Main Menu

পোশাকে নারীবাদ: ব্যক্তি আক্রমণ ও আন্দোলন – বীথি সপ্তর্ষি

সম্প্রতি বাঙালি তথা বাংলাদেশি তথা নারীবাদী তথা প্রগতিশীলদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া টপিক বোরকা পরিহিত মায়ের ক্রিকেট খেলা নিয়ে দুটো বক্তব্য—
এক. এরকম একটা ছবিকে যারা কদর্য ভাষা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন তাদের জন্য মন থেকে করুণা। আপনারা যারা ‘স্বাভাবিক’ বা ‘আধুনিক’ বা ‘বাঙালি’ পোশাক পরেন, সেসব পোশাকে ক্রিকেট খেলেন তারা অলরেডি প্রিভিলেজড। আপনার পরিবার-সমাজ আপনাকে কোনও না কোনোভাবে এভাবে মেনে নিয়েছে। বলছি না, আপনার লড়াই করতে হয়নি। লড়াই ছাড়া কিছুই অর্জন করা যায় না। কিন্তু যে মেয়েটা লড়াই করতে পারেনি, লড়াই কী, কীসের জন্য লড়াই করবে জানেই না, নারী অধিকার-নারীর জীবন নিয়ে যার কোনও আন্ডারস্ট্যান্ডিং নাই, ‘আপনি নিজের জন্য কী করেছেন?’ প্রশ্ন করলে যে ইতিউতি তাকিয়ে প্রশ্ন বোঝার চেষ্টা করবে বা নিজের জীবন মানে যে শুধু স্বামী আর সন্তানের উপস্থিতিই বোঝে; তার জন্য আপনার নারীবাদ না? তার জন্য আপনার কোনও লড়াইয়ের দরকার নেই? তাকে প্রোটেক্ট করা, সামাজিক হয়রানি থেকে বাঁচানোর কোনও দায় আপনার নেই? নাকি আপনার ডিকশনারিতে যে নারীরা বোরকা পরে, বৃহত্তর লৈঙ্গিক রাজনীতির ‘ক্ষুদ্রতর ভিকটিম’ বলে তার জন্য কোনও সিম্প্যাথি নেই?

এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, প্রগতিশীল নারীবাদী গোষ্ঠী আর মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাওয়া এক। দুই পক্ষই চায় বোরকা পরিহিত সেই নারীকে অশ্লীল লাগছে যেহেতু, তার আসল জায়গা ঘর এবং একমাত্র ঘর। অথচ, যে মেয়েটা শৃঙ্খলিত। যার মাথায় জীবন মানে স্বামী-সংসার, জীবন মানে ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে ‘সংসার ধর্ম পালন করা’, যে পরিস্থিতি আছে, যে পোশাকেই আছে সেখান থেকে বের হয়ে সামান্য একটা ইচ্ছে পূরণ করলে আপনি তাকে মেনে নেবেন না? তাকে ঘরে ফিরে যেতে বলবেন? বলবেন, ধর্ম তাকে অ্যালাউ করে না? এ কেমন প্রগতির চর্চা? এ কেমন নারীবাদ!

দুই. বোরকা পরে রাস্তাঘাটে মেয়েরা ক্রিকেট খেললে, বাসে উঠলে, মঞ্চে উঠে গান করলে, অফিস করলেই দেশটা আফগান-তালেবান হয়ে যায় না! বরং, এই মেয়েরা ঘরে বসে জীবন শেষ করে দিচ্ছে না। এই মেয়েরা বাইরেও বের হচ্ছে। আফগান-তালেবানরা আর যাই করুক খেলার মাঠ আর মঞ্চে উঠবে না এটুকু বুঝতে আফগানিস্তান বা ইরানে যাওয়া লাগে না। জীবন বোঝা লাগে, পরিস্থিতি বোঝা লাগে, লড়াইয়ের বৈচিত্র্য বোঝা লাগে। টু বি অনেস্ট ক্রিকেটের কাপড়-চোপড় পরে ক্রিকেট খেলতে যাওয়া মেয়েটার গাটসের চেয়ে এই মেয়েটার গাটস কোনও অংশে কম নয়। টাইট-ফিটিং ওয়েস্টার্ন পরে রক বা হার্ড মেটাল গাওয়া মিলার চেয়ে বোরকা পরে মঞ্চে মেটাল রক গাওয়া সামিরার প্রাণশক্তি, গায়কী কোনও অংশে কম নয়।

নারী স্বাধীনতা সামগ্রিকভাবে সকল স্বাধীনতার কথা বলে। রামদা-চাপাতি, কাটা রাইফেল নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলে না। বরং সমালোচনা করতে হলে, এই রাষ্ট্রটিকে ধরেন। কেন আপনার রাষ্ট্রে নারীরা জড়সড় হয়ে ঘরের বাইরে বের হয়, কেন নিরাপত্তার কথা ভেবে গরমে ঘামতে ঘামতে মেয়েদের কাপড়-চোপড় আরও বাড়িয়ে পরতে হয়, রাত হলেই মাথায় কাপড় টেনে দিতে হয় যেন কেউ খারাপ মেয়ে না বলে সেই প্রশ্ন করেন। না করে, ইন্ডিভিজ্যুয়ালের জীবন, শখ, স্বপ্ন, হতাশা নিয়ে মজা নেওয়া বন্ধ করেন। নোংরামো বন্ধ করেন।

আমি চাই, মেয়েরা যে যেখানে যেভাবে আছে সে অবস্থা থেকে বের হয়ে আসুক। বোরকা পরে স্বামী সন্তান নিয়ে শিল্পকলায় নাটক দেখতে আসুক, বিকিনি পরে প্রেমিক নিয়ে সমুদ্রস্নানে যাক, হাফ প্যান্ট পরে বিকেলে বান্ধবীর সঙ্গে দৌড়াতে বের হোক, জোব্বা পরে প্রেমিকাকে নিয়ে সিনেপ্লেক্সে গিয়ে সিনেমা দেখুক। মোদ্দা কথা, বাইরের বিস্তৃত পৃথিবীটা না দেখলে মানুষ নিজে কী চায় তা বুঝবে না। সেটা বুঝতে হলেও এমনকি বিদ্যমান সমস্যা, শৃঙ্খল, দাসত্ব নিয়ে হলেও ঘর থেকে বের হতে হবে। মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে, আইডিয়া শেয়ারিং বাড়াতে হবে, মিডিয়ায় কথা বলতে হবে, ফটোশ্যুট করতে হবে, শব্দ তৈরি করতে হবে।

ঘরে বসে কেউ ব্যুভোয়া-ফ্রাইডেন হবে না। বিশ্বাস করি, এই ঝর্ণারাই একদিন ক্যারিয়ার আর সংসারের মধ্যে একটা পছন্দ করার মতো মানসিক শক্তি পাবে। বাপ-মা, প্রতিবেশী-আত্মীয় কী ভাববে ভাবনার ছাই উড়িয়ে নিজেরাও ডানা মেলে উড়ে যাবে। এটাই পরিবর্তন। এই পরিবর্তনটার জন্যই নারীবাদ। বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলন করতে হলে এই মডারেটদের সঙ্গে কনটেক্সচুয়ালাইজ করেই কাজ করতে হবে। শুধু গ্রহণ-বর্জন দিয়ে আর যাই হোক, নারীমুক্তি সম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক
bithysoptorshi@gmail.com






Related News