নব্য জেএমবি’র ‘সিঙ্গেল অ্যাটাকের’ নতুন কৌশল

‘সিঙ্গেল অ্যাটাক’ বা ‘একক হামলা’র নতুন কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি। আগের মতো একাধিক ব্যক্তি মিলে একসঙ্গে হামলা করার বদলে এখন একজন সদস্যকে একাই হামলা করার জন্য প্রস্তুত করছে সংগঠনটি। এমনকি যে সদস্যটি হামলা করবে, তাকে অনলাইনের মাধ্যমে ‘ম্যানুয়াল’ (ব্যবহার নির্দেশিকা) পাঠিয়ে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। জঙ্গি সদস্যদের ধারণা— এতে হামলা করতে গিয়ে কেউ ধরা পড়লে সংগঠনের অপর সদস্যদের বিষয়ে কোনও তথ্য পাবেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর আগে ‘কাট আউট’, ‘স্লিপার সেল’ বা ‘উলফ প্যাক’ পদ্ধতিতে সংগঠিত হতো জঙ্গিরা। এতে একসঙ্গে অন্তত ৪ থেকে ৬ জন সদস্য থাকতো। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিলেট থেকে নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতারের পর জঙ্গিদের নতুন এই কৌশলের কথা জানতে পেরেছে জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট-সিটিটিসি।
সিটিটিসির প্রধান ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিরা সবসময় নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে সংগঠিত হয় এবং হামলার চেষ্টা করে। তবে শক্তিশালী হামলা করার মতো সক্ষমতা এখন আর  নব্য জেএমবির নেই।  ২০০৪ বা ২০০৫ সালে জঙ্গিরা যেরকম সক্ষম ছিল, সেই সক্ষমতার কিছুটা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছিল। কিন্তু নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার ও অভিযানে এমনভাবে পরাস্ত করা হয়েছে— তাতে বড় ধরনের কোনও হামলা তারা করতে পারবে না।’

তিনি বলেন, ‘তবে সমাজে এখনও উগ্রবাদের অনেক উপকরণ রয়ে গেছে। আমরা বা সাধারণ মানুষ যদি একটু উদাসীন হয়ে যাই, তাহলে জঙ্গিরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এজন্য আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।’

সিটিটিসি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর আহ্বানে সারা দিয়ে গত ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও জঙ্গিরা হামলা করার পরিকল্পনা করেছিল। গুলশানের একটি অভিজাত শপিং মল ছিল তাদের টার্গেট। একারণে ঈদের সময় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জঙ্গিরা হামলা করতে পারে বলে পুলিশ সদর দফতর থেকে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। একারণে জঙ্গিরা বড় কোনও হামলা করার সুযোগ পায়নি। তবে গত ২৪ জুলাই পল্টনে প্রথম দিন একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। একদিন পর একই এলাকা থেকে একটি বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সিলেটের শাহজালালের মাজারেও একটি বোমা নিক্ষেপ করা হলেও তা বিস্ফোরিত হয়নি। প্রায় একই সময়ে নওগাঁতেও একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে এই হামলার ছক সাজিয়েছিল নব্য জেএমবি। সিটিটিসির কর্মকর্তারা তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে গত মঙ্গলবার সিলেট থেকে এসব হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিরা সবাই নব্য জেএমবির সামরিক শাখার সদস্য ছিল। গ্রেফতার জঙ্গিদের মধ্যে শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান নামে এক তরুণ নব্য জেএমবির সামরিক শাখার দায়িত্বশীল ছিল। ছাত্র শিবিরের সাবেক কর্মী নাইমুজ্জামান সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত বছর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেছে।

একক হামলার কৌশল

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন যে, তারা (জেএমবি) এখন একজন ব্যক্তিকে দিয়ে একটি হামলার পরিকল্পনা করছে। আগে যেকোনও হামলায় একাধিক জঙ্গি সদস্য অংশ নিতো। গ্রেফতার হওয়া নাইমুজ্জামান অনলাইনে রিক্রুট করা সদস্যদের মধ্যে যারা সামরিক শাখায় কাজ করতে ও সরাসরি হামলা করতে আগ্রহী, তাদের আলাদা করতো। এরপর অনলাইনে প্রত্যেকের কাছে বোমা তৈরির একটি ম্যানুয়াল পাঠানো হয়। সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেফতার ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক এবং বোমা তৈরির ম্যানুয়ালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে ওই আস্তানার মাস্টারমাইন্ড জামাল উদ্দিন নামে আরেক জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র জামালই বোমা তৈরির ওই ম্যানুয়াল তৈরি করেছিলেন।

সিটিটিসির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ম্যানুয়ালটি নাইমুজ্জামান সংগঠনের সামরিক শাখার সদস্যদের কাছে পাঠাতো। যারা যারা ম্যানুয়াল দেখে বোমা তৈরি করতে পারতো, তাদের হামলা চালানোর জন্য নির্দেশ দিতো। কিন্তু ম্যানুয়াল দেখে শক্তিশালী বোমা তৈরি করতে না পারায়, সে সামরিক শাখার সদস্যদের তিন মাসের একটি প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সিলেটে একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল।’

সিটিটিসি সূত্র বলছে, নাইমুজ্জামানের নির্দেশে ঢাকার পল্টনে যে জঙ্গি সদস্য হামলা করেছিল, তাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নাইমুজ্জামান জানিয়েছে—সে-ই ঢাকার ওই তরুণকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। এছাড়া নাইমুজ্জামানের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া সানাউল ইসলাম সাদিককেও সে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়। শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিক নিজেই একটি বোমা তৈরি করে গত ২৩ জুলাই শাহজালালের মাজারে তা বিস্ফোরণ ঘটাতে যায়। কিন্তু সেখানে পুলিশ দেখে সে ভেতরে প্রবেশ না করে বাইরে থেকেই বোমাটি নিক্ষেপ করে। কিন্তু ‘কাঁচা হাতে’ তৈরি বোমাটি সেখানে বিস্ফোরিত হয়নি। এছাড়া গত ৩১ জুলাই নওগাঁর সাপাহার এলাকার একটি হিন্দু মন্দিরে জঙ্গিরা বোমা হামলা করে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস ওই হামলার দায়ও স্বীকার করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে নাইমুজ্জামান জানিয়েছে, নওগাঁয় হামলার পরিকল্পনাও তার ছিল। সে নওগাঁয় অবস্থানকারী তাদের সামরিক শাখার এক সদস্যের কাছে বোমা তৈরির ম্যানুয়াল পাঠিয়ে অনলাইনে নির্দেশনা দিয়ে বোমাটি তৈরি করায়।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতার হওয়া নাইমুজ্জামানের সঙ্গে নব্য জেএমবির বর্তমান আমির আবু মোহাম্মদ আল বাঙালির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। কোনও ঘটনার পরপরই নাইমুজ্জামান বিষয়টি তাদের আমির আবু মোহাম্মদ আল বাঙালিকে জানাতো। আবু মোহাম্মদ তা সিরিয়ায় অবস্থানকারী আইএসের কাছে তথ্য পাঠিয়ে দায় স্বীকার করতে বলতো। আবু মোহাম্মদের সঙ্গে নাইমুজ্জামানের যোগাযোগ থাকলেও কখনও তাদের দেখা হয়নি বলে জানিয়েছে সে। পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, আবু মোহাম্মদ বাংলাদেশের বাইরে কোনও দেশে অবস্থান করে নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।

সিটিটিসির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার অহিদুজ্জামান নূর বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া পাঁচ জঙ্গিকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাদের সহযোগীদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে।’

এদিকে নব্য জেএমবির একক হামলার নতুন কৌশলটিকে গুরুত্ব দিয়ে তা মোকাবিলার কথা বলছেন জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য—এই কৌশলে জঙ্গিদের একসঙ্গে জমায়েত হয়ে আস্তানা গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। জঙ্গি সদস্য যে কেউ নিজের ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে বোমা তৈরির ম্যানুয়াল ও নির্দেশনা নিয়ে বোমা তৈরি করে হামলা করতে পারে। এজন্য একদিকে যেমন অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক নজরদারি করতে হবে, তেমনি বোমা তৈরির উপকরণগুলো যেন কোনোভাবে খুচরা বাজারে সহজলভ্য না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে কাজ করে আসা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘এটি একটি নতুন শঙ্কার বিষয়। এখন ঘরে বসেই কে যে জঙ্গি দলে নাম লিখিয়ে বোমা তৈরি করবে, তা তো ঘটনা না ঘটার আগে বোঝাও কষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য ব্যাপক নজরদারি করা প্রয়োজন। কোনোভাবেই জঙ্গিবাদ ইস্যুকে হালকা করে দেখা যাবে না। একইসঙ্গে বাজারে যাতে বোমা তৈরির কেমিক্যাল সহজলভ্য না হয়, সেদিকে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।সুত্র-’বাংলা ট্রিবিউন।

Share: