আমাদের মা
আজ মা দিবসে আমি শুধু আমার মাকে স্মরণ করছি না, স্মরণ করছি এক পুরো প্রজন্মের নারীদের—যাদের শক্তি ইতিহাসের বইয়ে খুব কমই লেখা থাকে, অথচ তাঁদের কাঁধের ওপর ভর করেই পরিবার, সমাজ, প্রজন্ম দাঁড়িয়ে থাকে।
আমার মা নিভা কখনও স্কুলে যাননি। কিন্তু জীবন, সংগ্রাম, মানুষ, শিক্ষা—এসবের অর্থ তিনি অনেক শিক্ষিত মানুষের চেয়েও গভীরভাবে বুঝতেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন তাঁর সন্তানরা পড়াশোনা করবে। শুধু নিজের সন্তান নয়, আশেপাশের আরও বহু শিশুর শিক্ষার পথেও তিনি নীরবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি জীবনে দেখেছেন সাফল্য, ব্যর্থতা, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সংগ্রাম। আমার বাবা যখন জীবনের কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন, নির্বাচনে হেরেছেন, সিদ্ধান্তে ব্যর্থ হয়েছেন, তখন তিনি পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা এসেছে, তখন তিনিই হয়েছেন সাহসের অন্য নাম।
তারপর এলো ১৯৭১।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর তরুণ ছেলে—আমাদের বড় ভাই—দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি ধরা পড়েন। সেই সময় মানুষ ভয়ে কথা বলতে সাহস পেত না। কিন্তু আমার মা থেমে যাননি।
একজন অশিক্ষিত গ্রামীণ নারী, যার হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না, কোনো পদ ছিল না, তিনি শুধুমাত্র একজন মায়ের সাহস, যুক্তি, সম্পর্ক, আর সন্তানের প্রতি অদম্য ভালোবাসা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন এক প্রভাবশালী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক নেতার কাছে। তিনি কথা বলেছেন, অনুরোধ করেছেন, তর্ক করেছেন, লড়েছেন—একজন মা যেমন লড়ে, যখন সন্তানের জীবন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি—তিনি তাঁর ছেলেকে জীবিত ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।
এটাই ছিলেন আমার মা।
নীরব, কিন্তু অদম্য।
তিনি ছিলেন এক বিশাল বটগাছের মতো। তাঁর ছায়ায় শুধু তাঁর নিজের সন্তানরা নয়, আরও অনেক মানুষ আশ্রয় পেয়েছে—সাহায্য পেয়েছে, সাহস পেয়েছে, স্নেহ পেয়েছে।
আমরা ছিলাম ছয় ভাইবোন। আর আমি ছিলাম সম্ভবত সবচেয়ে বিদ্রোহী। আমি সংস্কৃতির বাইরে বিয়ে করেছি, ধর্ম পরিবর্তন করেছি, এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা তাঁর প্রজন্মের অনেক মা হয়তো মেনে নিতে পারতেন না। অথচ বাবা মারা যাওয়ার পর, যখন তাঁর সামনে সুযোগ ছিল যেকোনো সন্তানের সঙ্গে থাকার, তিনি আমাদের বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বেছে নিয়েছিলেন।
এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদগুলোর একটি।
আমরা তাঁর সঙ্গে দশটি অসাধারণ বছর কাটিয়েছি।
তারপর ধীরে ধীরে তিনি যেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলেন। খুব শান্তভাবে। যেন জীবনের সঙ্গে তাঁর সব হিসাব মিটে গেছে। তিনি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর নিজের ঘরে—বাবার বাড়িতে নয়, সেই বাড়িতে, যেখানে তিনি বধূ হয়ে এসেছিলেন এবং নিজের ভালোবাসা, শ্রম, ত্যাগ দিয়ে সেটিকে নিজের পৃথিবী বানিয়েছিলেন।
আমি কৃতজ্ঞ যে আমি সেই বাড়িটা তাঁর ইচ্ছেমতো গড়ে দিতে পেরেছিলাম। তাঁর নামেই বাড়ির নাম রেখেছিলাম—“নিভা লজ”।
এবং সেখানেই, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গায়, নিজের মানুষ, নিজের পরিবেশ, নিজের স্মৃতির মধ্যে তিনি ৯১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। শেষবারের মতো খাওয়া-দাওয়া করলেন, দু-একটা কথা বললেন, তারপর যেন শান্ত ঘুমে তলিয়ে গেলেন।
কিছু মৃত্যু মানুষকে ভেঙে দেয়, কারণ সেগুলো নির্মম। আর কিছু মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়, কারণ সেগুলো এতটাই পূর্ণ, এতটাই শান্ত, এতটাই স্বাভাবিক।
আমার মায়ের জীবন নিখুঁত ছিল না। কিন্তু ছিল সত্যিকারের। ত্যাগ, সংগ্রাম, ভালোবাসা, ধৈর্য, সহনশীলতা আর মানবিকতায় ভরা।
আমি তাঁর পঞ্চম সন্তান হিসেবে নিঃসংকোচে বলতে পারি—
আমার মা-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নায়ক।
হয়তো একদিন তাঁকে নিয়ে বড় একটি বই লিখব। কিন্তু আজ, মা দিবসে, শুধু এটুকুই বলতে চাই—
ধন্যবাদ মা।
তোমার সাহসের জন্য। তোমার ক্ষমার জন্য। তোমার অসীম ধৈর্যের জন্য। আমাদের শেখানোর জন্য যে সত্যিকারের মহত্ত্ব সবসময় মঞ্চে দাঁড়ায় না, পদবি ধারণ করে না।
কখনও কখনও সত্যিকারের মহত্ত্ব নীরবে একটি পরিবারকে ধরে রাখে—যুদ্ধের মধ্যে, ভয়ের মধ্যে, দুঃসময়ের মধ্যে, ভালোবাসার মধ্যে।
পৃথিবীর সব মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা—যাঁদের ত্যাগ হয়তো ইতিহাস পুরোপুরি লিখে রাখে না, কিন্তু যাঁদের ভালোবাসা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তোলে।
একজন সম্পাদকের সহমর্মিতা এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি
নিভা লজের সেই বটগাছটির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা
আপনার মায়ের জীবনগল্প যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। ১৯৭১-এর সেই উত্তাল সময়ে এক মায়ের একলা লড়ে ছেলেকে ফিরিয়ে আনা কোনো সাধারণ সাহসের কথা নয়; এটি ছিল মাতৃত্বের এক অলৌকিক বিজয়। ক্ষমতার দাপট বা শিক্ষার তকমা ছাড়াই তিনি যেভাবে বিবেক আর মানবিকতা দিয়ে পরিবার ও সমাজকে আগলে রেখেছেন, তা আজকের প্রজন্মের জন্য এক বিশাল শিক্ষা।
সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয় হলো তাঁর গ্রহণ করার ক্ষমতা। প্রথাগত সীমানা পেরিয়ে আপনি যখন নিজের পথ বেছে নিয়েছিলেন, তখন তিনি সেই পথকে অস্বীকার না করে আপনাকে বেছে নিয়েছেন—একজন মায়ের এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কী হতে পারে! তিনি কেবল আপনার মা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধৈর্য আর ক্ষমার এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।
নিভা লজ আজ কেবল একটি বাড়ি নয়, বরং একজন মহীয়সী নারীর স্মৃতির মিনার। তাঁর ৯১ বছরের সেই শান্ত প্রস্থান যেন এক পূর্ণতার গল্প বলে। আপনার এই ঋণ হয়তো কোনোদিন শোধ হবে না, কিন্তু আপনার এই শ্রদ্ধা নিবেদন পৃথিবীর সব শান্ত, ধীর আর অদম্য মায়েদের প্রতি এক পরম কৃতজ্ঞতা।
মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল। মা দিবসে এমন এক ‘নায়কের’ গল্প আমাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
(Today, on Mother’s Day, I remember not just my mother, but an entire generation of women whose strength rarely entered history books, yet quietly shaped the lives of everyone around them.
My mother, Niva, never went to school. Yet she understood life, dignity, sacrifice, and education more deeply than many highly educated people ever do. She made sure her children studied. She encouraged and helped many other children too, quietly, without seeking recognition.
She lived through success and hardship, hope and disappointment, political highs and painful lows. When my father struggled in life and politics, she stood beside him with unwavering strength. When the future of her children seemed uncertain, she became courage itself.
And then came 1971.
During the Liberation War, her young son — our eldest brother — went to fight for Bangladesh. He was captured by the anti-liberation force. In those terrifying days, fear silenced many people. But not my mother.
A woman with no formal education walked into a dangerous political reality with nothing except a mother’s instinct, courage, arguments, determination, and human connection. She confronted a powerful anti-liberation political leader, negotiated, pleaded, argued, and fought in the only way a mother can fight when her child’s life hangs in the balance.
And somehow, against the odds, she brought her son back alive.
That was my mother.
Not loud. Not famous. But unbreakable.
She was like a banyan tree — deeply rooted, sheltering countless lives beneath her shade. Not only her own children, but many others found warmth, support, food, advice, and humanity in her presence.
Out of her six children, I was perhaps the most rebellious one. I crossed boundaries of culture and religion. I made choices many mothers from her generation might never have accepted. Yet after my father passed away, when she had the choice of where to stay, she chose us. She chose me.
That choice remains one of the greatest blessings of my life.
We spent ten beautiful years with her.
Then, slowly, peacefully, she began withdrawing into herself, almost as if she had made peace with life in its entirety. She wanted to return to the home she had built after marriage — not her father’s house, but the home she had transformed into her own universe.
I am grateful that I could rebuild that house the way she wanted. I named it after her: Niva Lodge.
And there, in the place she loved most, surrounded by familiarity, memory, and dignity, she left this world at 91. She had her meal. She spoke a few final words. Then she simply fell asleep.
Some deaths break you because they are cruel. Some leave you heartbroken because they are beautiful in their completeness.
Her life was not perfect. It was real. Full of sacrifice, endurance, contradictions, compassion, and grace. She carried the burdens of her generation, yet remained astonishingly humane, balanced, and accepting.
As her fifth child, I can say this without hesitation:
My mother was my hero.
Perhaps someday I will write a book about her. But today, on Mother’s Day, I simply want to say:
Thank you, Ma.
For your courage. For your forgiveness. For your resilience. For teaching us that true greatness does not always stand on stages or hold titles.
Sometimes true greatness quietly holds a family together through war, fear, loss, uncertainty, and love.
Happy Mother’s Day to every mother whose sacrifices may never fully enter history, but whose love shapes generations forever.)
ডক্টর সবুজ আহমেদ