মাওয়া ঘাট অলস ঘুমাচ্ছে, ব্যস্ত পদ্মা সেতু

দিপু সিদ্দিকী

কাকডাকা ভোর। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে সূর্যিমামা আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছে। খেলছে মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা। বাস স্টপেজে অলস পড়ে রয়েছে ব্যস্ত বাসগুলো। নেই কুলিদের হাঁকাহাঁকি, যাত্রীর ব্যস্ততা।

হুইসেল বাজিয়ে ঘাটে ভিড়ছে না বা দূর গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে না কোনো লঞ্চ বা ফেরি। ঘাটে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্টেও নেই হাঁকডাক। চিরচেনা ব্যস্ত মাওয়া ঘাট এখন অতীত!

অথচ এই ঘাট সকাল কি সন্ধ্যা ২৪ ঘণ্টাই জনাকীর্ণ থাকত। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতো যানবাহনের সারি। ক্লান্ত চোখগুলো জেগে থাকত লঞ্চ বা ফেরির অপেক্ষায়।

No description available.

মাওয়া ঘাটে যাত্রীর অপেক্ষায় বসেছিলেন অটোরিকশাচালক আসাদ। কোনো যাত্রী না পাওয়ায় হতাশ। তিনি জানান, অন্যদিন বসে থাকা লাগত না। সবসময়ই যাত্রীদের আনাগোনা থাকত। পদ্মা সেতু খুলে দেয়ায় আজ কোনো যাত্রী নেই।

যাত্রী নেই, এখন কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কী আর করা; অন্য কোনো রুটে চালাব।

ঘাটের রেস্টুরেন্টে নেই কোনো খরিদ্দার। তবুও খরিদ্দারের আশায় দোকান খুলে আছেন তারা। লঞ্চঘাটে ভিড়লেই কে কার আগে খরিদ্দার বাগাতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা চলতো। আজ তার কিছুই নেই।

অলস বসে থাকা রুস্তম নামে এক রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার বলেন, আমাদের দিন শেষ হতে চলল। আগের সেই জৌলুস আর থাকবে না। তবে, সন্ধ্যার পর হয়তো টুরিস্টের ভিড় বাড়তে পারে।

শনিবার (২৫ জুন) বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই অবসান হয়েছে দীর্ঘ ভোগান্তি আর যানজটের। প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন দেশের বৃহত্তম এবং পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ এই সেতুটি।

অনেক মূল্যে পাওয়া পদ্মা সেতু এখন উৎসবমুখর। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, রোববার (২৬ জুন) সকাল ৬টায় সেতু খুলে দেয়া হয় যান চলাচলের জন্য। গাড়িগুলো ভোর রাত থেকেই জমা হতে থাকে পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজায়।

No description available.

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর আজই সেতু পার হওয়ার অনুমতি মেলে সর্ব সাধারণের। আর তাই উদ্বোধনের দিনে সেতুতে চড়তে না পারার আক্ষেপটা আজই পূরণ করে নিচ্ছেন অনেকে। পদ্মা সেতু ঘিরে মানুষের মধ্যে যে অন্যরকম আবেগ কাজ করছে, সেটা আজও চোখে পড়ে।

সকাল থেকেই অন্যান্য গাড়ির চেয়ে বেশি ছিল মোটরসাইকেল। অনেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু চড়ার জন্য। টোলপ্লাজায় টোল পরিশোধ করে ফাঁকা জায়গা দেখে অনেকেই মোটরসাইকেল রেখে নেমে পড়ছেন। নিজেকে ফ্রেমবন্দি করছেন। তেমনই একজন রুপম ইসলাম। তিনি এসেছেন তার বান্ধবীকে নিয়ে।

তিনি বলেন, শনিবার এসেছিলাম কিন্তু অনুমতি না থাকায় সেতুতে উঠতে পারিনি। তাই আজ ভোররাতেই বের হয়েছি। সেতু পার হয়ে জাজিরা প্রান্তে গিয়ে আবার ঢাকা ফিরব।

ঢাকা থেকে এসেছেন সরকারি কর্মকর্তা শাহীন ইসলাম। তিনি শরীয়তপুরে যাচ্ছেন ব্যক্তিগত কাজে। কাজ শেষে দু-একদিন পর ঢাকা ফিরবেন।

তিনি বলেন, আমি যাচ্ছি শরীয়তপুরে। দেশের বাইরে যাব, এ কারণে এনওসি প্রয়োজন। সেটাই আনতে যাচ্ছি।

পদ্মা নদী পার হয়েই রাজধানীতে আসতে হয় দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের। এত দিন সেতু না থাকায় ফেরি পারাপারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ভোগান্তি মাড়িয়ে আসতে হয়েছে ঢাকায়। এ ছাড়া পণ্যপরিবহনে ভোগান্তির সীমা নেই এ অঞ্চলের মানুষের। এবার পদ্মা সেতু তৈরি হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দুঃখ ঘুচবে, সেই সঙ্গে পাল্টে যাবে জীবনযাত্রার মান- এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

Share: