চালকল মালিকদের দৌরাত্ম্য। সরকারের অনুরোধ, হুঁশিয়ারি উপেক্ষা।দুর্বিষহ ভোক্তাজীবন

মাহবুব বাশার/প্রেসওয়াচঃ দেশের চালের বাজারে চালকল মালিকদের দৌরাত্ম্যে সরকারের কোনও উদ্যোগই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সরকারের আবেদন, অনুরোধ, হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে বাড়িয়ে চলেছে চালের দাম।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চালের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে দেরিতে হলেও সরকার আমদানি করা চালের শুল্ক কমিয়েছে। তারপরও গত এক সপ্তাহে এর কোনও প্রভাব পড়েনি বাজারে। উল্টো দাম বেড়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে (২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর) চিকন চালের দাম ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের পাইজাম ও লতাশাইলের দাম ১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫৩ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই দাম বাড়ার আগের দিন ২৭ ডিসেম্বর আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছিল।
রাজধানীর কোনাপাড়া বাজার, কাওরানবাজার, বাদামতলী বাজার, সূত্রাপুর, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, শ্যামবাজার, কচুক্ষেত, রহমতগঞ্জ, রামপুরা, মিরপুর-১, মৌলভীবাজার, মহাখালী, উত্তরা আজমপুর বাজারে খোঁজ নিয়ে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘মিলারদের কারণেই চালের দাম বেড়েছে। এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কারণ সরকারের মন্ত্রী এ তথ্য প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই ভারত থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে আমদানি করা ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল ১৯ ডিসেম্বর বন্দরে পৌঁছেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আরও এক লাখ টন চাল একই পদ্ধতিতে ভারত থেকে আসবে। ভারতের বাইরে অন্য যে কোনও দেশ থেকে চাল আমদানি করেও মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। আর এসব চাল সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হবে। এতে চালের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে নির্ভরযোগ্য সূত্র।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে আমনের উৎপাদনও ভালো হয়েছে। তারপরও কী কারণে বেড়েছে চালের দাম, এ প্রশ্নের উত্তরে সরকারের দেওয়া ভুল তথ্যকে দায়ী করেছেন মিলাররা।
মিলাররা জানিয়েছেন, ২০২০ সালে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করলেও এ তথ্য ঠিক নয়। তারা বলেছেন, ২০২০ সালে বন্যায় পানিতে ভেসে আসা পলির কারণে ধানের গাছ উর্বর হলেও উৎপাদন কম হয়েছে। প্রতি একরে ৪০ মণ ধান হওয়ার কথা থাকলেও এবছর ২৫ থেকে ২৬ মণের বেশি উৎপাদন হয়নি। এ কারণেই চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ হচ্ছে না।
সম্প্রতি ধানের দাম অতীতের অনেক বছরের তুলনায় বেশি। দেশের বিভিন্ন বাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হয়েছে ১২২০ টাকা দরে। যা আগে কখনও হয়নি।
এ বিষয়ে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, মিলারদের কারসজিতেই বেড়েছে চালের দাম। চালকল মালিকরা নানা কারসাজি করে বাজারে চালের দাম বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, চাল উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে তা মেটানোর জন্য সরকার ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানি করবে। সরকারি গুদামেও চাল কমে গেছে। গত বছর এই সময়ে সরকারি গুদামগুলোয় ১৩ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য থাকলেও এবার তা কমে ৭ লাখ টনে নেমেছে।
কৃষিমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মিলার, আড়তদার, জোতদারদের যারা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারা দাম বাড়ায়। এবারও তারা সেই কাজ করছে। এই মৌসুমের সময় এখনও তারা ধান কিনছে। ধানের দাম ও চালের দাম দুটিই তারা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি বছর দুই দফা বন্যার কারণে আউশ ও আমন ফলনের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান সরকারের হাতে আছে, তাতে চালের এত ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। এখনও বাজারে যথেষ্ট চাল আছে। তবু ৩২ থেকে ৩৩ টাকার মোটা চাল ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিষয়টি সম্পর্কে চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী জানিয়েছেন, ধানের দাম বেশি, তাই চালের দাম বেড়েছে। ধানের দাম বাড়লে কেউ কৃষককে দায়ী করে না, কিন্তু ওই কারণে চলের দাম বাড়লে সবাই মিলারদের দোষ দেয়।
তিনি আরও জানান, মন্ত্রীরা বলছেন গুদামে চাল নাই। উৎপাদনও কম হয়েছে। চাল আমদানি করা হচ্ছে সেই কারণে। আমরা বার বার এ তথ্য জানাতে চাইলেও কেউ শোনেনি। উল্টো আমাদের দায়ী করা হয়েছে গুজব ছড়ানোর জন্য। এবছর আমন ফলন ভালো হয়নি জেনেও সেটা জানায়নি সরকারের কেউ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সরকারের শীর্ষমহলকে এ বিষয়ে অন্ধকারে রেখেছে। আগেভাগে জানালে আগেভাগে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তখন এমন পরিস্থিতি হতো না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং টিসিবির তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে (২০১০-১১ অর্থবছর) প্রতি কেজি (মাঝারি মানের) চালের গড় দাম ছিল ৪১ টাকা, যা বর্তমান বাজারে ৬০ টাকা। গত অর্থবছরও (২০১৯-২০) প্রতি কেজি চালের গড় দাম ছিল ৫৬ টাকা। দেখা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত চালের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৪৬ টাকা। এরপর হঠাৎ করেই পরের বছর চালের দাম ৫৩ টাকায় ওঠে। পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দাম এক টাকা কমলেও এরপর দাম বাড়তেই থাকে।
তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর পরবর্তী বছরগুলোতে চালের দাম ছিল যথাক্রমে ৫৩ টাকা, ৫৫ টাকা, ৫৭ টাকা ও ৫৬ টাকা।
এদিকে কৃষি অধিদফতরের তথ্যমতে এক দশক আগেও দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৩৫ লাখ টন। যা এখন (২০১৯-২০ অর্থবছর) তিন কোটি ৮৭ লাখ টনে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর প্রতিবছর চালের উৎপাদন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টন করে বেড়েছে।

Share: