২৪ জুলাই বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণআন্দোলনটি হাজারো ছাত্র জনতার প্রান দিয়ে রচিত হয়েছে, যা দেশ থেকে বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল। এই আন্দোলন শুধু একটি মুহূর্তের প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের আহ্বান ছিল। দ্রব্যমূল্য সহনীয় করার দাবি, সামরিক ব্যয় হ্রাসের প্রত্যাশা, এবং সব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু ৪৮ দিনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরেও সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগজনক। বৈষম্যহীন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য থেকে দেশটি অনেক দূরে রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আজ রাজনৈতিক অপতৎপরতা ও দুর্নীতির কারণে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে হাজারো তরুণের জীবন বলিদান দেওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতিবাজদের বিচার বা অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ উদ্ধার করার মতো কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
আন্দোলনকারীরা চেয়েছিল যে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার জন্য আপ্রাণ লড়াই করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে শৃঙ্খলার পরিবর্তে দুর্বিষহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপতৎপরতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই বিস্তৃত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি দেশের শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা এবং অর্থনীতিতে পড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করাও এই অপতৎপরতার একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দিকেও তেমন কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। আন্দোলনে নিহত ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, আর মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকছে। সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও ন্যায়বিচারভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ক্ষমতা লিপ্সা বাড়ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের ইতিহাসে দেখানো হয়েছে যে, সাম্য ও স্বাধীনতার জন্য প্রচেষ্টাগুলি অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত স্বপ্নগুলো কি অধরাই থেকে যাবে?
বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন মুগ্ধ, আবু সাঈদ, এবং তফাজ্জলদের মত হাজারো তরুণ দেখেছিল, সেই স্বপ্ন কি শেষমেশ বাস্তবায়িত হবে? আন্দোলনের আলোয় উত্তেজিত জনগণ এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় থাকলেও, তা বাস্তবায়নের কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।
বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও বাংলাদেশে এ আন্দোলনের উল্লেখ পাওয়া গেছে, তবে সেগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতির বিষয়ে আলোকপাত করেছে। আল-জাজিরা ও বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে জনগণের হতাশা এবং নেতাদের দায়িত্বহীনতার বিষয়গুলি উঠে এসেছে।
তাহলে কি মুগ্ধ, সাঈদদের স্বপ্ন ক্ষমতালিস্পুদের ধাঁধায় স্বপ্নই থেকে যাবে?
লেখক:ডক্টর মুহম্মদ আবু বকর সিদ্দিক,
ড . সিদ্দিকী নামে পরিচিত। সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক।