বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার স্থাপনের খবরে হতাশা

Posted by: | Posted on: September 11, 2021

প্রেস ওয়াচ ডেস্ক ঃ

পত্রিকান্তরে ঢাকায় একটি বিদেশি স্টাডি সেন্টার নিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরোধিতার খবর পড়লাম। ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ কলেজের লাভজনক স্টাডি সেন্টার স্থাপনকে অনেকে দেশে বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অলাভজনক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলছেন। মোনাশ কলেজের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সেখানকার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেবেন। সুতরাং অনেকে এটিকে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখছেন।

আমার মনে পড়ছে, বছর দেড়েক আগে আমি দেশের অন্য একটি দৈনিক পত্রিকায় এক কলামে লিখেছিলাম, সরকার যদি দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দেয় তাহলে বিদেশের টপ র‍্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এত পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও উচ্চ মাধ্যমিকের পরে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়। সুতরাং সরকারের বিদেশি ক্যাম্পাসের অনুমতিদানের ব্যাপারটি অনুমেয়। আমার বক্তব্য ছিল বিদেশি শাখা ক্যাম্পাস খোলার যদি অনুমতি দিতেই হয় তাহলে কাতারে বা ইউএই-তে যেভাবে বিশ্বখ্যাত জর্জটাউন বা জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলা হয়েছে সে রকমটি এখানেও হতে পারে। এর পরিবর্তে বিদেশের একটি কলেজের স্টাডি সেন্টার স্থাপনের খবরে আমি অন্য সবার মতো চরম হতাশ হয়েছি। সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ অবশ্যই যৌক্তিক। বিদেশের শাখা ক্যাম্পাস হলে তাও অন্তত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক ধরনের আন্তর্জাতিকীকরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিদেশের ছেলেমেয়েরাও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে পড়তে আসবে। কিন্তু দুই চার জন শিক্ষক আর একটা বিল্ডিংয়ের কিছু অংশ ভাড়া নিয়ে এ ধরনের স্টাডি সেন্টার চালানো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যেহেতু এখানে বিদেশের প্রলোভন আছে।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনাকালে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট, ভর্তি সমস্যা নিয়ে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এখন গলদঘর্ম। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে স্টাডি সেন্টারসহ নানা বিতর্ক। এ রকম আরেকটি বিতর্ক পত্রিকায় পড়লাম, তা হলো সরকার নাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোত ভিসি নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইউজিসি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০-এর অনেক ধারা পরিবর্তন করতে চাইছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সরকার তার ইচ্ছেমতো–এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেওয়া প্যানেলের বাইরে থেকেও ভিসি নিয়োগ করতে পারবে। এটি পত্রিকার শিরোনামও হয়েছে।

যদিও প্রায় ১৫টি ধারা পরিবর্তনের কথা পত্রিকায় এসেছে, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ভিসি নিয়োগের ব্যাপারটি সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অ্যাসোসিয়েশন এর সমালোচনা করেছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসিদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ জনগণ চরম বিরক্ত। আমি অন্য ধারাগুলোর পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে চাইছি না, কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ শুরু হয় তাহলে শিক্ষার পরিবেশ ভয়াবহ ক্ষুণ্ন হতে পারে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত তাদের ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনীতিমুক্ত বা সেশনজটমুক্ত রাখতে পারায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। পড়াশোনা চাকরিমুখী হওয়ায়, ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরি পাওয়ার হার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি। এখন সেখানে যদি সরকারের ইচ্ছায় বা রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ হয়, তাহলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে শুধু হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিদেশ গমনের প্রবণতা ঠেকানোর মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাচ্ছে যে তা নয়, মেধাবীদের চাকরি প্রাপ্তির একটি বড় ক্ষেত্রও হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা আছে। যেগুলো বিতর্কিত বা নিম্নমানের সেগুলো তো ইউজিসি চিহ্নিত করছেই। কিন্তু অনেক ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ও তো আছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে এক কাতারে ফেলে একই ধরনের নিয়ম চালু করলে তা কোনোভাবেই ভালো ফল দেবে না। যেমন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি একজন বিদেশি। তিনি দেশে-বিদেশে খুবই হাইপ্রোফাইল একজন অ্যাকাডেমিক। তিনি আসার পর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অনন্য উচ্চতায় পেয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে আসা শুরু করেছে। সরকার ভিসি নিয়োগ দিলে সঙ্গত কারণেই আমরা এ রকম ভিসি দেশে হয়তো দেখবো না।

অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যেমন সমালোচনা আছে, তেমনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান অনেক পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ বিকাশ কিছুটা ঝুঁকির মুখেও পড়েছে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি অধিভুক্ত কলেজের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশ কমে গেছে বা যাবে। এই কলেজগুলোতে শিক্ষার মানের কি উন্নতি হয়েছে তা আমরা জানি না, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়ার আশায় অনেকেই এখন এসব কলেজে পড়তে আগ্রহী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের সঙ্গে তো অন্য কিছুর তুলনা চলে না! একদিকে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি বাড়ানো কিছুটা বিস্ময়করই বটে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর মাধ্যমে যে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে তা নয়; বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমে গেছে। যতদূর জানি সরকারি চাপে এখন সান্ধ্যকোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ আছে, তবে শিক্ষকদের একাংশের এ বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বলাবাহুল্য, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের তা মোটেই পছন্দ নয়। তারা মাঝে মধ্যেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।

অনেক বিতর্কের মধ্যে আরেকটি বিতর্ক হচ্ছে ক্যারিকুলাম। তবে এক্ষেত্রে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হচ্ছে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন, আউটকাম বেজড এডুকেশন ইত্যাদির ওপর গুরুত্বারোপ। কিন্তু ক্যারিকুলাম তৈরি বা সংশোধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকদের মতামতকে আবশ্যকীয় বিষয় করার কারণে ক্যারিকুলামে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না। যেমন, আমি আমার বিষয় সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিষয়েরই উদাহরণ দেই। আমি যতদূর জানি দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটামুটি একই ধরনের নামে বা একই ধরনের ক্যারিকুলামে একত্রিত এই বিষয়গুলো পড়ানো হয়। উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের অধীনে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু দিন পর পর নতুন নতুন প্রোগ্রাম চালু করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ক্যারিকুলামে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা খুবই দুরূহ ব্যাপার। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক সাংবাদিক সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু এর জন্য দরকার ক্যারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন। আমি মনে করি দেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে সাংবাদিকতা বিভাগগুলো অবদান রাখতে চাইলে বর্তমান ক্যারিকুলামের ব্যাপক সংস্কার দরকার। কিন্তু এটাও বুঝি, ক্যারিকুলাম সংশোধনের যে পদ্ধতি আছে, একক কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

করোনাকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন অর্থাভাবে ধুঁকছে তখন কীসের ভিত্তিতে বাজেটে ১৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন এত কর দেবে এটা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে।

আসলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের পলিসি মেকার তথা ইন্টেলেকচুয়াল এলিটদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবে না (যতই মেধাবী হোক, সাধারণত এ রকম নিয়োগ দেওয়া হয় না), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারবে না (যেমনটি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে)। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে স্থান করে নিলেও কোনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারবে না, এসব যুক্তি মেনে নেওয়া কষ্টকর। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে দেশের কোনও কল্যাণ বয়ে আনবে না।