সুষম পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভিত্তি তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধু : বিশ্লেষকবৃন্দ

॥ তানজিম আনোয়ার ॥
ঢাকা, ২৭ আগস্ট, ২০২১ (বাসস) : নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা বলেছেন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দূরদর্শিতা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত নীতির আওতায় বাংলাদেশ দৃশ্যত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি স্বতন্ত্র কৌশল অনুসরণ করে।
তারা বলেন, রাজনৈতিকভাবে দুই মেরুতে বিভক্ত বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু ‘জোট নিরপেক্ষ’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়া সত্ত্বেও এটি আজ পর্যন্ত কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে।
সম্প্রতি বাসসের সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা মধ্যে আকৃষ্ট হওয়া এড়াতে চেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সকল প্রধান শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক চেয়েছিলেন, তখন তার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এই কৌশলকে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন একটি ‘যাদুকরি’ নীতি বলে অভিহিত করেন যাতে তাঁর ‘অন্তর্নিহিত গুণ’ প্রকাশ পেয়েছে।
শোকের মাস আগষ্টে বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোমেন বলেন, আমরা এখনও এ নীতি অনুসরণ করছি এবং বজায় রেখেছি… তাঁর কন্যা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ও তাঁর নিজের বিচক্ষণতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করছেন… সব কিছুতে সফলভাবে ভারসাম্য বজায় রাখছেন।
মোমেন বলেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে ঢাকার সুসম্পর্ক সেই নীতির অন্যতম উদাহরণ। অন্যদিকে ঘনিষ্ঠ এই দুই প্রতিবেশী ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পটভূমিতে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখে চলেছে।
একজন অর্থনীতিবিদ ও পেশায় কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, বিশ্ব যখন পশ্চিমা ও সোভিয়েত ব্লকে সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত ছিল তখন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে আবির্ভূত হয় এবং এই বিভাজনের প্রভাব মুক্তিযুদ্ধের উপরও পড়েছিল।
একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মস্কোর সমর্থনের জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ব্লকে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু ‘জোট নিরপেক্ষ’ প্ল্যাটফর্ম বা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) অংশ হওয়ার পথটি গ্রহন করেন।
মোমেন বলেন, বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে ন্যাম এবং ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করেন যে, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ যার শান্তি বজায় রাখার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য কী প্রয়োজন তা অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছিলেন।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্থলসীমানা, পানি বন্টন এবং মৈত্রী চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিকটতম প্রতিবেশী এবং ১৯৭১ সালের মিত্র দেশ ভারতের সঙ্গে আলোচনায় তাঁর উচ্চ বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করেছেন।
মোমেন উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে দেশে ফেরার পরপরই বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেন তারা যেন দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য ফিরিয়ে নেন। বাংলাদেশ যে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ তা সমগ্র বিশ্বকে দেখানোর জন্য বঙ্গবন্ধু এটি করেছিলেন।
স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরেই চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরের মত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাধারণ সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন বিনা মূল্যে তাদের নেভাল-ডি-মাইনিং ইউনিট পাঠানোর প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করে।
সেই শীতল যুদ্ধের যুগে তাঁর দূরদর্শিতাপূর্ণ নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু উদ্ধার কাজ বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন- রাশিয়াকে চট্টগ্রাম বন্দর পরিষ্কার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, জাতিসংঘকে চালনা বন্দরে একই কাজ করতে দেয়া হয়েছিল।
মোমেন বলেন, বঙ্গবন্ধু এই সিদ্ধান্তের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনী বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করছে বলে কথিত অপপ্রচারণা নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন, যা বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভুত এবং ‘মূলত… তিনি যা করতে চেয়েছিলেন আমরা তা অনুসরণ করছি।
১৯৭৩ সালের মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. কামাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনকি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারকরণে বঙ্গবন্ধু খুবই বাস্তবসম্মত ছিলেন। যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন ছিল।
তিনি বলেন, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ভারতের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আলোচনার ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বলে ছিল যে, বড় প্রতিবেশীরই যে কোন বিষয়ে ছাড় দেওয়া উচিত।
ড. কামাল হোসেন তার ‘বাংলাদেশ: স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য আকাঙ্খা’ বইয়ে লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আর কেউ বেশি সচেতন ছিল না।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফখরুদ্দিন আহমেদ স্থলসীমানা চুক্তি সম্পর্কিত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনার বৈঠকের সাক্ষী হিসেবে তার লেখায় অভিন্ন বিবরণ দিয়েছেন।
আহমেদ লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ভারতীয় প্রতিনিধি দলকে বলেছিলেন (যার মধ্যে মিসেস গান্ধীও ছিলেন) ভারত একটি বড় দেশ এবং ভারত যদি এখানে বা সেখানে ভূখন্ডের কিছু অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য ছাড় দেয় সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আহমেদ আরো লিখেছেন, এই অসাধারণ মন্তব্যটি পুরো প্রতিনিধিদলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক শীর্ষ আমলা উল্লেখ করেন, সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর রাখতে সম্মত হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বারবার বলেছিলেন যে, আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে আমরা যেসব ক্ষেত্রে সীমান্ত চুক্তি করতে সম্মত হয়েছি সেখানে আমাদের গ্যাস বা তেলের কোন সম্ভাবনা নেই।
১৯৭১ সালের আরেকটি প্রধান মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়ে কামাল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে এই অঞ্চলের বাইরে মস্কোতে তার প্রথম সফর করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে দেন যে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষপাতী, বহুপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে নয়।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালে যখন বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান, তখন একটি প্রস্তাব ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে না গিয়ে তিনি যেন শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাবেন এবং ফিরে আসবেন।
হোসেন লিখেছেন, আমন্ত্রণটি অবশ্য এসেছিল এবং বঙ্গবন্ধু তা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন তিনি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে ভুলভাবে বাংলাদেশকে কালিমালিপ্ত করার জন্য তা ব্যাখ্যা করা হবে এই কথা বলে যে, বাংলাদেশ ছিল সোভিয়েত এবং ভারতীয় প্রভাবের অধীনে ।
বেইজিং-এর সঙ্গে স্বাভাবিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে অগ্রগতির জন্য বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাণিজ্যও শুরু করেছিলেন।
হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তার সবগুলোর লক্ষ্যই ছিল জোট নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করা, সকল প্রধান শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক খোঁজা এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্ত করার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া।
তিনি আরও লিখেছেন, লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা… এটি ছিল ১৯৭২ সালে, এবং তা আজও বজায় রয়েছে। এটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে পথ দেখানোর জন্য উদ্দেশ্যগুলোর সবচেয়ে বিচক্ষণ বিন্যাস।বাসস

Share: