Main Menu

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে-ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ

কোভিড-১৯ মহামারি ঢেউয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বের লড়াই অব্যাহত থাকা এবং ২০২০ সালের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে একটি ভ্যাকসিনকেই দেখা হচ্ছে এই চক্র অবসানের একমাত্র আশা হিসেবে। ভ্যাকসিনের জন্য বিশ্বের তীব্র প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞানীদের অবিরাম আত্মত্যাগ অভূতপূর্ব গতিতে অসাধারণ ফলাফল বয়ে এনেছে। তিনটি ভ্যাকসিন এখন জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে আছে। আর মোট ৫৮টি ভ্যাকসিন এখন মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে সময় লাগবে, কারণ অনুমোদন আর উৎপাদনে সময় লাগবে। তারপরও এটা স্পষ্ট যে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষায় আরও বেশি বিকল্প পথ আমাদের হাতে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার মাপকাঠি ৫০ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। এর অর্থ হলো কোনও ভ্যাকসিনকে অনুমোদন পেতে হলে এটি গ্রহণ করা মানুষদের জন্য নিরাপদ এবং রোগ প্রতিরোধ বা এর তীব্রতা অন্তত ৫০ শতাংশ কম করতে পারতে হবে। ফলে প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিতে কোনও ভ্যাকসিনের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা ব্যাপক হারে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভালোভাবে প্রমাণিত ও নিরাপদ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। ভ্যাকসিন প্রতিযোগিতার শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান ফাইজার/বায়োএনটেক, মডার্না এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ইতোমধ্যে তাদের কার্যকারিতার হার প্রকাশ করেছে। আর তাদের সবগুলোরই হার সর্বনিম্ন মাপকাঠির অনেক ওপরে।

ভ্যাকসিন তৎপরতার পরিস্থিতি কী?

যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগ ফাইজার ও বায়োএনটেক তাদের ভ্যাকসিনের ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার ঘোষণা করেছে। এমনকি ৬৫ বছরের বেশি মানুষের জন্যও ভ্যাকসিনটি ৯৪ শতাংশ কার্যকর এবং অ্যান্টিবডি ও টি-সেল প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম। বোস্টনভিত্তিক কোম্পানি মডার্না চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষা শেষে তাদের ভ্যাকসিনের ৯৪.৫ শতাংশ কার্যকারিতার কথা জানিয়েছে। দুটি ভ্যাকসিনেই প্রতিটি মানুষের দুই ডোজ করে নিতে হবে। আর উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন চেয়ে এফডিএ’র কাছে আবেদন করেছে। ফাইজার ইতোমধ্যেই অনুমোদন পেয়ে গেছে আর মডার্না তাদের ভ্যাকসিনটি ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ওপর পরীক্ষার অনুমোদন চেয়েছে।

প্রতিযোগিতার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাস্ট্রাজেনেকা। তারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করছে। এই ভ্যাকসিনটি প্রাথমিকভাবে অর্ধেক-শক্তির ডোজের পর দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ ডোজ ব্যবহার করে ৯০ শতাংশ কার্যকারিতা পেয়েছে। তবে মানসম্পন্ন দুই ডোজ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এটি ৬২ শতাংশ কার্যকারিতা পেয়েছে। তাদের ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের বয়স ১২ থেকে ৭০ বছর। আর তারা সবাই ভাইরাসের বিরুদ্ধে একই পরিমাণ অ্যান্টিবডি উৎপাদন করেছে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় থেকেও দুনিয়ার অন্য যেসব ভ্যাকসিন প্রতিশ্রুতিশীল বলে দেখা হচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছে নোভাভ্যাক্স, জনসন অ্যান্ড জনসন, ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডন, আর্কটারাস থেরাফিউটিকস অ্যান্ড ডিউক/এনইউএস মেডিক্যাল স্কুল, সানোফি/জিএসকে, কিউরেভ্যাক, সিনেভ্যাক এবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিন।

ভ্যাকসিন উৎপাদনে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে?

ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে মেসেনজার আরএনএ (mRNA) প্রযুক্তিতে। এটি করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে প্রতিষেধক প্রতিক্রিয়া তৈরির নির্দেশনা মানুষের কোষে পৌঁছে দেয়। অ্যাস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে এক ধরনের কোল্ড ভাইরাস ব্যবহার করে। এটি অ্যাডেনোভাইরাস নামে পরিচিত, যেটি শিম্পাঞ্জি থেকে নেওয়া। জিনগতভাবে পরিবর্তন করা এই ভাইরাস স্পাইক প্রোটিনের জিন বহন করে। মানুষের কোষ এটি গ্রহণ করলে তা প্রতিরোধক প্রতিক্রিয়ায় উদ্দীপনা তৈরি করে অ্যান্টিবডি ও টি-সেল তৈরি করে।

এমআরএনএ ভ্যাকসিনের চেয়ে বেশি প্রচলিত হয়ে উঠবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন। কারণ এমআরএনএ ভ্যাকসিন মজুত ও বিতরণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার দরকার পড়বে। সাধারণ ফ্রিজের তাপমাত্রাতেই মজুত ও পরিবহন করা যায় কোল্ড ভাইরাসে তৈরি ভ্যাকসিন। তবে ফাইজার ভ্যাকসিন উৎপাদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে নিয়ে ইনজেকশন প্রয়োগের আগ পর্যন্ত মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে। মডার্নার ভ্যাকসিনটি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছয় মাস, হিমায়িত অবস্থায় ৩০ দিন এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে।

সবচেয়ে ভালো খবর হলো- এই সব ভ্যাকসিনই প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে নকশা, উন্নয়ন এবং পরীক্ষা করা হয়েছে।

বিশ্বের কত পরিমাণ ডোজ ভ্যাকসিন দরকার?

বর্তমানে সবচেয়ে দামি পণ্য হয়ে উঠেছে ভ্যাকসিন। আর সবার দৃষ্টি এখন উৎপাদকদের ওপর– কখন এটি সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠবে। পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৮০ কোটি। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ এর হার্ড ইমিউনিটির যে সীমা বেঁধে দিয়েছে তা হলো ৭০ শতাংশ। এটি ধরে নিয়ে হিসাব করলে আমাদের এক হাজার একশ’ কোটি ডোজ টিকা প্রয়োগের দরকার পড়বে। তবে এতে বাদ দেওয়া হয়েছে উৎপাদন, পরিবহন, মজুত এবং হস্তান্তরের সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিমাণ। ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এয়ারফিনিটির তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ছয়শ’ কোটি ডোজ ২০২১ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে উৎপাদকেরা। এর দুই-তৃতীয়াংশই প্রয়োগযোগ্য থাকবে বলে মনে করছে তারা। এই হিসাবে রয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিনশ’ কোটি, ফাইজারের ১৩০ কোটি, মডার্নার একশ’ কোটি ডোজ। এছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিক এবং আরও ছয়টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন যদি অনুমোদন পায় তাহলে তাদের হিসাবও এতে যুক্ত রয়েছে। ইতোমধ্যে আগাম অর্ডার দেওয়া রয়েছে এক হাজার কোটি ডোজের। এর অর্ধেকই দিয়ে রেখেছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ। যদিও এসব দেশের মোট জনসংখ্যা দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ। আগাম অর্ডারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কানাডা। দেশটির প্রতিজন নাগরিকের বিপরীতে নয় ডোজ ভ্যাকসিন সুরক্ষিত রয়েছে। আর যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে ফাইজারের ভ্যাকসিন জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। ভারত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার (এসআইআই) উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দুইশ’ কোটি ডোজ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এই কারণে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোকে নিজেদের জনগণের জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এই অবস্থা আগাম ধারণা করেই ২০২০ সালের এপ্রিলেই শুরু হয় কোভ্যাক্স উদ্যোগের যাত্রা। এই উদ্যোগের যৌথ নেতৃত্বে রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভ্যাকসিন জোট গাভি এবং মহামারির প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগের জোট সিইপিআই। উৎপাদকদের সঙ্গে কাজ করে কোভ্যাক্স দুনিয়ার উচ্চ ও নিম্ন আয়ের সব দেশের জন্যই সমানভাবে নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে কাজ করছে। কোভ্যাক্স উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে সিইপিআই সমর্থিত নয়টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন। এদের মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও মডার্নার ভ্যাকসিনও। এছাড়া আরও নয়টি মূল্যায়ন করে দেখছে সিইপিআই। ১৮৯টি দেশ কোভ্যাক্স সুবিধায় স্বাক্ষর করেছে। যাতে করে এই উদ্যোগটি ভ্যাকসিনের যুক্তিসঙ্গত দর নির্ধারণ নিয়ে উৎপাদকদের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা পেয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো ২০২১ সাল নাগাদ এক হাজার আটশ’ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা এবং দুইশ’ কোটি ডোজ সরবরাহ করা। এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ এর আওতায় পড়বে। কোভ্যাক্স সুবিধা পাওয়ার সদস্য দেশ বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আডানোম গেব্রিয়াসিস ধনী দেশগুলোকে ভ্যাকসিন জাতীয়করণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। ভ্যাকসিনকে একটি বিশ্বায়নের পণ্য আখ্যা দিয়ে তিনি জোরালোভাবে বলেছেন কয়েকটি দেশের সব মানুষকে টিকা দেওয়ার বদলে সবদেশেরই কিছু মানুষকে দেওয়া মহামারি মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায়।

ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কৌশল কী?

প্রথম ধাপে এক কোটি ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দিতে তিন কোটি ডোজ সংগ্রহ করতে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এই পরিমাণ জনগোষ্ঠী আমাদের জনসংখ্যার নয় শতাংশ।

এছাড়া কোভ্যাক্স সুবিধা পাওয়া দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ আরও ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাবে। অন্তত ২০ শতাংশ মানুষের ওপর টিকা প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ভ্যাকসিন জোট জাভির মাধ্যমে এগুলো পাওয়া যাবে। সরকার স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই প্রস্তাবে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন নিলাম ছাড়াই যেকোনও সংস্থার কাছ থেকেই দরকষাকষির মাধ্যমে কেনা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভ্যাকসিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ইইউ অনুমোদিত হতে হবে এবং উৎপাদকদের বাংলাদেশের ডিজিএইচএস’র সার্টিফিকেট অর্জন করতে হবে। এর ফলে এবং কোভ্যাক্স উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক ভ্যাকসিন পাওয়ার সুযোগ পাবে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যতদিন মহামারি চলবে ততদিন তারা ভ্যাকসিন থেকে কোনও লাভ করবে না। এটির প্রতি ডোজের দাম দুই থেকে তিন ডলার করে পড়বে বলে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম পড়বে ২০ ডলার, মডার্নার ভ্যাকসিনের দাম হবে ২৫ থেকে ৩৭ ডলার। জাভির মাধ্যমে যৌথভাবে অর্থায়নের যে কৌশল বাংলাদেশ নিয়েছে তাতে ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজের দাম পড়বে ১.৬ থেকে দুই ডলার পর্যন্ত। প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের ৪০ শতাংশ জাভির মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া মজুত পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিলে এটাই বাংলাদেশের জন্য এটাই আদর্শ ভ্যাকসিন।

ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় উৎপাদক কারা?

আয় অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি ভ্যাকসিন উৎপাদকই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। তবে পরিমাণের হিসেবে সবচেয়ে বড় ভারত। দুনিয়ার ভ্যাকসিনের ৬০ শতাংশই সরবরাহ করে দেশটি। এছাড়া দেশটির সেরাম ইনস্টিটিউট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সক্ষমতা অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় চীন। যদিও চীনের তৈরি ভ্যাকসিনের মাত্র পাঁচ শতাংশ বিদেশে বিক্রির অনুমতি রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য দুর্বল শিল্প দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। তবে কোভ্যাক্সে যোগ দিয়েছে চীন আর আশা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অনুমোদন পাওয়ার পর তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।

চীন ও রাশিয়ার ভ্যাকসিনের পরিস্থিতি কী?

নেচার ম্যাগাজিনের একটি আর্টিকেল অনুযায়ী চীনের ১১টি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে আর এগুলো পাঁচটি রয়েছে তৃতীয় বা চূড়ান্ত ধাপে। এর দুটি উদ্ভাবন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ সিনোফার্ম, একটি ক্যানসিনো, একটি সিনোভ্যাক আর পঞ্চমটি আনহুই ঝাইফেইলংকম বায়োলজিক ফার্মাসি এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সের ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজি। সিনোফার্মের ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসরে। এছাড়া পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকোর মতো দেশগুলোও কয়েকটি চীনা ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকদের অনুমোদন পায়নি, তবে দেশটির সরকার স্বাস্থ্যকর্মী এবং শুল্ক কর্মকর্তাদের মতো উচ্চ ঝুঁকির মানুষদের জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। নভেম্বরের শুরুতেই প্রায় দশ লাখ চাইনিজ নাগরিক সিনোফার্মের ভ্যাকসিন গ্রহণ করে ফেলে।

রাশিয়া তাদের স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৯২ শতাংশ বলে জানিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, শিক্ষক এবং সামাজিক কর্মীদের জন্য টিকাদান কর্মসূচি চালু করে দিয়েছে। ভ্যাকসিনটি উদ্ভাবন করেছে মস্কোর গামালিয়া ন্যাশনাল সেন্টার ফর এপিডেমিয়োলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি। চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই গত আগস্ট থেকে এই ভ্যাকসিনটির জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। ভ্যাকসিনটির তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা এখনও বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনেজুয়েলা এবং ভারতে চলছে।

তাদের গবেষকেরা বলছেন, ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে ইতোমধ্যে একশ’ ২০ বিলিয়ন ডোজ টিকা নেওয়ার আবেদন পেয়েছে তারা। সিনোভ্যাক এবং স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন পেতে বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।

ভ্যাকসিন মজুত, বিতরণ এবং প্রয়োগের সুবিধা কি আমাদের আছে?

বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করেছে। এটি সাধারণ ফ্রিজেই রাখা যায়। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিতরণ কেন্দ্র পৌঁছানো পর্যন্ত সম্ভাব্য নানা জটিলতা এড়ানোর জন্য এটি প্রয়োজন। ফ্রিজের তাপমাত্রার বিতরণ শৃঙ্খল বজায় রাখা নিশ্চিত করতে সরঞ্জামগত বাধা অপসারণ করতে বাংলাদেশকে অবশ্যই আগেভাগে উদ্যোগ নিতে হবে। সফল টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে মূল হয়ে উঠবে বিতরণের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত ঠান্ডা অবস্থায় ভ্যাকসিন পৌঁছানো, বিতরণ কেন্দ্রে তা মজুত রাখা এবং নির্বিঘ্নে তা প্রয়োগ। এগুলোর জন্য প্রয়োজন পড়বে বিশালাকারের সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং ভ্যাকসিন নড়াচড়ার জন্য দক্ষ মানুষ।

অন্যদিকে যেসব দেশ ফাইজারের ভ্যাকসিন ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের এটি চালু করার আগেই প্রস্তুত রাখতে হবে মজুত অবকাঠামো এবং বিতরণ সরঞ্জাম। বিশেষায়িত ফ্রিজ, ড্রাই আইস, লিথিয়াম ব্যাটারি, সিরিঞ্জ বিতরণ বাড়াতে হবে। শীতল তাপমাত্রায় মজুত ভ্যাকসিন নড়াচড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠছে ইউপিএস, ফেডএক্স এবং ডিএইচএল’র মতো লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশে যদি কোনও বেসরকারি উদ্যোগ ফাইজার কিংবা মডার্না’র ভ্যাকসিন আনতে চায় তাহলে তাদের এই সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রাখতে হবে। কেননা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি বা মাইনাস ২০ ডিগ্রি কোনও তাপমাত্রা বজায় রেখে এসব ভ্যাকসিন মজুত, পরিবহন কিংবা বিতরণের পর্যাপ্ত সুবিধা আমাদের নেই।

সম্ভাব্য ভ্যাকসিন বাছাইয়ের কৌশল কী?

অনুমোদিত ভ্যাকসিন থেকে কোনটি নির্দিষ্ট মানুষের জন্য প্রয়োগের জন্য বাছাইয়ের মূলনীতি কী হবে তা নিয়ে একটি কৌশল বর্ণনা করেছে ডব্লিউএইচও’র টিকাদান বিষয়ক স্ট্রাটেজিক অ্যাডভাইজরি গ্রুপ অব এক্সপার্ট (এসএজিই)।

মানুষের কল্যাণ, সমান শ্রদ্ধা, সমতা, পারস্পরিকতা এবং বৈধতা হচ্ছে এসএজিই’র মূলনীতি। তাদের মতে এগুলোর ওপর ভিত্তি করে ভ্যাকসিন পাওয়া গেলে কাদের ওপর প্রয়োগ করা হবে তা বাছাইয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রথম ধাপ: ভ্যাকসিন পাবে মাত্র এক থেকে দশ শতাংশ মানুষ।

দ্বিতীয় ধাপ: ভ্যাকসিন যখন ১১ থেকে ২০ শতাংশ মানুষের জন্য সহজলভ্য হবে।

তৃতীয় ধাপ: ভ্যাকসিন যখন ২১ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষের জন্য সহজলভ্য হবে।

ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কারা অগ্রাধিকার পাবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। এসএজিই’র পরামর্শ হলো অগ্রাধিকার তালিকায় গুরুত্ব পাওয়ার ক্রম হওয়া উচিত হবে- স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, মূল্যায়িত ঝুঁকিতে থাকা বয়স্ক রোগী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সামনের সারির কর্মী, অত্যাবশ্যক নয় কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের কর্মী যারা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারে না, শিক্ষক, মিডিয়া কর্মী এবং সাংবাদিক, সিটি করপোরেশন এবং মিউনিসিপ্যাল কর্মী, সরকারি নেতা/প্রশাসক/প্রাযুক্তিক ব্যক্তি যারা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার অবিভক্ত অংশ, কম সুবিধাপ্রাপ্ত এবং বাস্তুচ্যুত মানুষ।

গর্ভবর্তী নারী, দুধ খাওয়ানো মা এবং শিশুদের ওপর ভ্যাকসিন ব্যবহার নিয়ে এখনও কোনও পরীক্ষামূলক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় এসব মানুষের ওপর প্রয়োগ বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর কয়েক সপ্তাহ মাস পার হয়ে গেলে তাদেরও ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পক্ষপাত এড়ানোর জন্য সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতারও প্রয়োজন। যাতে করে সেই সিদ্ধান্তে একমত না হওয়াদেরও সঠিক তথ্য প্রকাশ করে যুক্তি তুলে ধরা যায়।

ভ্যাকসিন পাওয়ার আগ পর্যন্ত আর কী করা উচিত?

শেষ পর্যন্ত সরকার অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছে এবং শুরু করেছে। কোডিড-১৯ সংক্রমণের মাত্রা নির্ধারণে তথ্য প্রস্তুত করতে আমাদের দেশব্যাপী সিরো-সার্ভিলেন্স জরিপ করানোরও দরকার। টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলে একই ধরনের অ্যান্টিবডি টেস্টও সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করা দরকার। আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় গবেষণা সংস্থাগুলোর উচিত হবে ভ্যাকসিন কত সময় পর্যন্ত এবং কত জোরালোভাবে প্রতিরোধক ক্ষমতা দিতে পারছে তা পর্যবেক্ষণে রাখা।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতে দুনিয়ার সব মানুষকে ভ্যাকসিন প্রদান করতে সময় লাগবে চার বছর পর্যন্ত। ভ্যাকসিন সুরক্ষা দেবে তবে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন নিয়েও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কিনা এবং আক্রান্ত হয়ে গেলেও অন্যকে সংক্রমিত করার মতো যথেষ্ট ভাইরাস তৈরি করছে কিনা তা জানতে আমাদের এখনও অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া ৭০ শতাংশ মানুষকে যতদিন পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা, খোলা স্থানে জমায়েতের মতো সামাজিক দূরত্বের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।

টিকা প্রয়োগ একবার শুরু হয়ে গেলে আমাদের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া শনাক্তের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন বয়স গ্রুপের মানুষের মধ্যে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করবেন এবং নিশ্চিত করবেন যে প্রথম ডোজ গ্রহণ করা ব্যক্তি যেন দ্বিতীয় ডোজ সময়মতো নেয়। কী আশা করতে হবে সেই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে সরকারকে। এছাড়া ভ্যাকসিন ট্র্যাকারেরও নকশা করা যেতে পারে। এই ট্র্যাকারটি কাদের ভ্যাকসিনের ডোজ গ্রহণ করার দরকার তা শনাক্ত করতে পারবে, কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে হেল্পলাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারবে এবং দ্বিতীয় ডোজের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনে করিয়ে দিতে পারবে। আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে টিকা নয় টিকাদান কর্মসূচিই আমাদের জনগণকে রক্ষা করতে পারে।

লেখক: অর্গানিকেয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক।  এমবিবিএস, এমবিএ এবং হেলথকেয়ার লিডারশিপে মাস্টার্স।






Related News