Main Menu

ইতিহাস পরিক্রমা।ত্রেতা হতে তাহেরপুরে মা দুর্গা- লীলা দাম মজুমদার

***কোন কোন কষ্ট মানুষকে তার সৃষ্টিতে সাহায্য করে। হোক সে ক্ষুদ্র বা বৃহৎ***
…লীলা দাম মজুমদার…
***শুভ মহালয়া***
***ত্রেতা হতে তাহেরপুরে মা দুর্গা***
তিনিই জগতের সমস্ত কারনের আদি কারণ…সমস্ত সৃষ্টির জননী স্বরূপা মহাশক্তি…তিনিই অসুর নাশিনী ভয়ঙ্কর রূপা চণ্ডী…রক্তাম্বরী মহাকালী…তিনিই আদ্যাশক্তির একাধারে নিরাকার…আবার শত সহস্ররূপা অধিষ্ঠিতা…নির্গুণ ব্রহ্মের গুণময়ী রূপ…সকল সৃষ্টির রক্ষাকারী…দুষ্টের দমনকারী…তিনিই সন্তান বাৎশলা আদিরূপা মহামায়া…তিনিই স্নেহময়ী জননী মহালক্ষ্মী…তিনি আমাদের সবার মা… ***মা দুর্গা***
ত্রেতা যুগে বিষ্ণু অবতার ভগবান রামচন্দ্র… রাবণের বধের জন্য… অকাল বোধনের মাধ্যমে মা মহামায়ার পূজা করেন।
হিন্দু ধর্মের সব চাইতে বৃহৎ পূজার অনুষ্ঠান হচ্ছে… শারদীয় উৎসব বা দুর্গাপূজা।
বাংলাদেশ…ভারত… এবং নেপালে বৃহৎ আকারে দুর্গাপূজা হোলেও ইংল্যান্ড…আমেরিকা…অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে এবং ৮৮৭ বঙ্গাব্দে রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর… মানব কল্যাণের জন্য…তথা সেই সময়ে অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে হিন্দু সমাজ রক্ষার্থে এই দুর্গাপূজা করেছিলেন।
রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার তাহেরপুরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে সর্ব প্রথম শারদীয় উৎসব পালন করেছিলেন এই রাজা বাহাদুর। সনাতন হিন্দু ধর্মের ইতিহাসে এক যুগান্তরকারী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। অসুর সদৃশ অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে… পরিত্রানের লক্ষ্যে মহামায়া দুর্গা পূজার এই আয়োজন… সেই সময়ে সৃষ্টি করেছিলো… কালের ধারা পরিবর্তনের এক মহা যজ্ঞ।
অতীত এবং বর্তমান কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এখনও বহমান… তাহেরপুরের এই বারাহী বা বারনই নদী। এই নদীর পূর্ব পারেই গড়ে উঠেছিল তাহেরপুর নামের এই প্রাচীন জনপদ বা এলাকা । এক সময়ে এখানেই রাজা কংস নারায়ণের রাজ্য শাসন চলতো। রাজা কংস নারায়ণের মৃত্যুর পরে আরও বেশ কয়েকজন রাজা এবং জমিদার এই ভূমি শাসন করেছেন… এই তাহেরপুর জমিদারীর মাধ্যমে ।
বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম তাহের ভুঁইয়া সদলবলে এসে মৌন ভট্টের কাছ থেকে ওনার রাজ্য জোড় পূর্বক দখল করে নেয়… এবং তার নিজের নাম অনুস্বারে এই এলাকার নাম করন করা হয়…*তাহেরপুর*। তাহের ভুঁইয়া ইংরেজদের খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে… ইংরেজরা যুদ্ধের মাধ্যমে তাহের ভুঁইয়াকে পরাজিত কোরে… তাহেরপুর রাজ্য মুক্ত করেন। বেশ কিছু সময় এই রাজ্য ইংরেজদের দখলে থাকে… তখন কংস নারায়ণ তাহেরপুর রাজ্যের যথোপযুক্ত খাজনা পরিশোধ করায়… ইংরেজরা খাজনার বিনিময়ে তাহেরপুরের দায়িত্ব কংসনারায়ণ রায়ের হাতে অর্পণ করেন।
তাহেরপুর রাজবংশ বাংলাদেশের প্রাচীন রাজবংশদের মধ্যে অন্যতম। এই রাজবংশের আদি পুরুষ ছিলেন মৌন ভট্ট। আর এই রাজ বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামন্ত রাজা ছিলেন… রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর।
সুলতানি আমলে মগেদের অত্যাচারে যখন সারা বাংলার শাসন ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে… তখন কংস নারায়ণ রায়… চট্টগ্রামে মগদের দমনের জন্য সুলতানি সালতানাতে পরাক্রমশালী বীর হিসাবে বিখ্যাত হন।।
কংস নারায়ণ রায়…পাঠান আমলে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ফৌজদারের ভূমিকা পালন করেন। আবার… মোঘল আমলে বাংলা বিহারের দেওয়ান হিসেবেও তিনি বলিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি রাজা উপাধি পান। মোঘল সম্রাট আকবর… কংস নারায়ণ রায় কে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। রাজা কংস নারায়ণ রায়ের কর্ম পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট হয়ে সম্রাট আকবর পরবর্তীতে ওনাকে সুবে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন।
যদিও তখন রাজা কংস নারায়ণ রায়ের যথেষ্ট বয়স হওয়াতে তিনি দেওয়ান এর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে… তাহেরপুরে ফিরে এসে মানব কল্যাণের জন্য নিজেকে ধর্মীয় এবং সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সমসাময়িক বাংলার হিন্দু সমাজে চিরো ভাস্বর হয়ে থাকার জন্য… তিনি এক মহাযজ্ঞ সাধনের জন্য আগ্রহী হলেন।
এই লক্ষ্যে তার পরগণার সমগ্র শাস্রজ্ঞ পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ব্যক্তি গণদের দরবারে আমন্ত্রণ জানালেন। দুর্গা পূজা করার ব্যপারে সবার মতামত চাইলে…পণ্ডিত রমেশ শাস্রী বলেন…
সনাতন হিন্দু ধর্মের শাস্র মতে… বিশ্বজিৎযজ্ঞ… রাজসূয়যজ্ঞ… অশ্বমেদযজ্ঞ… এবং গোমেধযজ্ঞ এই চার প্রকার মহা যজ্ঞের মধ্যে বিশ্বজিৎযজ্ঞ… রাজসূয়যজ্ঞ…কেবল মাত্র সার্বভৌম সম্রাটেরা করতে পারেন । অশ্বমেদযজ্ঞ… এবং গোমেধযজ্ঞ কলি যুগে নিষিদ্ধ। তাই দুর্গা পূজার যজ্ঞই… এই চার প্রকার যজ্ঞের ফল একত্রে প্রদান করার জন্য সক্ষম হতে পারে ।
উপস্থিত শাস্রজ্ঞ ব্যক্তি বর্গ সবাই পণ্ডিত রমেশ শাস্রির মতের সাথে একমত হন।
১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজা কংস নারায়ণ এর চতুর্থ পুরুষ… রাজা সূর্য নারায়ণের সময়… সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তাহেরপুর রাজ্য আক্রমন করেন এবং রাজপ্রাসাদ সহ সব মন্দির ভেঙ্গে গুরিয়ে দেন। রাজা কংস নারায়ণ ঐ সময়ে প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে যে সোনার দুর্গা প্রতিমা সহ মন্দির গড়েছিলেন… সেই সোনার প্রতিমা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন এই যুদ্ধে অনেক হতাহতও হয়।
পরবর্তীতে রাজা সূর্য নারায়ণের পুত্র লক্ষ্মী নারায়ণের মধ্যমে সব ঘটনা জানার পর সম্রাট আওরঙ্গজেব বারনই নদীর পশ্চিম পারে রাজা সূর্য নারায়ণ কে একটি পরগণা প্রদান করেন । রাজা সূর্য নারায়ণ সেখানেই পুনরায় স্থাপিত করেন ওনার নতুন রাজপ্রাসাদ ।
১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বীরেশ্বরের স্ত্রী রানী জয়সুন্দরী রাজবাড়ী সংলগ্ন দুর্গা মন্দির নির্মাণ করেন ।
১৯৬৭ সালে ঐ রাজ বাড়ীই কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। যা এখন তাহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নামে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচিত ।
দুর্গা মন্দিরের নাম ফলকটি *রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ১৯১০* (যাদুঘরে) সংরক্ষিত আছে।
রাজা শশীশেখরেশ্বের এর সময় থেকেই পরিবারের সবাই কোলকাতাতে বসবাস করা শুরু করেন। শুধু মাত্র দুর্গা পূজার সময়ে তিনি তাহেরপুরে আসতেন। ১৯২৭ সালের দুর্গা পূজাতে তিনি শেষ বারের মতো এসেছিলেন তাহেরপুরে । রাজা শশীশেখরেশ্বরের মৃত্যুর পরে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান শিব শেখরেশ্বের রাজ্যভার গ্রহণ করেন । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রজা বিদ্রোহ শুরু হয়… যে কারণে তিনি জমিদারী ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। শশীশেখরেশ্বরের দ্বিতীয় পুত্র প্রজা বিদ্রোহ দমন করে জমিদারী নিজের হাতে তুলে নেন। কিন্তু ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের পরে এই রাজ পরিবারের কোন রাজা বা কোন সদস্য… আর এই তাহেরপুর রাজ্যে ফিরে আসেনি।
***সমাপ্তি হোল এই বাংলায় এক ঐতিহাসিক ইতিহাসের***
সনাতন হিন্দু সমাজ বিভিন্ন সময়ে…বিভিন্ন ভাবে…বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা নিগৃহীত হয়েছে…
*********************************************************************
বহুকাল এই মন্দির পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে থাকে। ১৯৬৭ সালে এই রাজবাড়ী কে তাহেরপুর ডিগ্রী কলেজ এ রূপান্তরিত করা হয় ।
আমি যখন ২০১০ সনে তাহেরপুর রাজবাড়ীতে গিয়েছি তখন দেখেছি…বিশেষ কোন আড়ম্বর ছাড়াই… মাটির প্রতিমা দিয়ে খুব সাদামাটা ভাবেই দুর্গাপূজা উজ্জাপন করা হয়… ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা এই তাহেরপুর রাজবাড়ীর মন্দিরে ।
যদিও বর্তমানে…২০১৮ সালে ১১ই অক্টোবর মাননীয় এমপি (সাংসদ…রাজশাহী চার আসনের বাঘমারা এলাকার) প্রকৌশলী জনাব এনামুল হক… বাইশ লক্ষ টাকা ব্যয় করে অষ্টধাতুর প্রতিমা তৈরি করে দিয়েছেন। অষ্ট ধাতুর এই প্রতিমাতে আছে… ব্রঞ্চ… তামা… টিন বা রাংতা… দস্তা… সোনা… রূপা… লোহা… এবং সীসা…
আমার ধারণা সনাতন হিন্দু ধর্মের অনুসারী সবাই মাননীয় সাংসদ… প্রকৌশলী জনাব এনামুল হক… সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন । বিশেষ করে আমি ব্যক্তিগত ভাবে ওনাকে সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি… এই কারণে… কালের বিবর্তনে ইতিহাসের স্বাক্ষী… যে প্রতিমামূর্তি হাড়িয়ে গিয়েছিলো… সেই ইতিহাসকে পুনরায় উজ্জীবিত করার প্রয়াস করেছেন মাননীয় সাংসদ সাহেব। ধন্যবাদ আপনাকে… ধন্যবাদ সবাইকে যারা এই ব্যাপারে সাহায্য করেছেন । পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ওনারাও ইতিহাসের বুকে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষী হয়ে থাকবেন ।
********************************************************************
(তাহেরপুর নাম করনের পূর্বে এই এলাকার যে কি নাম ছিল… সেই ব্যাপারে ইতিহাসে তার কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি)
*********************************************************************





Related News