Main Menu

‘আলোর মুখ না দেখা’ ও মুক্তির অপেক্ষায় থাকা অনুদানের চলচ্চিত্র

 

ঢাকা: চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান নিয়ে সময়মতো কাজ শেষ না করায় ‘সরকারি সম্পত্তি তছরুপ (নষ্ট)’ করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় কবি ও নির্মাতা টোকন ঠাকুরকে। পরে ২ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন দেন আদালত। বাংলাদেশে সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্রে এই ঘটনা প্রথম নয়, এর আগেও এরকম ঘটনার বহু নজির রয়েছে। যারা টোকন ঠাকুরেরও আগে থেকে সরকারি অনুদান নিয়ে কাজ শেষ করতে পারেননি। বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছেন নির্মাণ কাজ। দুই দশক পর জমা দিয়েছেন এমন রেকর্ডও আছে। আবার অনেকেই অনুদানের অর্থ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যথেষ্ট নয় বলে ফেরতও দিয়েছেন।

সৃজনশীল নির্মাতা ও প্রযোজকদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছর থেকে চলচ্চিত্রে অনুদান দেওয়া শুরু করে সরকার। অনুদানের সে অর্থ আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী অনুদানের প্রথম অর্থ প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে ছবি নির্মাণ করতে হবে। কোনো কারণে নির্মাণে দেরি হলে প্রযোজক লিখিত আবেদন করে সময় বাড়াতে পারবেন।

তবে অনেকেই এই সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্র জমা না দেওয়ায় কঠোর হয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সাল থেকে অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা করেছে। কাউকে মৌখিকভাবে, কাউকে লিখিতভাবে বারবার নোটিশ করেছে। তবুও সন্ধান মেলেনি বেশ কিছু অনুদানের চলচ্চিত্রের।

দীর্ঘ সময় পর মুক্তি পাওয়া অনুদানের চলচ্চিত্র: 

১৯৭৬-৭৭ অর্থ বছরে সরকারি অনুদানে নির্মিত কবির আনোয়ারের ‘তোলপাড়’ চলচ্চিত্র মুক্তি নেওয়া হয় ১০ বছর পর।

পরিচালক মনিরুজ্জামান মনির ‘পদ্মা আমার জীবন’ ছবির জন্য ১১ লাখ টাকা অনুদান পান ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে। তিনি ছবিটি মুক্তি দেন ১৩ বছর পর, ২০০৮ সালে। এছাড়া শাহজাহান চৌধুরীর ‘উত্তরের খেপ’ মুক্তি পায় পাঁচ বছর পর, ২০০০ সালে।

মাসুম আজিজ ‘সনাতন গল্প’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম কিস্তিতে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পান ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে। দীর্ঘদিন তিনি ছবিটি নির্মাণ না করায় তথ্য মন্ত্রণালয় তাকে অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তিনি তখন অনুরোধ করে দ্বিতীয় কিস্তিতে সাড়ে ৪ লাখ পান। তখন মন্ত্রণালয় তাকে ২০১৫ সালের ২২ জুনের মধ্যে ছবি শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের অক্টোবরে ২২ বছর পর ছবিটি মুক্তি দেন।

এখনো মুক্তি না পাওয়া অনুদানের চলচ্চিত্র:

সারাবাংলা প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে জানা গেছে, সরকারি অনুদান নিয়ে নির্মিত অনেক চলচ্চিত্রই নির্দিষ্ট সময় মুক্তি পায়নি। অনেকে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় সময় বাড়িয়ে নিয়েছে, অনেকে কাজই শেষ করেননি। যেমন-১৯৭৬-৭৭ অর্থ বছরে প্রখ্যাত নির্মাতা বেবি ইসলাম ‘মেহের জান’ ছবির জন্য আড়াই লাখ টাকা অনুদান পান। তবে তার নির্মিত ছবিটি সেন্সরে জমা দেওয়া হয়নি এবং কোথাও মুক্তি পায়নি।

১৯৮২-৮৩ অর্থ বছরে ‘ডাক দিয়ে যাই’, ‘ফুলমতি’, ‘পেনশন’ ও ‘উদয় তারা’ ১ লাখ টাকা করে অনুদান পায়। পরিচালক ইসমাইল মোহাম্মদের মৃত্যুর পর ‘ডাক দিয়ে যাই’ ও মাসুদ করিমের মৃত্যুর পর ‘ফুলমতি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়।

নায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জল ‘উদয় তারা’র জন্য ১ লাখ টাকা অনুদান পেলেও ছবি জমা দেননি, টাকাও ফেরত দেননি। এছাড়া রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘পেনশন’ মুক্তির পর ১৯৮৪ সালে ছবিটিকে নিষিদ্ধ করে সরকার।

এনামুল করিম নির্ঝর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১৬ লাখ টাকা অনুদান পান ‘নমুনা’র জন্য। যথাসময়ে নির্মাণ করে ছবি জমা দিলেও সেন্সর বোর্ড ছবিটি আটকে দেয়।

২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে জুনায়েদ আহমেদ হালিম ১৬ লাখ টাকা অনুদান পান ‘স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের কাল’ ছবির জন্য। কিন্তু তিনি নির্মাণ শেষ করতে না পারায় তথ্য মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

২০০৯-১০ অর্থ বছরে ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান পান পরিচালক আখতারুজ্জামান ‘সূচনারেখার দিকে’ ছবির জন্য। তবে তিনি ২০১১ সালের আগস্টে মারা যাওয়ার পর ২০১৪ সালে ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পেলেও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি চলচ্চিত্রটি।

২০১০-১১ অর্থবছরে ২৪ লাখ টাকা করে অনুদান পাওয়া ফারুক হোসেনের ‘কাকতাড়ুয়া’ এখনো মুক্তি পায়নি। পরিচালকের দাবি ছবির কাজ শেষ, খুব শিগগিরই এটি মুক্তি পাবে।

মারুফ হাসান আরমান ‘নেকড়ে অরণ্য’ জন্য ২০১১-১২ অর্থ বছরে ৩৫ লাখ টাকা পান। কিন্তু ছবি নির্মাণ না করায় তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় মামলা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রথম কিস্তির টাকা গ্রহণ করেছেন এবং সে টাকায় জমি কিনেছেন।

অন্যদিকে শিশুতোষ ছবি ‘একা একা’ ছবির জন্য ৩৫ লাখ টাকা পেলেও শারীরিক সমস্যার কারণে নির্মাণে অপারগতা জানান সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি। পরে মন্ত্রণালয় তাকে স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণের পরামর্শ দেন।

২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৫ লাখ টাকা অনুদান পান নার্গিস আকতার। তার বিরুদ্ধেও মামলা করেছে মন্ত্রণালয়। তবে তিনি জানিয়েছেন, ‘যৈবতি কন্যার মন’ ছবির কাজ মোটামুটি শেষ করে এনেছেন। মন্ত্রণালয়কে তিনি তা জানিয়েছেনও। খুব শিগগিরই ছবিটি মুক্তি দেবেন।

২০১২-১৩ অর্থবছরে ‘কাগজের ফুল’ ছবির জন্য ৩৫ লাখ টাকা অনুদান পান তারেক মাসুদ। কিন্তু ২০১৩ সালের ২২ মে প্রথম কিস্তির পান।পরবর্তীতে তার সহধর্মিনী ক্যাথরিন মাসুদ অর্থ ফেরত দিতে চাইলে ছবিটি শেষ করার অনুরোধ করে মন্ত্রণালয়। এখনো ছবিটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি।

অন্যদিকে একই বছর ‘কাঁটা’র জন্য অনুদান পান টোকন ঠাকুর। সময়মত ছবি নির্মাণ করতে না পারায় মন্ত্রণালয়ের মামলায় ২৫ অক্টোবর গ্রেফতার হন তিনি। যদিও তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তার দাবি তিনি মাত্র ১০ লাখ টাকা পেয়েছেন। কিন্তু ছবি নির্মাণে ইতোমধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অল্প কিছু টাকা পেলে তিনি পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ শেষ করতে পারবেন।

‘আলোর মুখ না দেখা’ ও মুক্তির অপেক্ষায় থাকা অনুদানের চলচ্চিত্র

২০১৩-১৪ অর্থবছর ৩৫ লাখ টাকা অনুদান পাওয়া ড্যানি সিডাক পরিচালিত ‘কাসার থালায় রূপালি চাঁদ’ এখনো মুক্তি পায়নি।

এন রাশেদ চৌধুরী ২০১৪-১৫ সালে ‘চন্দ্রাবতী কথা’ ছবির জন্য অনুদান পেয়েছেন। ছবি শেষ হলেও মুক্তি দিতে পারেননি। অন্যদিকে একই বছর অনুদান পাওয়া ‘বিউটি সার্কাস’-এর শুটিং শেষ করতে পারেননি । একই বছরের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ ছবির বর্তমানে শুটিং চলছে। নরুল আলম আতিকের পরিচালনায় ছবিটির প্রযোজক মতিয়া বানু শুকু।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা করে অনুদান পাওয়া কামার আহমেদ সাইমনের ‘শিকলবাহা (প্রথমে নাম ছিল ‘শঙ্খধ্বনি’)’ এখন শুটিং শেষ হয়ে পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছে। একই বছরে পান্থ প্রসাদ পরিচালিত ‘সাবিত্রী’ ও স্বপন চৌধুরী পরিচালিত ‘বৃদ্ধাশ্রম’ ছবি দুটি শেষ হলেও মুক্তি পায়নি।

এছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অনুদান পাওয়া অধিকাংশ ছবিই এখনো পর্যন্ত মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনুদানের টাকা ফেরত:

১৯৮৪-৮৫ অর্থ বছরে ‘অচেনা বন্দর’ চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়। অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ টাকা। এই টাকা ছবি নির্মাণের জন্য অপ্রতুল জানিয়ে অর্থ ফেরত দেন পরিচালক শমশের আহমেদ।

এরপর ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে ‘পথ বেঁধে দিল’ ছবির জন্য মোস্তাফিজুর রহমান সাড়ে ১১ লাখ টাকা অনুদান পান। কিন্তু তিনি ছবি না বানিয়ে টাকা ফেরত দেন।

লেখক-জাঁ-নেসার ওসমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমাজচিন্তাবিদ ।

১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে ইসমাইল হোসেন ‘চোখের মনি’ ছবির জন্য পাওয়া অর্থও পর্যাপ্ত না হওয়ায় গ্রহণই করেননি।

১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে ১৫ লাখ টাকা করে অনুদান পাওয়া তিনটি ছবির মধ্যে জাঁ নেসার ওসমান ‘জননী’ এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ‘নিষিদ্ধ লোবান’ ছবির জন্য পাওয়া অর্থ গ্রহণ করেননি। পরে অবশ্য ‘গেরিলা’ নামে একই কাহিনিতে বাচ্চু ছবি বানান। যেটি ২০০৯-১০ অর্থবছরে অনুদান পায়।

২০০০-০১ অর্থবছরে ‘তাহাদের কথা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য রেজানুর রহমান সাড়ে ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পান। তিনি প্রথম কিস্তির ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার চেকও পান।  কিন্তু ১৪ বছরেও ছবি নির্মাণ করতে না পারায় ২০১৫ সালের নভেম্বরে চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেন।






Related News