ক্ষমতার দম্ভ বনাম নৈতিকতার দহন: শিক্ষক কি তবে সমাজের শেষ বলি? – প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী 

ড. দিপু সিদ্দিকী

শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের হাতিয়ার। কিন্তু সম্প্রতি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সাথে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর চরম অবমাননাকর আচরণ এবং পরবর্তীতে একজন সম্মানিত বিচারপতির বাসভবনে সেই শিক্ষককে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তা আমাদের বিদ্যমান ঘুণে ধরা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির এক কদর্য প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক পচন এবং বিচার ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

ক্ষমতার রাজনীতি ও মূল্যবোধের অবক্ষয়:

আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘পাওয়ার’ বা ক্ষমতা প্রদর্শনই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন রাজনীতি পেশিশক্তি আর বিত্তের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে। একজন কিশোর শিক্ষার্থী যখন দেখে তার পরিবার বা অভিভাবক ক্ষমতার এমন স্তরে আছেন যেখানে আইন বা নৈতিকতা তুচ্ছ, তখন সে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করে না। উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের সেই শিক্ষার্থী যা করেছে, তা কেবল কিশোর অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার সেই দম্ভের বহিঃপ্রকাশ যা সে তার চারপাশ থেকে শিখছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার ছাড়া এই মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। যেখানে গুণতন্ত্রের চেয়ে অনুগততন্ত্র বড়, সেখানে শিক্ষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ক্ষমতার প্রথম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনীতির মাপকাঠিতে শিক্ষকের মর্যাদা:

উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। জার্মানিতে একজন বিচারপতির চেয়েও একজন শিক্ষকের বেতন বা মর্যাদা কোনো অংশে কম নয়। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষকদের অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। অর্থনীতি যখন কেবল জিডিপি আর অবকাঠামোগত উন্নয়নে মত্ত থাকে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কারিগরদের উপেক্ষা করে, তখন সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যায়। শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন এবং উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না করলে মেধাবীরা এ পেশায় আসবে না। একজন শিক্ষক যখন অভাবের তাড়নায় বা সামাজিক অমর্যাদার ভয়ে তটস্থ থাকেন, তখন তিনি আর সমাজ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করতে পারেন না।

বিচার বিভাগ ও নৈতিক কাঠগড়া:

বিচারপতিরা হলেন আইনের অভিভাবক, ন্যায়ের প্রতীক। কিন্তু একজন বিচারক যখন নিজের সন্তানের অমার্জনীয় অপরাধকে আড়াল করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন শিক্ষককে নিজের বাসভবনে ডেকে হেনস্তা করেন, তখন বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। বাদশা আলমগীর তার পুত্রকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর আজকের আধুনিক বিচারক কি তার উল্টো উদাহরণ সৃষ্টি করলেন? বিচারক ও তাঁর সহধর্মিণীর এই ধৃষ্টপূর্ণ আচরণ বিচার বিভাগের প্রতি জনমানুষের আস্থাকে কেবল ক্ষুণ্ণই করে না, বরং এটি সমাজের প্রতি এক চরম বিদ্রূপ। একজন শিক্ষককে অপমান করা মানে গোটা জাতির বিচারবুদ্ধিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

 

প্রতিটি স্কুল হোক ন্যায়বিচারের প্রতীক:

আমরা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এক একটি ছোট সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখতে চাই। স্কুল হবে এমন এক স্থান যেখানে ন্যায়বিচার, সাম্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা চর্চিত হবে। যদি স্কুলেই ক্ষমতার জোরে অন্যায়কে চাপা দেওয়া হয়, তবে সেই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশের কর্ণধার হয়ে কী উপহার দেবে? শিক্ষক সমাজকে ঢেলে সাজানো আজ সময়ের দাবি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে যারা কেবল সিলেবাস শেষ করবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও আদব-লেহাজ শেখাবেন। কিন্তু তার আগে শিক্ষকদের সেই সুরক্ষিত পরিবেশ দিতে হবে যেখানে কোনো ‘প্রভাবশালী’ অভিভাবক এসে তাদের লাঞ্ছিত করার সাহস পাবে না।

শিক্ষক সমাজকে ঢেলে সাজানো ও রাজনৈতিক সংস্কার:

 

শিক্ষক সমাজকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি শিক্ষকদের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করেছে। শিক্ষা প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে শিক্ষকদের হাতেই শিক্ষার নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের এমন সুরক্ষা প্রদান করতে হবে যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে নির্ভয়ে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দাঁড়াতে পারেন।

 

উপসংহার:

উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের শিক্ষার্থীরা যে স্মারকলিপি দিয়েছে, তা আসলে একটি পচনশীল সমাজের বিরুদ্ধে তারুণ্যের আর্তনাদ। একজন শিক্ষককে অপমান করে কোনো জাতি উন্নতির শিখরে উঠতে পারেনি। আমরা যদি আজ এই বিচারপতির ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে ভবিষ্যতে কোনো মেধাবী মানুষ শিক্ষক হতে চাইবেন না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষকদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার। অন্যথায়, ফ্লাইওভার আর মেগাপ্রজেক্টের চাকচিক্য আমাদের নৈতিক কঙ্কালসার অবস্থাকে ঢেকে রাখতে পারবে না।

একটি সমাজ তখনই বাঁচে, যখন তার শিক্ষক মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আসুন, শিক্ষককে তাঁর প্রাপ্য আসনে বসিয়ে আমরা এক সুস্থ, সবল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ি।

লেখক: ডক্টর দিপু সিদ্দিকী কবি,গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক।

 

Share: