বিশ্ববিদ্যালয়ে চুল নিয়ে চুলোচুলি — জাঁ-নেসার ওসমান

Posted by: | Posted on: October 4, 2021

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে বিশ্ববিদ্যালয়। কত আশা নিয়ে আমরা সব তাকিয়ে আছি বাংলার এই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় একদিন ভারতের শান্তিনিকেতনের চেয়েও জ্ঞানগরিমায় প্রসিদ্ধি লাভ করবে। কাগজে-কলমে আর মানুষের মুখে মুখে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে।

কিন্তু বড় বেদনার সঙ্গে দেখলাম সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কাগজের প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করছে চুল কাটার এক ঘটনা নিয়ে! পরীক্ষার হলে ১৪ শিক্ষার্থীর চুল কেটে দিয়েছেন এক শিক্ষক। ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিক্ষিকা জোর করে চুল কেটে দেওয়ায় এক শিক্ষার্থী, রাগে-দুঃখে-অপমানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার এই চুল কাটার প্রতিবাদে অনশন ধর্মঘট করছেন। বিষয়টি দু-হাজার একুশ সালের জন্য এক ন্যক্কারজনক ঘটনাই বটে।

তবে ইতিহাসে চুল কাটা নিয়ে গোলমালের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বিশ্ব ইতিহাসেও নয়। ১৯৬৬ সালে চীনে যখন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে তুং ‘কালচারাল রেভিউলিউশন’-এর ডাক দিয়েছিলেন তখনো প্রচুর চীনা ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকের চুল কেটে দেওয়া হয়। তখন অপরিণত বয়স্ক কিশোর-তরুণদের গড়া রেড আর্মি ‘কালচারাল রেভিউলিউশনের’ নামে লাখ লাখ চীনা নাগরিকের চুল কেটে দিয়েছে। শুধু চুলই নয় ‘কালচারাল রেভিউলিউশনের’ নামে হাজার হাজার নাগরিকের গলাও কাটা হয়েছিল চীনে। প্রচুর শিক্ষকেরও চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল এবং শিক্ষকদের হত্যাও করা হয়েছিল। আর চুল কাটা নিয়ে তৎকালীন চীনে শত শত লোক আত্মহত্যাও করেছিলেন।

তাই বড় বেদনার সঙ্গে ভাবছি যে, যেই শিক্ষক চুল কাটলেন তিনি কোন ‘কালচারাল রেভিউলিউশনের’ জন্য ছাত্রদের চুল কেটে দিলেন? তাহলে তিনি কি বাংলার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের চুল কাটতে পারবেন? ওই শিক্ষকের হয়তো মনে হয়েছে, ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ’। ছাত্রদের তপস্যা হবে লেখাপড়া। ওরা ইচ্ছেমতো বড় চুলের টেরি কাটবে কেন? তার চিন্তাটা হয়তো ভালো, কিন্তু এই কি তার বহিঃপ্রকাশ? নরসুন্দরের মতো নিজেই নেমে গেলেন চুল কাটতে! ধিক!

এই যে আজকাল কিশোর-কিশোরীরা নানা কারণে ইউটিউবে ভাইরাল হচ্ছে, তিনি কি একবারও সে-সবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন? সোচ্চার হয়েছেন ধর্ষণের বিরুদ্ধে? কেউ একজন ফেইসবুকে তার মতামত ব্যক্ত করলে বাঙালি হয়ে বাঙালির গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে, লুটতরাজ করছে! কই তিনি বা তার সহকর্মী শিক্ষকরা তো কখনো এসব বিষয়ে প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছেন বলে মনে হয় না।

তাহলে হঠাৎ করে এই ছাত্রদের লম্বা চুলের ওপর কেন চোখ পড়ল? আর ওই শিক্ষকের এই চুল নিয়ে চুলোচুলি করা নিয়ে এখন ‘বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ’! তিনি শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মঙ্গলের জন্য বকাঝকা করতে পারেন। শাসন করতে পারেন। কিন্তু এটা কেমন আচরণ? রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক নিজেই বলেছেন, ‘আমার রাগ একটু বেশি’। কিন্তু রাগের প্রকাশ এভাবে করতে হবে? এই কি তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের মঙ্গল কামনার নিদর্শন? বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়াতে কীভাবে তা শিক্ষার্থীদের মঙ্গল বয়ে আনবে?

তিনি জানেন তো বাংলাদেশে কিছু কিছু গোষ্ঠী আছে যাদের বিরুদ্ধে কিছু বললেই ধর্মঘট! বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা ভেবে, আপস করা ছাড়া তখন আর কিছু করার থাকে না। এই যে কদিন আগে আমার জন্মস্থান চট্টগ্রামের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে প্রসবের সময় একটি বাচ্চা মারা যায়। তখন বাচ্চার বাবা কেবল তার সান্ত¡নার জন্য থানায় জিডি করেন যে নবজাতকের মৃত্যুর কারণটা তদন্ত করে জানানো হোক যে এটা কি স্বভাবিক মৃত্যু না কি কারও গাফিলতির ফল। পুত্রশোকে কাতর পিতা কিন্তু কারও বিরুদ্ধে নালিশ করেননি কেবল বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। ব্যস সঙ্গে সঙ্গে মৌচাকে ঢিল! সারা বাংলাদেশে ডাক্তারদের ধর্মঘট! প্রতিদিনের হাজার হাজার টাকার ভিজিটের লোভ ছেড়ে তারা ধর্মঘটের ডাক দিলেন। সারা বাংলাদেশে রোগী দেখা বন্ধ। চট্টগ্রামের শিশুটির জন্য রংপুরের শিশুটি চিকিৎসা পাচ্ছে না। বেচারা সিলেটের নবজাতকটি জানতেও পারল না ওর কী দোষ ও কেন সিলেটের ডাক্তারের চিকিৎসা পাবে না!! চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ডাক্তাররা লাগাতার প্রায় তিন দিন ধর্মঘট কনটিনিউ করছেন। কী আর করা, চট্টগ্রামের পিতাটি বাংলার হাজার শিশুর কথা ভেবে থানায় গিয়ে জিডি প্রত্যাহার করলেন। ডাক্তারদের ধর্মঘট শেষ, হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বাংলাদেশ।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক কি পারবেন এমনি ডাক্তারদের মতো সব শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী অন্যায়ভাবে ধর্মঘট করতে? তাই যদি পারেন তাহলে তিনি যত ইচ্ছে চুল কাটতে পারবেন! দেশে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বদলিতে লাখ লাখ টাকার উৎকোচের লেনদেন। এমপিওভুক্তিতে ক্যাশের ছড়াছড়ি। প্রধান শিক্ষকের পদ পেতে পনের লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক পারবেন কি এসবের বিরুদ্ধে সব শিক্ষককে নিয়ে এক হয়ে ধর্মঘটের ডাক দিতে?

তিনি কি পারবেন ই-ভ্যালির মতো হায় হায় কোম্পানিগুলোর সব লোকের চুল কেটে দিতে। কিছুই যদি না পারেন তাহলে হঠাৎ এই বালখিল্যতা কেন?

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফেইসবুকের আগ্রাসন, টিকটকের আগ্রাসন, কিছু কিছু জায়গায় নেশার আগ্রাসন। এসব কোনো কিছুরই সমাধানের চেষ্টা না করে এই শিক্ষিকা ছুটলেন চুল নিয়ে চুলোচুলি করতে! শিক্ষকদের উচিত একবার নিজেদের দিকে তাকানো। শিক্ষকের দায়িত্ব কী, সেটা একবার অনুধাবন করুন। এসব ভেবে সোজা নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে শিক্ষকের মূল কাজে নেমে পড়া উচিত এখন। মানুষ গড়ার কারিগরের এমন বালখিল্য ভুল মানায় না। ক্রোধ কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না। ক্রোধ ভুলে ছাত্রদের ভালোবাসতে শিখুন। ভালোবেসেই পারবেন ওদের ভালো করতে, মঙ্গল করতে।

লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক