Main Menu

ওএমএসে প্রথমবারের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ চাল দিচ্ছে বাংলাদেশ

ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি দিয়ে নিম্ন-আয়ের লাখ লাখ মানুষকে চাল সরবরাহ করে আসছে।
যাই হোক সোমবার ওএমএস কার্যক্রমের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় হাজার হাজার দরিদ্র পরিবার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোনেট্রিয়েন্টস ভিটামিন এ, ভিটামিন বি ১, ভিটামিন বি ১২, ফলিক এসিড, আয়রন ও দস্তায় সমৃদ্ধ স্বল্প মূল্যের চালের সরবরাহ পাবে।

ফর্টিফাইড রাইস বা পুষ্টিসমৃদ্ধ এ চাল সাধারণ চালের সঙ্গে ১:১০০ অনুপাতে মেশানো হয়।

নিয়মিত ওএমএস হচ্ছে সরকারের একটি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি, যা বাজার মূল্য স্থিতিশীল করতে এবং স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য যখন বছরজুড়ে ভর্তুকি মূল্যে চাল বিক্রি করে।

অন্যদিকে, নতুন উদ্যোগের আওতায় তাৎক্ষণিক ব্যবহারের উপযোগী চাল সরবরাহ করা হবে। এটি ব্যাপক আকারে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-এর ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

সুরক্ষিত এই চালগুলো দেখতে সাধারণ ভাতের মতো। এর রন্ধনপ্রণালী ও স্বাদও একই রকম। তবে এটি ছয়টি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ। জনসংখ্যার যে দরিদ্র অংশটি মাছ, মাংস, ফলমূল ও অন্যান্য খাবারের সংস্থান করতে না পারায় অপুষ্টিতে ভোগে এটি মূলত তাদের জন্য।

ভিটামিন ও খনিজ ঘাটতিকে বিশ্বব্যাপী সাত শতাংশ রোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর শীর্ষ ১০টি কারণের মধ্যে আয়রন, ভিটামিন এ এবং জিঙ্কের ঘাটতির মতো কারণগুলোও রয়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কর্মকর্তারা সোমবার ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের ডব্লিউএফপি আনুষ্ঠানিকভাবে ওএমএসে উৎকৃষ্ট মানের এ চাল অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রকল্পের আওতায় এই চালের দাম বাজার দরের চেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ কেজি করে চাল সংগ্রহ করতে পারবে। কেজি প্রতি দাম ধরা হয়েছে ৩০ টাকা করে। এর আওতায় প্রতিটি পরিবার মাসে গড়ে ২০ কেজি চাল কিনতে সমর্থ হবে। এক লাখ ৪৪ হাজার পরিবারের প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার মানুষ এই ওএমএস থেকে উপকৃত হবে।

সোমবার থেকে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১২০টি কেন্দ্রে সপ্তাহে ছয় দিন বাছাইকৃত এ চাল বিক্রি করা হবে। বাছাইকৃত দোকানগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ চাল পাওয়া যাবে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছেন যে, জাতিসংঘের সংস্থাটি ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে ফর্টিফাইড রাইস বা পুষ্টিসমৃদ্ধ এ চালের বিতরণ নিশ্চিত করতে আগ্রহী। এটি খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা এবং খাদ্যতালিকায় পুষ্টির অভাব রয়েছে এমন দুর্বল পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেবে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রিচার্ড রাগান বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দরিদ্রদের, বিশেষত দ্রুত নগরায়ণকরণের অঞ্চলে বসবাসকারীদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। বৈচিত্র্যময় এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব বাংলাদেশে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং অপুষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ।’

খাদ্য বিভাগ ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, তারা অক্টোবরের শেষ নাগাদ ঢাকায় ওএমএসের অধীনে চাল বিতরণ  কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। প্রয়োজনে বর্তমান মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনায় এই কর্মসূচি অক্টোবর পরও আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে।

খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সরোয়ার মাহমুদ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রিচার্ড রাগান ও ঢাকা রেশনিংয়ের চিফ কন্ট্রোলার মো. জাহাঙ্গীর আলম সোমবার (১০ আগস্ট) ঢাকার মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল (এনআই) এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন (জিএআইএন) এই কর্মসূচিতে পুষ্টিসমৃদ্ধ এ চাল ব্যবহারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

সরকারের খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক সরোয়ার মাহমুদ বলেন, কোভিড-১৯ সংকটের মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে আপস করতে হচ্ছে। ফর্টিফাইড রাইস বা পুষ্টিসমৃদ্ধ এ চাল তাদের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের যোগান দেবে।

তিনি বলেন, শহুরে স্বল্প আয়ের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় তাদের কাছে পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে এটি একটি সাশ্রয়ী উদ্যোগ।

প্রথম চালু হয় ২০১৩ সালে

মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ পুষ্টিকর এ ধান ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কুড়িগ্রামে চালু হয়েছিল। ওই উদ্যোগ ছিল মূলত পরীক্ষামূলক।

পুষ্টি চাল নামে পরিচিত এই চালটিতে ভিটামিন এ, বি ১ এবং বি ১২ এবং ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও দস্তার মতো উপাদান রয়েছে।

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) এর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চুক্তি রয়েছে। এতে দুইটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশে এ চাল চালুর বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ওই দুই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হচ্ছে ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) এবং ভালনারেবল গ্রুপ ডেভলপমেন্ট (ভিজিডি)।

এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রামের তিন হাজার পরিবারের অতি-দরিদ্র নারীদের প্রথমে এ চাল সরবরাহ করা হয়েছিল। পরে সাতক্ষীরায় আরও ছয় হাজার পরিবার ভিজিডি এবং ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় তাদের মাসিক খাদ্য স্থানান্তরের অংশ হিসাবে এ চাল পেয়েছিল।

সাধারণ চালে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টে কম থাকে। এটি মূলত শর্করার উৎস। তবে পুষ্টি চাল বিশেষ করে ক্ষুধা লুকানো মানুষের পুষ্টিবর্ধনের জন্য একটি বড় সুযোগ। কেননা, এ ধরনের লোকজনের শরীরে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (ভিটামিন ও খনিজ)-এর ঘাটতি তৈরি হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের লোকজন প্রায়ই পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালোরি খেয়ে থাকেন। তবে তাদের প্রাথমিক ডায়েটগুলো তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সুইস প্রতিষ্ঠান ডিএসএম নিউট্রিশনাল প্রোডাক্ট পুষ্টি চালের জন্য জাতিসংঘের সংস্থাটির কৌশলগত পদ্ধতিকে সমর্থন জানিয়েছিল। তারা বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে সামাজিক সুরক্ষার নেটওয়ার্কগুলোতে এ চাল অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াসে যুক্ত হয়েছে।

ডাচ মাল্টিন্যাশনাল রয়্যাল ডিএসএম এনভি-এর সহযোগী ডিএসএম নিউট্রিশনাল প্রোডাক্টস, আরেকটি সুইস প্রতিষ্ঠান বুহলার-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে ২০০৭ সালে নিয়মিত চালের সঙ্গে পুষ্টিকর চালের মিশ্রণের জন্য চীনে উক্সি নিউট্রি রাইস কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেছিল।






Related News