Main Menu

মাদকাসক্ত শিশু-কিশোরদের শনাক্তে মাঠে নেমেছে ডিএমপি

মাহবুব বাশারঃ রাজধানীর মহাখালীতে ড্যান্ডি আসক্ত কিশোর গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আরিফে হোসেন (১৬) নামে এক কিশোর খুন হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানীতে ড্যান্ডি আসক্ত শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর মাদকাসক্ত পথশিশুসহ সব শিশু-কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিংসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে চার বিভাগে অন্তত ৪৭ শিশু-কিশোরকে এই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। যারা শিশু-কিশোরদের কাছে ড্যান্ডি (ঘাম) নামক মাদক বিক্রি করে তাদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১ জানুয়ারি ড্যান্ডি খাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মহাখালীতে আরিফ হোসেন (১৬) নামে এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রধান হামলাকারী জনিকে (১৭) গণপিটুনি নিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। এছাড়াও আরও এক কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ জানতে পেরেছে মহাখালী সাততলা বস্তিতে ড্যান্ডি খাওয়াকে কেন্দ্র করেই ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়।

বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আযম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত ড্যান্ডি ও মাদক নিয়ে বিরোধের জেরেই আরিফকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত দুই তরুণ ও দুই কিশোরসহ এখন পর্যন্ত চার জনকে গ্রেফতার করেছি। তবে কিশোর অপরাধী হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করছি না।’

এই হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম ঢাকার আট ক্রাইম বিভাগকে মাদকাসক্ত শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভাসমান মাদকাসক্ত পথশিশুদের আটক করে সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপরদিকে যাদের পরিবার রয়েছে তাদের কাউন্সেলিং করে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হবে। শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের জন্য পুলিশ পরিবারগুলোকে এই সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি যারা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনার পর ডিএমপির আটটি ক্রাইম বিভাগ কাজ শুরু করছে। এই আট বিভাগের মধ্যে মতিঝিল, গুলশান, মিরপুর ও রমনা এলাকায় মাদকাসক্ত শিশু-কিশোর বেশি। তবে সকল এলাকাতেই একযোগে এই উদ্যোগের কাজ শুরু হয়েছে।

গত ১ মাসে ডিএমপির লালবাগ বিভাগে মাদকাসক্ত সাত শিশু-কিশোরকে শনাক্ত করা হয়েছে, মিরপুর বিভাগে ৩৮ শিশু কিশোরকে কাউন্সেলিং করে পরিবারের  জিম্মায় দেওয়া হয়েছে, মতিঝিল বিভাগে একজন কিশোরের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, গুলশানে একটি হত্যার সঙ্গে জড়িত দুই কিশোরকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়াও রমনা, তেজগাঁও, উত্তরা বিভাগে পুলিশ মাদকাসক্ত শিশু কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে।

ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার এ বিষয়ে বলেন, ‘কমিশনারের একটি নির্দেশনা রয়েছে, মাদকাসক্ত পথশিশুদের চিহ্নিত করে সুস্থ বা সুপথে ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই অনুযায়ী প্রতিটি এলাকায় আমরা খোঁজ নিচ্ছি, মাদকাসক্তদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে আমাদের এলাকাতেও কয়েকজন শনাক্ত করা হয়েছে।’

ডিএমপির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি, স্টেশনে শিশু-কিশোররা দলবদ্ধ হয়ে নেশা করে। এরপর তারা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মূলত এসব শিশু-কিশোররা গাঁজা, ড্যান্ডি ও প্যাথিড্রিন নামক মাদকে আসক্ত। এসব মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এসব পথশিশুদের নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া না গেলেও কয়েকবছর আগে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডোলসেন্ট (এমএআরএ) নামের দুটি প্রতিষ্ঠান একটি জরিপ করেছিল। জরিপ অনুযায়ী, সারাদেশে চার লাখ ৪৫ হাজার পথশিশু আছে। এদের মধ্যে রাজধানীতেই তিন লাখেরও বেশি পথশিশু রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

যদিও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব পুলিশের না, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনের এই কাজ করার কথা। তবে অপরাধ দমনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পুলিশ এই কাজ করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘শিশু-কিশোররা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এদের আইনের আওতায় আনার চেয়ে জরুরি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংশোধন করা। ডিএমপি সেই উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে কাজ করবো।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. আহসানুল জব্বার বলেন,  ‘মাদকাসক্ত শিশু কিশোরদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আমরা যখনই এমন শিশু পাই, তখনই তাদের বিনা খরচে আমাদের নিরাময় কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। এই পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলমান। সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের এই কাজ চলবে। যারাই করুক না কেনও এটা ভালো উদ্যোগ। মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’






Related News