bb1

॥ আনিসুর রহমান ॥
ঢাকা, ৭ জুন, ২০২২ (বাসস) : বিশ্লেষকদের মতে, ভারতবর্ষ বিভাগের ২৬ বছর পর, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ছয় দফা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের গতিপথ দ্বিতীয়বারের মতো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্যয়ের পথ সুগম করে।
রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাও একই স্থান থেকে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, যেখান থেকে ১৯৪০ সালে আরেকজন মহান বাঙালি নেতা শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হক পাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাহসী হওয়া সত্ত্বেও ‘বাংলার বাঘের’ পক্ষে যেটা করা সম্ভব ছিল না, ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানের সেই কাজটাই শেখ মুজিবের জন্য রেখে দেয়।
বাসস এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুর রহমানের সাথে ছয় দফা দিবস সম্পর্কিত সম্প্রাতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মি. হকের জন্য কাজটি আকস্মিক কোন ঘটনা ছিল না এবং সেটা তাঁর জন্য কোন বিপদও ডেকে আনেনি। কিন্তু শেখ মুজিব যা করেছিলেন, সেটা তাঁর জন্য ছিল বিপদজনক। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে এর জন্য ফাঁসির ঝুঁকি নিতে হয়, আর ‘লাহোর শহরটি ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব শোনার জন্য যতটা প্রস্তুত ছিল, ১৯৬৬ সালে শহরটি কিন্তু ছয়-দফা শোনার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না।’ তবে এই বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তানী রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যে ‘বাঙালির মুক্তি’র জন্য একটি বিশাল ধাপ হিসেবেই আবির্ভুত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ছয়-দফা দাবি, অন্যদিকে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবটিকে ভারতীয় মুসলিমদের ‘মুক্তি সনদ’ হিসেবে মনে করা হয়।
এছাড়াও অধ্যাপক চৌধুরী দুটি প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটের মধ্যেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তা হোল, ‘মি. হকের প্রস্তাবটি তাঁর নিজের প্রস্তাবনা ছিল না। তিনি এটা পাঠ করেছেন মাত্র। কিন্তু ছয়-দফার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। বস্তুত, ছয় দফা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিজস্ব প্রস্তাবনা।’
ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক থেকে আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষক হওয়া চৌধুরী শের-এ-বাংলার প্রতিও যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শণ করে বলেন, এমনকি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহকেও হকের জনপ্রিয়তাকে স্বীকার করতে হয়েছিল এবং এজন্যই তিনি লাহোর প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য তাঁকে মনোনিত করেন।
চৌধুরী বলেন, শের-এ-বাংলার উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবটি সকলের কাছেই ‘স্বাভাবিক’ ছিল এবং একজন তরুণ মুসলিম লীগার হিসেবে শেখ মুজিবও অবশ্যই লাহোর প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন। এ সময়ে তিনি একথাও উল্লেখ করেন, ‘কিন্তু যখন শেখ মুজিব লাহোরে দ্বিতীয় (ঐতিহাসিক) প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন- সেই সময় তিনি একটি অত্যন্ত দুঃসাহসী কাজ করেন। তিনি এর মাধ্যমে নিজেকে একটি বিপজ্জনক পথে নিয়ে যান- এটা খুব, খুবই সত্য। তিনি (বঙ্গবন্ধ)ু ছাড়া এই কাজটি করার মতো আর কেউই ছিল না, প্রশ্নই ওঠে নি।’ তিনি বলেন, ছয়-দফা দাবি উত্থাপন না করা পর্যন্ত- বঙ্গবন্ধু তিনি সেই মাপের একজন নেতা হয়ে উঠতে পারেন নি। এর আগ পর্যন্ত তিনি অন্যান্য নেতাদের মতোই একজন নেতা ছিলেন। চৌধুরী বলেন, ‘শের-এ-বাংলাও কম সাহসী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানের এই কাজটি শেখ মুজিবুর রহমানের অপেক্ষায়ই ছিল।’
অপর এক বিশ্লেষক অধ্যাপক চৌধুরীর বক্তব্যের সম্পুরক হিসেবে ঢাকার পরিবর্তে বৈরীভূমি পাকিস্তানের রাজনৈতিক শহর লাহোরকে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপনের জন্য বেছে নেয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করছেনে। তিনি বলেন, ঢাকা তাঁর জন্য অনেক সুবিধাজনক স্থান ছিল। রাজনৈতিক ইতিহাসের এই বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মূলত পাকিস্তানীদেরকে তাঁর সাহস দেখাতে চেয়েছিলেন।’
হান্নান বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী নেতা খান আব্দুল কাইয়ুম খান বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা নিয়ে অগ্রসর হলে রক্তপাতের হুমকি দিয়েছিলেন বিধায় এটি উত্থাপনের জন্য বৈরী শহরকে বেছে নেয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাইয়ুম খান ছয় দফাকে পাকিস্তানের জন্য একটি হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন। বঙ্গবন্ধু কাইয়ুম খানের এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন। বাঙালিদের অধিকারের দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি আন্দোলনকে গতিশীল করার জন্য এটা জরুরি ছিল।
বঙ্গবন্ধু দৃশ্যত: খান আব্দুল কাইয়ুম খানকে লক্ষ্য করেই বলেছিলেন, ‘আমি প্রথমে ‘পেট-মোটা’ খান সাহেবদের ধরব এবং এরপর তাদের পেট ফুটো করবো। এরপর সরকারের প্রশাসনের অনিয়ম দূর করব।’