চৌধুরী। এরইমধ্যে সারাদেশে প্রায় হাজার দুয়েক সদস্য জাতীয় মুজিব বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।

তারপর ৭ থেকে ৯ নভেম্বর (১৯৭৬) তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলা চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে খ্যাত।

আসামি করা হয় ১৫ জনকে। তারা হলেন, মৌলভী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ, এবিএম মহিউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইউনুছ, জামাল আহমেদ, সৈয়দ আবু সিদ্দিক, সৈয়দ আবদুল গনি, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ মো. জাকারিয়া, অ্যাডভোকেট শ্যামা প্রসাদ সেন, দীপেষ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সালাউদ্দীন হারুন, শফিকুল ইসলাম, পিযুষ রক্ষিত, মোজাম্মেল হক ও কেশব সেন।

এদিকে ভারতে মোরারাজি দেসাইয়ের ক্ষমতা গ্রহণের পর রাধানগর সীমান্তে মৌলভী সৈয়দ আহমেদের আবাসস্থল ঘেরাও করে ভারতীয় পুলিশ। ওখান থেকে অবশ্য মহিউদ্দীন চৌধুরী পালিয়ে যান। মৌলভী সৈয়দসহ অন্য অনেককে সেখান থেকে আটক করে মেঘালয়ের তুরা পাহাড়ে নিয়ে আসা হয়। ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক অনেককে ছেড়ে দিলেও মোরারাজি দেসাই সরকার মৌলভী সৈয়দ আহমেদকে পুশব্যাক করে আর্মির হাতে তুলে দেয়। তাদের অত্যাচার নির্যাতনের মুখে ১৯৭৭ সালের ১১ আগস্টে বন্দি অবস্থায় মারা যান মৌলভী সৈয়দ। চিরকুমার সৈয়দ বলতেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বদলা না নেওয়া পর্যন্ত বিয়ে করবেন না তিনি। চিরকুমার থেকেই পৃথিবী ছাড়তে হলো মৌলভী সৈয়দকে। আর্মির ইন্টারোগেশন সেল লাশ হস্তান্তর করলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন হয়।

তার মৃত্যুতেই মূলত শেষ হয়ে যায় গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা। পরে আমিও গ্রেফতার হই। ১৯৮০ সালে এপ্রিলে মুক্তি পাই। জুনে দিল্লিতে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতে উনি বলেন, আমার ভাই কামাল, জামাল বেঁচে থাকলে তারাও হয়তো তোমাদের মতো লড়তো।’

Posted by: | Posted on: August 15, 2021

বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৫ দিনেই বদলে ফেলা হয় বাংলাদেশকে

 
১৫ আগস্ট,দিপু সিদ্দিকী/প্রেস ওয়াচ/ উদিসা ইসলাম/সুত্র- বাংলা ট্রিবিউন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে সপরিবারে হত্যার পর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে হত্যা বিষয়ে কোনও স্টেটমেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত না হলেও স্পষ্টতই সেদিন ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডকে ‘সরকারের পতন’ বলে অভিহিত করা হয়।

আর এরপর থেকে আগস্টের বাকি দিনগুলোতে  দ্রুতই বদলে যেতে থাকে বাংলাদেশ। এক-এক করে রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয়, রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার বিভিন্ন অঙ্গগুলোকে আমূলে বদলে ফেলতে থাকে খন্দকার মোশতাক আহমদ ও তার অনুচরেরা। বঙ্গবন্ধুর নাম বা মুক্তিযুদ্ধর কোনও প্রামাণ্য যেন না থাকে, সেই উদ্যোগও নিতে পিছপা হয়নি সেদিনের সেই ষড়যন্ত্রকারী সরকার। প্রথম ১৫ দিনের মধ্যেই আটক করা হয়  তাজউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির ২৬ জন নেতাকে। আর সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্টের পত্রিকা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। পত্রিকাগুলোর প্রধান খবরে বলা হয়— ‘১৫ আগস্ট সকালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় স্বার্থে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে।’ ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে নিহত হন বলে পত্রিকার এক কোণায় ঘোষণা করা হয়।

১৫ আগস্ট সামরিক শাসন ঘোষণা করা হয়। তবে একদিন পর কারফিউ শিথিল করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনসাধারণকে ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে অনুরোধ করা হয়। পাশাপাশি নতুন সরকারের সঙ্গে দেশের সকল দেশপ্রেমিক শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়। ক্ষমতা গ্রহণের নেতৃত্বদানকারী খন্দকার মুশতাক আহমদ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নেন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছে। তিন বাহিনীর প্রধান স্ব স্ব বাহিনীর উদ্দেশে প্রদত্ত পৃথক ভাষণে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা ঘোষণা করেন।

image5 (2) ২৬ নেতা গ্রেফতার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তার সঙ্গে কিছু সময় কাটান বলে সরকারি এক মুখপাত্র জানান। ২৩ আগস্ট সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলীসহ ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সমাজবিরোধী তৎপরতা, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আর্জনের অভিযোগ আনা হয়। সামরিক আইনের বিধিমালার আওতায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরও ছিলেন— এএইচএম কামরুজ্জামান, কোরবান আলী, আবদুস সমাদ আজাদ প্রমুখ।

image0 (60) জিয়া সেনাপ্রধান, এরশাদ উপ-সেনাপ্রধান

মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমেদসহ ২৬ জনকে গ্রেফতারের ঠিক পরের দিন ২৪ আগস্ট সেনাপ্রধান হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ’র স্থলাভিষিক্ত হন। শফিউল্লাহর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়। একই আদেশে ভারতে প্রশিক্ষণরত ব্রিগেডিয়ার এ এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদে নিয়োগ করা হয়।

এদিকে ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমদ তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে জেনারেল এমএজি ওসমানীকে  নিয়োগ দেন। বাসসের খবরে প্রকাশ, জেনারেল ওসমানী তার এই নিয়োগের পরপরই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

image1 (50) দুদিন পরে সব স্বাভাবিক

রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমদ ক্ষমতা গ্রহণের একদিন পর সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সকল কর্মচারীকে কাজে যোগদান এবং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। জারিকৃত এক আদেশে বলা হয় যে, প্রত্যেক অফিস ইনচার্জ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজ সুষ্ঠুভাবে সুনিশ্চিত করার জন্য দায়ী থাকবেন। অফিসের কাজে অনিয়ম-অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না বলে সেই আদেশে উল্লেখ করা হয়। সরকার এই মর্মে নির্দেশ জারি করে যে, সকল সরকারি ও বেসরকারি কলকারখানায় যথারীতি উৎপাদন শুরু হবে।

সারা দেশে স্বাভাবিক কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে ১৮ আগস্টের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করা হয়। ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলাসহ প্রতিটি পত্রিকাতেই রাজধানীর প্রাণচাঞ্চল্যের ছবি প্রকাশ করা হয়।

image4 (3) পরতে হবে বিশেষ টুপি

২০ আগস্ট বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের এক বৈঠকে কালো রঙের একটি বিশেষ টুপিকে (যে টুপি খন্দকার মোশতাক পরতেন) ‘জাতীয় টুপি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের জন্য সরকারি পোশাক হিসেবে গলাবদ্ধ কোট, ট্রাউজার প্যান্ট নির্দিষ্ট করা হয়।

এদিনের পত্রিকায় খুবই ছোট্ট করে প্রকাশিত এক সংবাদে জানানো হয়, ১৬ তারিখে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ বিমানযোগে ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাঁকে মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। একজন সরকারি মুখপাত্রের বরাতে বাসস এ খবর জানায়।

১৪ আগস্ট বা তার পূর্বে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সকল প্রামাণ্য ছায়াছবি, সংবাদ চিত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশনা আসে ১৬ আগস্ট। প্রত্যাহারের পর অবিলম্বে সেসব মন্ত্রণালয়ে জমা দানের জন্যও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

image2 (42) একের পর এক রাষ্ট্রপতির আদেশ

২১ আগস্টের পত্রিকায় ছাপা হয় রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মুশতাক আহমদ ২০ তারিখ ঘোষণা জারি করেন। নয়া রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন যে, সামরিক আইন বিধি ও আদেশ সাপেক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বলবৎ থাকবে। ঘোষণায় বলা হয়, রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মুশতাক আহমদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব  গ্রহণ করেছেন। আরও  বলা হয় যে, রাষ্ট্রপতি ১৫ আগস্ট সকালে সমগ্র দেশে সামরিক আইন জারি করেছেন। রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সময়-অসময়ে সামরিক আইন বিধি জারি করতে পারবেন এবং সামরিক আইন-বিধি ও আদেশের অধীনে সংগঠিত কোনও অপরাধ, অথবা ওই সামরিক আইন বিধি ও আদেশ লঙ্ঘনের বিচার ও শাস্তিদানের জন্য রাষ্ট্রপতি বিশেষ আদালত অথবা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবেন।

রাষ্ট্রপতি মোশতাকের বাণী পাকিস্তানে

বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমদ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে পাঠানো এক বাণীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের তীব্র অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া এক তার বার্তার জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন যে, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও উপমহাদেশের দেশসগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ উৎসুক রয়েছে।’

২৮ আগস্ট দুটি বিশেষ সামরিক আদালত গঠিত হয়। সরকার সমগ্র বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সামরিক আইন আদালত গঠন করে। এক সরকারি হ্যান্ডআউটের  বরাত দিয়ে বলা হয়, সরকার   ১৯৭৫ সালের সামরিক আইন বিধিতে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই  সামরিক আইন-আদালত গঠন করেছে। এদিকে ২৮ আগস্ট প্রস্তাবিত ৬১ জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৯৭৫ সালের জেলা প্রশাসন আইনটিও একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে  বাতিল করা হয়। এর ফলে গভর্নর, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট নিয়ম এবং  প্রস্তাবিত জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বাতিল হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। উদিসা ইসলাম