বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বদলা: এ যেন আরেক মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা

Posted by: | Posted on: August 15, 2021
পাভেল হায়দার চৌধুরী/প্রেসওয়াচ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকের দল। বাদ যায়নি পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট্ট রাসেলও। ইতিহাসের জঘন্যতম এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে আসেনি কেউ। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর কিছু ভক্ত। এ সময় কেউ নীরব থেকেছেন, কেউ খুনি মোশতাক সরকারের ছায়াতলে ভিড় করেছেন। জাতির জনককে হত্যা যেন স্বাভাবিক ঘটনা! এমনটা দেখে চট্টগ্রামের ছাত্রলীগের সাবেক কিছু নেতা প্রথমে মুষড়ে পড়েন। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকেন দলের তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের ওপর। শীর্ষ সারির কোনও নেতার কাছ থেকে সাহস-পরামর্শ না পেলেও দমে যাননি চট্টগ্রামের ওই নেতারা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন তারা। গঠন করেন জাতীয় মুজিব বাহিনী।

গেরিলা যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নেয় দলটি। খুনি মোশতাকের পুরান ঢাকার আগামাসি লেনের বাড়িতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল জাতীয় মুজিব বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য।

এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন মুজিব ভক্ত মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তিনি চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, দক্ষিণ জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক ও যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তখন।

অন্যদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী (নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক), শেখ মো. আইয়ুব বাঙালি (নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি), মোহাম্মদ ইউনূছ (নগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক), যুবনেতা শফিকুল ইসলাম ও যুবনেতা ডা. শফি মৌলভী সৈয়দ আহমেদ।

তারা সবাই মৌলভী সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় বদলা নেওয়ার নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে ’৭৫ পরবর্তী জাতীয় মুজিব বাহিনীর পরিকল্পনার বৃত্তান্ত জানান ওই সংগঠনের সক্রিয় কর্মী মোহাম্মদ ইউনূছ। শোনা যাক তার ভাষ্যে-

সৈয়দ ভাই বললেন, গ্রেনেড জোগাড় করা যাবে?

‘১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। বাকশালের কমিটি গঠন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঢাকায় ছিলেন। এবিএম মহিউদ্দিন ভাই, ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহিম ভাই, মৌলভী সৈয়দ আহমেদ আমরা সবাই ঢাকায়। আইয়ুব বাঙালি ভাই ও আমি কমলাপুর স্টেশনের একটি রুমে। রাতে মহিউদ্দীন জানালেন সকালে সবাই মনছুর আলী সাহেবের বাসায় যাবো।

গভীর রাতে বোমার আওয়াজ পাই। ভেবেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পটকা ফুটছে। আমি ও আইয়ুব ভাই ভোরে হোটেল নিরালায় মহিউদ্দিন ভাইয়ের রুমে যাই। ইব্রাহিম ভাই নাস্তা এনেছেন। মহিউদ্দিন ভাই মনছুর আলী সাহেবের বাসায় সবাইকে আসতে বলে রুম থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি বললাম আমিও যাবো। এরইমধ্যে হঠাৎ একজন এসে খবর দিলো সর্বনাশ হয়ে গেছে, বঙ্গবন্ধু আর নেই।

দ্রুত রেডিও ছাড়লাম। শুনলাম মেজর ডালিমের কণ্ঠ। এ সময় নিরালায় মৌলভী সৈয়দ আহমেদ ভাই হাজির। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বললেন, এ মুহূর্তে করণীয় কী? আমাকে পাঠানো হলো ঢাকার অবস্থা দেখতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেক ভাই থাকতেন এলিফেন্ট রোডে। প্রথমে সেখানে যাই। দেখি উনি নাই। সেখান থেকে ৩২ নম্বরের দিকে এগুতে থাকি। কলাবাগানের সামনে ব্যারিকেড। কেউ পার হতে পারছে না। শহরে কারফিউ। হোটেলে ফিরে সৈয়দ ভাই ও মহিউদ্দিন ভাইকে জানালাম।

হঠাৎ সৈয়দ ভাই বললেন, হ্যান্ডগ্রেনেড জোগাড় করা যাবে? আমরা আক্রমণ করবো। আমরা আমাদের কানেকশনগুলোতে খোঁজাখুঁজি করে গ্রেনেড পেলাম না। ঢাকায় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল না। সবাই এমন ব্যবহার করলেন যেন আমরা অচেনা। তাদের কাছে এই হত্যাকাণ্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনা! নেতাদের এমন আচরণ দেখে হতাশ হয়ে ১৬ আগস্ট রাতে ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম আসি। কয়েক দিনের জন্য আত্মগোপনে যাই।

যুদ্ধ করতে হবে একাত্তরের মতো

ওই বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগ্রাবাদের যে বাসায় মৌলভী সৈয়দ ভাই আত্মগোপনে থাকতেন, সেখানে সবাই উপস্থিত হয়ে মিটিংয়ে বসি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে করণীয় ঠিক করি। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিপন্ন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে ’৭১-এর মতো যুদ্ধ করতে হবে খুনি চক্রের বিরুদ্ধে। এরজন্য প্রথমেই মৌলভী সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে একটি সংগঠন করা জরুরি বলে সিদ্ধান্ত নিই। সংগঠনের নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় মুজিব বাহিনী’।

সিদ্ধান্ত হয় মুজিব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো, খুনি মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে লড়বো। এর জন্য প্রথমে যা দরকার তা হলো অস্ত্র। শুরু করি অস্ত্র ও গ্রেনেডের সন্ধান। প্রথমে ভারতে ধরনা দিলাম। তখন কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায়। তারা জানালো দলীয় এমপিদের যুক্ত করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যোগাযোগও করলাম। কিন্তু কাউকে পেলাম না। যাদের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলাম তারা বললো, আগুন নিয়ে খেলো না।

নেতাদের আচরণে হতাশ হয়ে পড়ি। ভারতে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাদের জানাই আমাদের নেতৃত্বে আছেন মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তারা জানালো আপনারা সরকারের বিরুদ্ধে অ্যাকটিভিস শো করুন। আমরা পরিস্থিতি বিবেচনায় সহযোগিতা করবো। এরপর আমরা কিছু কার্যক্রম দেখানোর পরিকল্পনা নিই।

খুনিচক্র জেনে যায় মুজিব বাহিনীর কথা

হাতে নেই কোনও অস্ত্র। তারপরও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হামলা করার ছক করি। নিজেরা হাতবোমা বানানো শুরু করি। কলকাতা থেকে বোমার কারিগর কেশব সেনকে নিয়ে আসি। তিনি নকশাল আন্দোলনে বোমা বানিয়েছিলেন। কয়েক ধরনের বোমা বানাই আমরা। সেপ্টেম্বরেই চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, চট্টরেশ্বরীসহ সাতটি স্পটে হামলা চালাই। এর আগে খুনি মোশতাকের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করি। যা ভারত থেকে ছাপিয়ে আনা হয়। বোমা হামলা ও লিফলেট বিতরণের ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তৈরি করে। বিবিসিসহ বিশ্বগণমাধ্যমেও আলোচনায় আসে খুনিচক্রের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছে কে বা কারা।

ততক্ষণে খুনিচক্র জানতে পারে জাতীয় মুজিব বাহিনীর কথা। নগরে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেফতার এড়াতে আমাদের নেতা মৌলভী সৈয়দ আহমেদকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভারতীয় যোগাযোগটা যেন আরও মজবুত হয় সেজন্য।

দেশে থেকে যাওয়ায় মহিউদ্দীন চৌধুরী গ্রেফতার হন। সুনির্দিষ্ট মামলা দিতে না পারায় কিছু দিন পর তাকে ছেড়ে দিতে হয়। কারামুক্ত হলে আমরা মহিউদ্দীন ভাইকেও ভারতে চলে যেতে বলি। উনি প্রথমে রাজি হননি। পরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ’৭৬-এর মাঝামাঝি ভারতে যান।

আমরা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কাছে ভারতের রাধানগর নামের একটি এলাকায় জাতীয় মুজিব বাহিনীর সদর দফতর স্থাপন করি। বিশ্বম্ভর দেবনাথের বাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে অফিস করা হয়।

চট্টগ্রামের দামপাড়ায় জাফর কন্ট্রাকটরের বাড়ি থেকে চলে দেশের কার্যক্রম। প্রথম দফায় চট্টগ্রামের সাতটি স্পটে অপারেশন চালানোর পর প্রস্তুতি গ্রহণ করি দ্বিতীয় অপারেশনের। এ অপারেশনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা হামলা করি। লক্ষ্য ছিল যুব সমাজের ভেতরে ‘পোলারাইজেশন’ তৈরি করা এবং আমাদের নেতাকর্মী যারা খুনি মোশতাকের সরকারের দিকে ঝুঁকছে তাদের সাবধান করা। সারা দিন কী করেছি তার রিপোর্ট মহিউদ্দিন ভাই ও ভারতে থাকা মৌলভী সৈয়দ ভাইকে জানাই।

এরইমধ্যে মুক্তি পান মহিউদ্দীন চৌধুরী। পরে জাতীয় মুজিব বাহিনী সদস্যরা মিলে একটি ইশতেহার রচনা করি। সেখানে সন্নিবেশিত করি খুনিচক্রের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পাকিস্তানি ভাবধারা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ চালাতে হবে। এ ছাড়াও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কাজও করতে হবে। ইশতেহার প্রকাশ হওয়ার পরেই আবার আতঙ্ক নেমে আসে।

ইঁদুর-তেলাপোকার ওষুধের আড়ালে

সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাকে মুক্ত এলাকা ঘোষণা করবো। পরিকল্পনা নিলাম বেবিট্যাক্সিতে মাইক বেঁধে ইঁদুর ও তেলাপোকার ওষুধ বিক্রির আড়ালে চলবে কিছু কার্যক্রম। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেকর্ড থাকবে। ওষুধের ক্রেতাদের কাছে ভাষণের রেকর্ড বিলি করবো। আন্দরকিল্লার ৫টি এলাকা চিহ্নিত করলাম। দুটি কিলিং গ্রুপ হাতবোমা নিয়ে উপস্থিত থাকবে। ৫টি এলাকায় পোড়া তেল, কেরোসিন ও চটের বস্তার নিয়ে রিকশায় থাকবে ৫ গ্রুপ। আমরা নির্দিষ্ট একটি টাইম সেট করে ওটাকে ‘জিরো আওয়ার’ ঠিক করে একসঙ্গে কিছু বোমা চার্জ করার সিদ্ধান্ত নিই।

চটের বস্তা, পোড়া তেল ও কেরোসিন নিয়ে অপেক্ষায় থাকা ওই গ্রুপগুলো জিরো আওয়ারে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেবে। এগুলোর সঙ্গে ওষুধ বিক্রির বেবিট্যাক্সিতে বাজবে ৭ মার্চের ভাষণ। এই পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ ঘিরে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর মহিউদ্দীন ভাইকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বোমা বানানোর জন্য মেহেদীবাগের একটি বাসা ঠিক করেন তিনি। সেখানে বোমা বানাতে শুরু করেন কেশব সেন। আমি ও রবি আরও কিছু বোমার সরঞ্জাম কিনতে বকসীর হাটে রওনা হলাম। এরইমধ্যে বানানো একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে মেহেদীবাগের বাসায়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। পুলিশ, আর্মি সবাই হাজির। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। কেশব সেন পালিয়ে গেলেও আর্মির হাতে ধরা পড়ে যায় পিযুষ। আমি ও রবি টিফিন ক্যারিয়ারে বোমার সরঞ্জাম নিয়ে মেহেদীবাগের কাছে আসতেই আর্মি আমাদের চ্যালেঞ্জ করে। আমরা দাবি করি গ্যারেজের মালিকের জন্য ভাত নিয়ে যাচ্ছি। এ বলে ছাড়া পাই।

এদিকে পিযুষ রক্ষিতকে ধরে নিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু পিযুষ থেকে কোনও তথ্যই বের করতে পারেনি ইন্টারোগেশন সেল। তবে পরে আর আন্দরকিল্লা মুক্ত ঘোষণা মিশন সফল করা সম্ভব হয়নি আমাদের পক্ষে। এরপর আমরা মহিউদ্দীন ভাইকে বুঝিয়ে আবার ভারতে পার করে দিলাম। বিভিন্ন ধারায় মহিউদ্দীন ভাইয়ের নাম ৫টি ও পিযুষের নামে ৭টি মামলা দায়ের হয়।

সব থেমে গেলো ১১ আগস্ট

এরপর আমরা ঢাকাকে টার্গেট করি। প্রথমে পুরান ঢাকার খুনি মোশতাকের বাড়ি ছিল টার্গেট। ওই বাড়ি রেকি করি। এর জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করার নির্দেশনা পাই। সেই নির্দেশনায় তিন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়, অ্যাডভোকেট সবিতা দাশ পাল, আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ফজলুল হক বিএসসি ও ডা. এসএ মালেক।

মৌলভী সৈয়দ আহমেদের চিঠি নিয়ে ১৯৭৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাতে আমরা কয়েকজন ঢাকার ট্রেনে চড়ি। আমার হাতে ছিল তিন নেতাকে লেখা গুরুত্বপূর্ণ ওই চিঠি ও অন্যদের কাছে ছিল ভারত থেকে পাওয়া ৫টি গ্রেনেড।

১২ সেপ্টেম্বর সকালে কমলাপুর নেমে আমি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখার হাতে ধরা পড়ি। এ সময় উপায় না দেখে ওই চিঠি আমি গিলে ফেলি। পরে ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে গ্রেফতার হন সালাউদ্দীন হারুন ও অ্যাডভোকেট দীপেস চৌধুরী। এরইমধ্যে সারাদেশে প্রায় হাজার দুয়েক সদস্য জাতীয় মুজিব বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।

তারপর ৭ থেকে ৯ নভেম্বর (১৯৭৬) তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলা চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে খ্যাত।

আসামি করা হয় ১৫ জনকে। তারা হলেন, মৌলভী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ, এবিএম মহিউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইউনুছ, জামাল আহমেদ, সৈয়দ আবু সিদ্দিক, সৈয়দ আবদুল গনি, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ মো. জাকারিয়া, অ্যাডভোকেট শ্যামা প্রসাদ সেন, দীপেষ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সালাউদ্দীন হারুন, শফিকুল ইসলাম, পিযুষ রক্ষিত, মোজাম্মেল হক ও কেশব সেন।

এদিকে ভারতে মোরারাজি দেসাইয়ের ক্ষমতা গ্রহণের পর রাধানগর সীমান্তে মৌলভী সৈয়দ আহমেদের আবাসস্থল ঘেরাও করে ভারতীয় পুলিশ। ওখান থেকে অবশ্য মহিউদ্দীন চৌধুরী পালিয়ে যান। মৌলভী সৈয়দসহ অন্য অনেককে সেখান থেকে আটক করে মেঘালয়ের তুরা পাহাড়ে নিয়ে আসা হয়। ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক অনেককে ছেড়ে দিলেও মোরারাজি দেসাই সরকার মৌলভী সৈয়দ আহমেদকে পুশব্যাক করে আর্মির হাতে তুলে দেয়। তাদের অত্যাচার নির্যাতনের মুখে ১৯৭৭ সালের ১১ আগস্টে বন্দি অবস্থায় মারা যান মৌলভী সৈয়দ। চিরকুমার সৈয়দ বলতেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বদলা না নেওয়া পর্যন্ত বিয়ে করবেন না তিনি। চিরকুমার থেকেই পৃথিবী ছাড়তে হলো মৌলভী সৈয়দকে। আর্মির ইন্টারোগেশন সেল লাশ হস্তান্তর করলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন হয়।

তার মৃত্যুতেই মূলত শেষ হয়ে যায় গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা। পরে আমিও গ্রেফতার হই। ১৯৮০ সালে এপ্রিলে মুক্তি পাই। জুনে দিল্লিতে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতে উনি বলেন, আমার ভাই কামাল, জামাল বেঁচে থাকলে তারাও হয়তো তোমাদের মতো লড়তো।’