ফিরে দেখা দেখা ২৩ বছর: যেভাবে থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আনা হয় বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদাকে    

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে যারা মূল ভূমিকা পালন করেছিল এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে যারা অংশ নিয়েছিল তাদের মধ্যে বজলুল হুদা একজন। এহেন ঘৃণ্য খুনিকে ১৯৯৮ সালে থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আনে বাংলাদেশ।

এই খুনিকে কীভাবে ব্যাংকক থেকে ফেরত আনা হলো সে গল্প এতদিন ছিল অজানা। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কখনোই এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে এ কাজে গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের।

 দুই শহিদ ভাইয়ের ছবি হাতে আকরামুল কাদের

কীভাবে ফেরত আনলেন? কারা তাকে সহায়তা করেছিল? থাই সরকারের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখতেন? বজলুল হুদার পালানোর পথটাও বা বন্ধ করলেন কী করে—এমন সব প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি তার মুখোমুখি হয়েছে বাংলা ট্রিবিউন। তিন পর্বের প্রথম পর্ব থাকলো আজ।

বয়স এখন ৮০’র মতো। তবু আকরামুল কাদেরের মনে আছে কীভাবে খুনিকে ফিরিয়ে আনা হয় দেশে।

দক্ষ নাবিকের মতো গোটা বিষয়টি পরিচালনা করেছিলেন তিনি। একদিকে থাই কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে ঢাকা। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গোপনীয়তা বজায় রেখেই সুচারুভাবে কাজটি করতে হয়েছে তাকে। এমনকি যেদিন বজলুল হুদাকে ফেরত আনা হয় সেদিনও হাতে গোনা কয়েকজন জানতেন বিষয়টি।

একনজরে আকরামুল কাদের

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বজলুল হুদাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় সদ্য রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আকরামুল কাদেরকে।

শহীদ পরিবারের সন্তান আকরামুল কাদের ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট সার্ভিসে (সিএসএস) যোগ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১৯৭০ সালে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন।

আকরামুলের আট ভাইয়ের মধ্যে দুজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন (এদের একজন বীর উত্তম)। আরেক ভাই আফসারুল কাদের চৌকস কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে থাকা আকরামুল কাদের আফগানিস্তান হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আকরামুল কাদের একমাত্র কূটনীতিক, যিনি বঙ্গবন্ধুর তিন খুনিকে ফেরত আনার চেষ্টা করেছেন। প্রথম জন থাইল্যান্ডের বজলুল হুদা, দ্বিতীয় জিম্বাবুয়েতে আব্দুল আজিজ পাশা ও তৃতীয় জন যুক্তরাষ্ট্রের রাশেদ চৌধুরী।

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আকরামুল কাদের

ঘটনার শুরু

১৯৭৫ সালের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করে সরকার। ওই সময় বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত অ্যাডভোকেট জুলমত আলি খানও ছিলেন। জুলাইতে তাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন ওই সময়কার বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক অনুবিভাগের মহাপরিচালক আকরামুল কাদের। এটি ছিল রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার প্রথম নিয়োগ।

আকরামুল কাদের বলেন, ‘ঘটনার শুরু হয় আমার নিয়োগের পরপরই। পরিষ্কার মনে আছে, নিয়োগের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিয়েছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে বজলুল হুদার প্রসঙ্গ আসে এবং তিনি আমাকে বলেন, বজলুল হুদা ব্যাংককের জেলে আছে। আপনি চেষ্টা করবেন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার।’

আমি ওনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে এটাই হবে আমার প্রথম কাজ।

 যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে

ক্লেপটোম্যানিয়াক বজলুল হুদা

থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি আগেই শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পরে বেশি দেরি করেননি আকরামুল কাদের। স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ ঢাকা ত্যাগ করেন। নভেম্বরে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আকরামুল কাদের থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই ওই বছরের জুলাই থেকে বজলুল হুদা জেলে ছিল। বজলুল ছিল ক্লেপটোম্যানিয়াক (কারণে-অকারণে যারা চুরি করে)। শপ-লিফটিং তথা দোকান থেকে চুরির অভিযোগে থাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। থাই কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট দূতাবাসে পাঠিয়েছিল এনডোর্সমেন্টের জন্য। ওই সময় কনস্যুলারের দায়িত্বে ছিলেন হানিফ ইকবাল (পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক হন)। হানিফ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি একটি অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু হাতে পেয়েছেন এবং তিনি তা ধরে রেখেছিলেন। কখনোই তিনি পাসপোর্টটি থাই কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেননি।

ঢাকায় যখন বিষয়টি জানানো হয়, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। তাদেরকে জানায় বজলুল হুদা কে, কী করেছে এবং কেন তাকে বাংলাদেশে খোঁজা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ১৯৭৫ সালে থাইল্যান্ডে দূতাবাস খোলে বাংলাদেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ দেশটিতে আকরামুল কাদেরের আগে দক্ষ কোনও কূটনীতিককে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়নি। এদিকে ৯০-এর দশকে থাইল্যান্ডে দ্রুত উন্নয়নও হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালে আর্থিক সংকটে পড়ে যায় দেশটি।

তিনি বলেন, ‘এমন এক প্রেক্ষাপটেই আমি থাইল্যান্ড পৌঁছাই।’

Share: