তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হচ্ছেন প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীরা

Posted by: | Posted on: August 9, 2021

তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় যুক্ত হচ্ছেন দেশের প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীরা। ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তারা। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার প্রকল্পের আওতায় সিলেটের প্রতিবন্ধী যুবক-যুবতীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ভাতা দেওয়া হয়। চাকরি ও আয়ের পথও দেখিয়ে দেওয়া হয়। জেলার ২৬০ জন প্রতিবন্ধী এ প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
তাদেরই একজন লোকমান হোসেন বুলবুল (২৩)। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা বুলবুল মা-বাবার বড় ছেলে। জন্মগতভাবেই তার বাম হাতের পাঁচটি আঙ্গুল নেই। তবে, এই প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। সিলেট এমসি কলেজে ¯œাতক শেষ বর্ষের পড়াশুনা শেষ হতে না হতেই পরিবারের হাল ধরেছেন তিনি।
লোকমান হোসেন বুলবুল বাসসকে বলেন, ২০১৮ সালে বিসিসি থেকে প্রশিক্ষণ নেই। এরপর আউটসোর্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ নিয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে শুরু করি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে আয় শুরু হয়। এখন মাসে আয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। পাশাপাশি প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছি।
বুলবুল বলেন,“পড়ালেখা শেষ করে চাকরি পেতে আরও সময় লাগত। কিন্তু, তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে লেখাপড়া শেষ না করেও এখনই ঘরে বসে আয় করতে পারছি। পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারছি।”
শারীরিক প্রতিবন্ধীতা সত্বেও বুলবুল এখন সমাজের অন্যান্য সাধারণ যুবকদের চেয়েও অনেকাংশে এগিয়ে আছেন। নিজের মেধা আর সৃজনশীল প্রতিভায় মা-বাবার মুখ উজ্জল করছেন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা কোন না কোন বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে জন্মায়। আর তারা যদি সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পান তারাও এগিয়ে যান সমাজের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। ডিজিটাল বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রযুক্তি ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সুবিধা সিলেট জেলার প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের অগ্রযাত্রায় নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে জেলার অনেক যুবকই এখন ঘরে বসে বছরে আয় করছেন ৬ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদেরও কেউ কেউ সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধী যুবকরাও পিছিয়ে নেই। একটি স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপের সাহায্যে তারা নিজেদের অসহায়ত্বকে শক্তিতে রূপান্তর করে দেশের অগ্রযাত্রায় অংশিদার হচ্ছেন।
বুলবুলের মতোই আরেক যুবক মো. আইনুল হক (২১)। যার একচোখে দুনিয়া অন্ধকার। হতদরিদ্র পরিবারের যুবক আইনুল একটি ল্যাপটপের সাহায্যে মাসে আয় করেন ৭শ থেকে ৯শ মার্কিন ডলার। একসময় তার বাবা ফেরি করে রকমারি পণ্য বিক্রি করতেন । মা কাজ করতেন বাসাবাড়িতে। মা-বাবার দুঃখ ভুলিয়ে আইনুল নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন পরিবারের ভার।
আইনুল জানান, ঘনিষ্ট এক বন্ধুর পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় তিনি এ পর্যন্ত এসেছেন। এই বন্ধুর মাধ্যমেই একদিন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের খবর পান। সেখানে ছুটে যান এবং প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
সিলেট নগরের গোটাটিকর এলাকার বাসিন্দা আইনুলের পরিবারের একসময় স্কুলে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও ছিলনা। কিন্তু মায়ের প্রবল আগ্রহ তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি এখন সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ালেখা করছেন।
আইনুল বলেন, “আমার পরিবারের বড় ভাই-বোন লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি। মা-বাবা কষ্ট করে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছেন। এরপর বিসিসির প্রশিক্ষণ আমাকে আয়ের পথ দেখিয়েছে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে কাজ করে উপার্জন শুরু করি। আমার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাই।” এজন্য উপার্জন করা টাকার একটি অংশ জমিয়ে রাখছেন বলে জানান আইনুল।
কেবল ছেলেরা নয়; এগিয়ে যাচ্ছে সিলেটের প্রতিবন্ধী মেয়েরাও। এদেরই একজন বীথি রাণী নাথ। ছোটবেলায় টাইফয়েড-এ আক্রান্ত হলে ডান পা অবশ হয়ে যায়। তিনি এখন ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাচল করেন। বিসিসিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি একজন আদর্শ সংবাদকর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখছেন। এরই মধ্যে দেশীয় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ শুরু করেছেন। সংবাদ পাঠিকা হওয়ার স্বপ্ন ও আছে তার।
বিসিসি সিলেটের জব রিপ্লেসমেন্ট অফিসার কমল কুমার বিশ্বাস বলেন, “সিলেটে শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবকদের খুঁজে খুঁজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং যতটুকু সম্ভব তাদের চাকরি ও আয়ের পথ দেখিয়ে দিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, একটু সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ পেলে এরা নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করবে। প্রথমদিকে প্রশিক্ষণে ততটা আগ্রহ না থাকলেও, অন্যদের স্বাবলম্বী হতে দেখে এখন প্রতিবন্ধী অনেক যুবকই প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হচ্ছে ।
নির্জল চন্দ। বয়স ২৩ বছর। দুই পা অবশ, হাঁটতে পারেন না। তিনি সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। যাতায়াতে তাকে সহযোগিতা করছেন তার বড় ভাই।
(টকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) সিলেটের কম্পিউটার শাখার প্রধান মোজাফফর আহমেদ জানান, প্রতিবন্ধী অনেক ছেলেমেয়েই তাদের প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় গরিব ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা পেইড কোর্সে ভর্তি হন। এখনও অনেকে ভর্তি হতে আসেন। এমনকি গ্রাম থেকেও কেউ কেউ এসে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধীরাও এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে তাদের জীবনধারা। সিলেটের একদল বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধী যুবক ডিজিটাল ডিভাইসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও কলে পরষ্পরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে।
সিলেট বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জাতীয় বধির ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় রাসেল আহমদ। তাদের ভাষা বোঝে এমন একজনের সাহায্যে তার সাথে কথা বলে জানা গেলো, সিলেটে তাদের সমিতিতে অন্তত ১শ সদস্য রয়েছে। রাসেল জানায়, তারা এখন অনেক ভাল আছে। কারণ, হাতের স্মার্টফোনের সাহায্যে তারা এখন সারা পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এসময় সে তার আরেক বন্ধুকে ভিডিওকলের মাধ্যমে দেখিয়ে বলেÑ ‘আমরা চাইলেই কথা বলতে পারি। মাঝে মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করি, আনন্দ করি।’
বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা মকসুদ আহমদ জানান, এদের মেধা প্রখর এবং যে কোন কাজ দিলে নিখুঁত ও তড়িৎ গতিতে সে কাজ করতে সক্ষম। কিন্তু, তাদের ভাষা কেউ বুঝে না বলেই সমাজে নানাভাবে তাদের হেয় হতে হয়।
তিনি বলেন, এই মানুষগুলো সবসময় একা থাকত। কেউ তাদের বুঝত না, কারও সঙ্গে তারা আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগ পেত না। তবে তাদের মাঝে এখন আত্মতৃপ্তি আছে। কারণ, হাতের স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এমনকি তারা ইউরোপ-আমেরিকায় বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে ভিডিও কলের মাধ্যমে। তাদের অনেকেই কম্পিউটার পরিচালনায়ও দক্ষ।’
প্রযুক্তির কল্যাণে এই মানুষগুলোর দুঃখ লাঘব হয়েছে জানিয়ে তিনি এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, সিলেট জেলায় ৪৫,৯২৩ জন প্রতিবন্ধী আছে। তাদের মধ্যে ৩৭,১০০ জন বিভিন্নভাবে সরকারী কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী। এখন পর্যন্ত সেখান থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২৬০ জন।
২০০৮ সালের ১২ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশকে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এ রূপান্তর করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্বাবধানে এ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। যার পরিবর্তিত বর্তমান নাম এ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)। বর্তমানে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নেই আজকের বাংলাদেশ এক সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ-এ পরিণত হয়েছে।
এটুআই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্তরে স্তরে অনুন্নত জীবনধারাকে বদলে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করা। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিলেটের প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের আগামীর দিকে অগ্রযাত্রা এই ডিজিটাল বাংলাদেশেরই অর্জন। যা সরকারের এক অতুলনীয় সাফল্য।সূত্র বাসস l বা /ফা…